'কল্পলতা' ও রবীন্দ্রনাথ

কল্পলতা: প্রসঙ্গ রবীন্দ্রসংগীত; সম্পাদনা — অমিতেশ সরকার; একুশে, জুলাই ২০১২, পৃষ্ঠা: ISBN:







।। এক ।।

বাঙালির রবীন্দ্রবীক্ষা অনিঃশেষ। রবীন্দ্রনাথকে এবং তাঁর গানকে জানার বোঝার বিরাম নেই। তবু তাঁকে এবং তাঁর গানকে বোঝা হয়ে গেছে এমন দাবি অকল্পনীয়। তাঁর গান এক চিরবিস্ময়। তাঁর গানকে কোন পর্যায়ে ফেলা হবে সেও এক অনিশ্চিত তর্কিত বিষয়। এ কি কোনো 'আধুনিক' গানেরই ধারা? এ কি ধ্রুপদি সংগীতপদবাচ্য? ধ্রুপদি সংগীত বলতে যদি রাগালাপ, রাগের বন্দিশ ও বিস্তার আর তানকর্তব বুঝি, তাহলে রবীন্দ্রসংগীতকে বিশ্চয় ধ্রুপদি সংগীত বলা যাবে না। কিন্তু যদি 'ধ্রুপদি' কথাটাকে 'চিরায়ত' অর্থে গ্রহণ করি, তাহলে রবীন্দ্রনাথের গানকে 'ধ্রুপদি' বলতে বাধা হবার কথা নয়। যা পুরাতন হয়েও চিরনূতন, যার উৎকর্ষ প্রশ্নাতীত, যা শ্রোতার অন্তরকে আলোকিত করে, যে-সংগীত নিঃসন্দেহে জাগরণের সংগীত, আত্মদীক্ষার সংগীত, যার বিষয়ে কৌতূহল এবং যার প্রতি আকর্ষণ অনিঃশেষ, তাকে ধ্রুপদি বলতে বাধা কী?

১৯১৪ সালে ফক্স স্ট্র্যাংওয়েজ নামে জনৈক ইয়োরোপীয় সংগীতবিদ রবীন্দ্রনাথের গানকে তুলনা করেছিলেন পাশ্চাত্য ধ্রুপদি ধারার সংগীতের সঙ্গেই। ভারতীয় রাগসংগীতে ইম্প্রোভাইজেশন একটা প্রধান বিষয়। রাগের কাঠামোকে মেনে নিয়ে বিস্তার করার ব্যাপারটা শিল্পীর অধিকার ও অভ্যাসের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু ভাগনার, মোৎসার্ট, বিঠোফেন, চাইকভ্‌স্কি, বাখ প্রভৃতি কম্পোজারদের সংগীত বিধিবদ্ধ এবং তাঁদের রচনা থেকে এতটুকু ব্যত্যয় করা যায় না। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের গানও অপরিবর্তনীয় এবং সম্পূর্ণ প্রণালীবদ্ধ। রবীন্দ্রনাথের গানের কাঠামোকে সীমা ধরে নিয়ে বলা যায়, ওই সীমার মধ্যে অনন্ত অসীমের আভাস পাওয়া যায়। বিস্ময়ের বিষয় সেটাই।

রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে লেখালিখির বিরাম নেই। বিষয় হিসেবে রবীন্দ্রসংগীত অত্যন্ত আকর্ষক বটে, তবে আবার সীমাহীন বৈচিত্র্যের কারণে তাকে হাতের মুঠোয় ধরতে পারাও অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে তবু চর্চা চলতেই থাকবে চিরকাল। 'কল্পলতা'-র রবীন্দ্রসংগীতচর্চা একটি সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তও। এটি প্রায় চল্লিশজন লেখকের কলমে ও তুলিতে রবীন্দ্রসংগীত চর্চার সংকলন। অমিতেশ সরকারের সম্পাদনায় প্রস্তুত হয়েছে এটি। তিনি নিজে রবীন্দ্রনাথের গানের শিল্পী, যদিও তিনি নিজেকে শিল্পী বলতে নারাজ। তিনি নিঃসন্দেহে এ-ধরনের সংকলনের ব্যবস্থাপনা করবার উপযুক্ত মানুষ।

'কল্পলতা' নামটি কিছু অসুবিধের সৃষ্টি করতে পারে পাঠকের মনে। রবীন্দ্রনাথের 'আমার নাই বা হল পারে যাওয়া' গানটির শেষে আছে 'আমার সেইখানেই কল্পলতা, যেখানে মোর দাবি-দাওয়া'। এই 'কল্পলতা' শব্দটা নিয়ে উত্তরপাড়ায় ন-য়ের দশকে গড়ে উঠেছিল একটি সংস্থা। এই সংস্থাটি ২০০৪-এর জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মার্চ এই তিন মাসে তিনটি আলোচনা-সভার আয়োজন করেছিল। বিষয় ছিল - (১) এই শতকের রবীন্দ্রসংগীত: আশা ও আশঙ্কা, এবং (২) রবীন্দ্রসংগীতে যন্ত্রানুষঙ্গ। এসব কথা সম্পাদকই তাঁর 'সম্পাদকের কথা'-য় জানিয়েছেন আমাদের। কিন্তু এই বইয়ের রচনাগুলিই কি সেই আলোচনা-সভায় বলা বা পাঠ করা হয়েছিল? এই কথাটা কিন্তু সম্পাদকের বিবৃতিতে জানা যাচ্ছে না।

।। দুই ।।

বীন্দ্রনাথের গান নিয়ে একসঙ্গে অনেক লেখকের রচনার সংকলন প্রস্তুত হলে তার সম্পর্কে পাঠকের কতগুলো প্রত্যাশা থাকে। আর তা ছাড়া এই শতকের রবীন্দ্রসংগীতের আশা ও আশঙ্কা এবং যন্ত্রানুষঙ্গই যদি বিষয় হয়, তবে সে-সম্পর্কেও কিছু প্রত্যাশা থাকবে। প্রথমেই যা বলার তা এই যে, এই সংকলনে রবীন্দ্রনাথের গানে যন্ত্রানুষঙ্গের কোনো প্রসঙ্গই আলোচনায় উঠে আসেনি। উপরন্তু এই শতকের রবীন্দ্রসংগীতে আশা-আশঙ্কার বিষয়েও তেমন কোনো আলোচনা দেখা গেল না। কাজেই ধরে নেওয়া যায়, উত্তরপাড়ার সেই আলোচনা-সভা এই পুস্তকটির পরিকল্পনায় উৎসাহ জুগিয়েছে বটে, তবে সেইসব আলোচনা এখানে ধারাবাহিত হয়ে আসেনি।

এ-ধরনের সংকলন সম্পর্কে পাঠকের প্রত্যাশার কথা বলছিলাম। সেই প্রত্যাশাগুলি কীরকম? (১) গানের বাণীর আলোচনা অর্থাৎ গীতবিতানের কবিতার আলোচনা, (২) গানের আলোচনা অর্থাৎ সুরে বসানো গানের আলোচনা, (৩) রাগতালের আলোচনা, (৪) যন্ত্রানুসঙ্গের আলোচনা, (৫) শ্রোতার কথা, (৬) শিল্পীর কথা ইত্যাদি। এমন আছে আরও নানান দৃষ্টিকোণ। রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে হতে পারে তন্নিষ্ঠ ব্যক্তিগত অবধারণার আলোচনা। গানের সাংগীতিক বৃত্তটিকে ঘিরেও হতে পারে শ্রোতার আত্মনির্মাণ ও আত্ম-উপলব্ধির কথা, যে-ধারার আলোচনায় শঙ্খ ঘোষের সিদ্ধি; কিংবা দুর্মর নিরীশ্বরবাদী হলেও গীতাঞ্জলির গান বা রবীন্দ্রনাথের 'ঈশ্বর-আচ্ছাদিত' গান কীভাবে আর কেনই বা উপভোগে বাধা হয় না — থাকতে পারে তেমন আলোচনাও, যে-ধারার অনন্যসাধারণ কথক ছিলেন আবু সয়ীদ আইয়ুব।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গানকে 'ফিরে দেখার' দৃষ্টিও বদলে গেছে, অনিবার্যভাবে। 'কল্পলতা'-য় তার কিছু চিহ্ন আমরা লক্ষ করি। সেই আলোচনায় আসবার আগে এই বইটির পরিকল্পনা সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার। 'কল্পলতা'-য় চার-পাঁচটি ভাগ — গদ্য (অর্থাৎ প্রবন্ধ), ছবি, আলোকচিত্র, কবিতা, গল্প। গদ্য বা প্রবন্ধের সংখ্যা সতেরো, ছবি অংশে আছে রবীন্দ্রনাথের গানকে 'থিম' করে এগারোটি চিত্রকলা, একটি আলোকচিত্র, ন-টি কবিতা আর তিনটি গল্প। সবকিছুরই বিষয় রবীন্দ্রনাথের গান। কাজে কাজেই বইটিকে কোনোভাবেই রবীন্দ্রনাথের গানের আলোচনাগ্রন্থ বলা যাবে না।

আঁকা ছবিগুলির মধ্যে একটি আছে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরই। ঋষি বড়ুয়া, দিলীপ দাস, শুভময় বসু ও হিরণ মিত্রের আঁকা ছবিগুলি উৎকৃষ্ট মানের। ন-টি কবিতার মধ্যে চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, যশোধরা রায়চৌধুরী ও সব্যসাচী দেবের কবিতা বারবার পড়া চলে। সত্যপ্রিয় ঘোষের গল্পটিতে রবীন্দ্রনাথের 'গানের ভেলায় বেলা-অবেলায়' পরিক্রমণের আর সে-গানে অবগাহনের মুড চমৎকার ধরা আছে। কিন্তু 'কল্পলতা'-র এই পাঁচমিশেলি পরিকল্পনার জন্য কোনো বিভাগই আলাদা মাত্রা ততটা পায় না, ব্যতিক্রম ওই গদ্য তথা প্রবন্ধগুলি। সম্পাদক বলেছেন, 'গদ্যাংশটি বাদ দিলে আমরা যা পাচ্ছি, সেই ছবি, কবিতা, গল্প এই বইয়ের অমূল্য সম্পদ'। খুব-একটা একমত হওয়া যাচ্ছে না সম্পাদকের সঙ্গে। দুটি-তিনটি ছবি, দুটি কি তিনটি কবিতা আর একটি গল্প নিঃসন্দেহে প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু স্বীকার করা ভালো যে, বইটির প্রধান আকর্ষণ প্রবন্ধগুলি, অর্থাৎ যাকে সম্পাদক বলেছেন 'গদ্য'। এবং একথাও বিশেষ উল্লেখযোগ্য যে, সতেরোটি প্রবন্ধের সবগুলিই অত্যুৎকৃষ্ট না হলেও অন্তত সাত-আটটি বিশেষ অভিনিবেশ দাবি করে।

।। তিন ।।

প্রথমেই যে গদ্যরচনাটির কথা বলতে চাই, সেটি এই বইয়েরও প্রথম রচনা — অনন্তকুমার চক্রবর্তীর 'রবীন্দ্রনাথের "আমার গান"'। অনন্তবাবু বিশিষ্ট সংগীত-আলোচক। রবীন্দ্রনাথের গানে তাঁর দীর্ঘ পরিক্রমণ অবশ্য থেমে গেছে ২০০০ সালে। আমাদের দুর্ভাগ্য। তবে তাঁর কাছ থেকে তার আগে পাওয়া গেছে কিছু তন্নিষ্ঠ বিচার-বিশ্লেষণ। যে-ধরনের আলোচনা সংগীতবোদ্ধারা সচরাচর এড়িয়ে চলেন, অনন্তকুমারের পদপাত ঠিক সেখানেই। রবীন্দ্রনাথের গানের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক দিকগুলি নিয়ে নানান কথা-কথান্তরের সঙ্গে পরিচয় আছে আমাদের। তবে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রকৃত গীতরীতি কী, কাদের গানে তাঁর গানের সঠিক রূপটি ফোটে বা ফুটত — এই অস্বস্তিকর অথচ প্রয়োজনীয় আলোচনাই অনন্তবাবুর নিবন্ধের বিষয়। সেই প্রসঙ্গে এসেছে অনেক আনুষঙ্গিক ভাবনার কথাও। রবীন্দ্রনাথ বিশেষ উদ্‌বিগ্ন ছিলেন, তাঁর গানের যথাযথ রূপায়ণ নিয়ে। তাঁর এই 'আমার গান'-এর প্রথম সার্থক রূপকার তিনি নিজেই, বলা বাহুল্য। কিন্তু এও ঠিক যে, তাঁর কণ্ঠের লাবণ্য কারুময়তা ও ওজস্বিতার চিহ্ন তাঁর শেষ জীবনের রেকর্ড-করা গানগুলোতে পুরোপুরি পাওয়া যায় না। তার জন্য তাঁর বয়সের ভার দায়ী হতে পারে, আর দায়ী হতেই পারে রেকর্ডিং-এর ত্রুটি। সেই কারণে তাঁর গাওয়া এসব গানে একটা 'পাতলা ভাব' বেশি লক্ষ করা যায়। অথচ তাঁর সমসাময়িকদের অনেকেই লিখেছেন তাঁর অসামান্য কন্ঠসম্পদের কথা, আর অসামান্য গায়নভঙ্গির কথা।

রবীন্দ্রনাথের গানের প্রথম ও মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শিল্পীদের কথা বলেছেন অনন্তবাবু। যেসব শিল্পীর কন্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান ঠিক ঠিক 'তাঁরই গান' হয়ে উঠত, হয়ে উঠত অসামান্য নিবেদন, অনন্তবাবু তাঁদের কথা বলেছেন — ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অনাদিকুমার দস্তিদার, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, শান্তিদেব ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, কনক দাস, মালতী ঘোষাল, অমিতা সেন, সাহানা দেবী, অমিয় ঠাকুর, শুভ গুহঠাকুরতা, সুবিনয় রায়, সুনীলকুমার রায়, সমরেশ চৌধুরি, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, নীলিমা সেন প্রমুখের কথা, তাঁদের শিক্ষার কথা, তাঁদের সার্থক গায়নের কথা বলেছেন লেখক। এঁদের সকলের গাইবার ভঙ্গি যে একইরকম তা কিন্তু নয়।

শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের গীতভঙ্গির বিভিন্নতার কারণ হিসেবে যা বলা হয়েছে তা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এই শিল্পীদের গায়নে ছাপ পড়েছে তাঁদের শিক্ষাগুরুদের। দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও শান্তিদেব ঘোষ শান্তিনিকেতনের তিন প্রধান সংগীতশিক্ষক। শিষ্যশিষ্যারা যুগপৎ অনেকের কাছে শিখলেও বিশেষভাবে একজনের প্রভাব পড়ে বেশি। এই কারণেই জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ও সুচিত্রা মিত্রের গীতভঙ্গির সঙ্গে সুবিনয় রায়, সুনীল রায় বা নীলিমা সেনের গীতভঙ্গি আলাদা হয়ে যায়। অথচ এঁরা প্রত্যেকেই অসামান্য সংগীত নিবেদনের দৃষ্টান্তও রেখেছেন। রবীন্দ্রনাথের গান যে সকলেই হুবহু একই স্টাইলে গাইবেন, তা তো হতে পারে না। তাহলে তো সে-গান যান্ত্রিক হয়ে পড়তে বাধ্য। শিল্পীদের শিক্ষা কন্ঠস্বর উচ্চারণভঙ্গি প্রভৃতির জন্য গীতভঙ্গি কিছুটা আলাদা হয়ে যায়। তাতে গায়কি ক্ষুন্ন হয় না।

একালের শিল্পীরা একটা ব্যাপারে বড়োই দুস্থ। তাঁরা শিক্ষক হিসেবে প্রায় কোনো মহান শিক্ষককে পান না। তবে এখনও আছেন এমন কয়েকজন শিল্পী-শিক্ষক যাঁরা সরাসরি শৈলজারঞ্জন, সুবিনয়, কণিকা, নীলিমা প্রমুখের কাছে গান শিখেছেন এবং তাঁদের শিক্ষাকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছেন। অনন্তবাবুর পরামর্শ, একালের তরুণতর শিল্পীরা যদি সত্যিই রবীন্দ্রনাথের গানকে যথাযথভাবে গাইতে চান তবে তাঁদের উচিত আগের পর্বের ওইসব শিল্পীর গান বেশি করে শোনা এবং তাঁদের সাক্ষাৎ শিষ্যদের কাছ থেকে যতটা সম্ভব গান 'নেওয়া'। তবে টেলিভিশনের পর্দায় জনপ্রিয় হবার জন্য শিল্পীরা যেভাবে গাইছেন তাতে মনে হয় না রবীন্দ্রনাথের 'আমার গান' গাইবার কোনো সদিচ্ছা এঁদের আছে।

ইন্দ্রনীল রায়ের 'গানের রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের গান' একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ। এই প্রবন্ধে আছে রবীন্দ্রনাথের গান রচনার পটভূমি, কথা ও সুরের সাযুজ্য বিষয়ে আলোকপাত, নিছক কাব্য হিসেবে গানের পাঠযোগ্যতা, রবীন্দ্রনাথের গানে ভাবের প্রাধান্য, রাগমিশ্রণ ইত্যাদি নানা প্রসঙ্গ। এসব প্রসঙ্গ বহু-আলোচিত, বহুচর্চিত। এখানে লেখকের বক্তব্যে তেমন মৌলিক কিছু দেখা গেল না। তবে কয়েকটি গানের রূপায়ণে গুণী শিল্পীদের অকারণ বাড়াবাড়ির কথা যখন বলা হয়, তখন বোঝা যায় এই লেখক রবীন্দ্রনাথের গানের 'ভিতরমহল'-কে ঠিকই চিনতে পেরেছেন। 'মেঘের পরে মেঘ জমেছে' এবং 'মরি লো মরি আমায় বাঁশিতে ডেকেছে কে' এ-দুটি গান লেখক উদাহরণ হিসেবে তুলেছেন। সত্যিই তো, যাঁরা শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কন্ঠে শুনেছেন (তাঁর গান শেখাবার সময়) তাঁরা বুঝবেন, অধিকাংশ শিল্পীই গানটির মর্ম না বুঝেই গেয়ে যান। সুরকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ভাব বা মর্মকে মর্যাদা না দেওয়ার ফলে বহু গানই ধ্বস্ত হয়।

তপন রায়ের 'রবীন্দ্রসংগীত ও পাশ্চাত্য সংগীত' একটি ভালো রচনা। তপনবাবু গতানুগতিক পথে হাঁটেননি। এটা নিশ্চয় একটা বড়ো কথা। এই প্রসঙ্গ উঠলেই সচরাচর লেখকেরা রবীন্দ্রনাথের গানে পাশ্চাত্য সংগীতের প্রভাব খোঁজেন এবং দেখাতে সচেষ্ট হন কোন কোন গানে পাশ্চাত্য সুরের ছায়া আছে কিংবা কোন কোন গান পাশ্চাত্যের গানকে অবলম্বন করেই রচিত। তপনবাবু পাশ্চাত্য সংগীতে রবীন্দ্রনাথের মুগ্ধতার কথা বলেছেন, ওদেশের ধ্রুপদি সংগীত সম্বন্ধে ধীরে ধীরে কীভাবে তাঁর বোধ ও মুগ্ধতা আসে তা বর্ণনা করেছেন আকর্ষকভাবে। পাশ্চাত্য সুরে গান বাঁধার খবর তিনিও দিয়েছেন বটে, তবে তাঁর রচনায় একটি প্রায় অনালোচিতপূর্ব প্রসঙ্গও এসেছে। তা হল 'পশ্চিমি সুরকারদের রবীন্দ্রকাব্য অবলম্বনে সংগীতরচনা'। বিষয়টি অত্যন্ত কৌতূহলজনক। এ নিয়ে আলোচনা খুব-একটা চোখে পড়ে না। তপনবাবু রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান অবলম্বনে রচিত পাশ্চাত্য সংগীতের একটি তালিকাও হাজির করেছেন। তালিকাটিতে আছে ৮৯টি গানের নাম। অবশ্য এগুলিই সব নয়। সন্দেহ নেই, এই নিবন্ধটি বহু সংগীতপ্রেমীর মন কাড়বে।

আশীষ লাহিড়ীর 'মোহন রূপ ও মরণ-নাচ' আর একটি উৎকৃষ্ট রচনা। রবীন্দ্রনাথের গানের অন্তর্লোক বিষয়ে এটি একটি গভীর সমীক্ষণ। সমগ্র জীবনে ও জীবনবোধে লক্ষ করি আধ্যাত্মিকতা ও প্রশ্নমথিত উত্তরহীন সংশয়ের দোলাচলতা। যেন তিনি প্রশ্নাকুলতা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। 'সেই দহনেই জেগে ওঠে তাঁর গান'। রবীন্দ্রনাথের গানে 'আলো-অন্ধকারের তোলাপাড়া', 'বিষণ্ণতা ও বিষণ্ণতা-মুক্তির দ্বৈধ' লক্ষ না করে উপায় নেই। কখনো তিনি প্রকৃতির মোহনরূপে মজেন, কখনো মজেন না, প্রকৃতির প্রাণদায়ী মাতৃমূর্তি যেমন দেখেছেন তিনি, তেমনি দেখেছেন তার প্রাণহরণী রূপও। এইভাবে তাঁর বহু গানেরই দ্বন্দ্ব-বন্ধনের দুই মেরুতে অবস্থান।

'কল্পলতা'-র একটি অতি উৎকৃষ্ট রচনা শংকর চট্টোপাধ্যায়ের 'সুরের দীক্ষা'। এটি বিষয়ে ও মেজাজে এই গ্রন্থের অন্য সব রচনা থেকে আলাদা। দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ দশকে ব্যাপ্ত তাঁর সংগীতশিক্ষকের জীবন। প্রশিক্ষক হিসেবে এই সুদীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর মনে যে প্রশ্ন জাগিয়েছে সেগুলি যাচাই করেছেন শংকর চট্টোপাধ্যায়। শুধু তা-ই নয়, সেসব প্রশ্নের উত্তরও সন্ধান করেছেন। রবীন্দ্রসংগীতের শিক্ষণ-গায়নের ক্ষেত্রে তাঁর বিচার-বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা তিনি সর্বকালের এক শ্রেষ্ঠ শিল্পী-শিক্ষককে আচার্য হিসেবে পেয়েছিলেন, এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর অর্জিত শিক্ষাকে নিজস্ব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান শিখিয়ে চলেছেন প্রায় পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন বছর ধরে। বর্তমান আলোচক শংকরবাবুর এই সুদীর্ঘ ধারাবাহিক সংগীতশিক্ষণের সাক্ষী। শংকর চট্টোপাধ্যায়ের এই রচনায় দুটি দৃষ্টিভঙ্গির অদ্ভুত ঐক্য দেখতে পাই — ব্যক্তিগত নিরীক্ষার প্রকাশ ও নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টি। তাঁর নিবন্ধে আলোচিত হয়েছে কয়েকটি গুরুতর প্রসঙ্গ। রবীন্দ্রনাথের গানে রাগসংগীতের চর্চা কতদূর প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক? রাগসংগীতে দক্ষ হলেই কি রবীন্দ্রসংগীতে উত্তম গায়ক হওয়া যায়? না কি রাগসঙ্গীত শেখা দরকার রবীন্দ্রনাথের গানকে বোঝবার জন্য, 'পাবার জন্য'? একজন প্রশিক্ষকের কাছে স্বরলিপির গুরুত্ব কতটা? গুরুর কাছে শেখা এবং স্বরলিপির উপর নির্ভরতা — কোন্‌টাকে গুরুত্ব দেবে শিক্ষার্থী? শংকরবাবুর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এসব প্রশ্নের উত্তর-সন্ধানে সহায়ক হয়েছে। একজন প্রশিক্ষককে কি শিল্পীও হতে হয়? লেখকের মতে প্রশিক্ষক একজন উত্তম শিল্পীও যদি হন, তবে শিক্ষার্থীর শিক্ষা যান্ত্রিক বা গতানুগতিক হয় না, সে তার সামনে পেয়ে যায় একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত, প্রেরণা পায় উত্তমশিল্পী হবার।

সৌমিত্রকুমার লাহিড়ী 'শ্রোতার বিচারে রবীন্দ্রসংগীত গায়কি' নিবন্ধে ভালো আলোচনা করেছেন। রবীন্দ্রসংগীতের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের গায়নভঙ্গিতেও পার্থক্য আছে, ছিল। অথচ তাঁদের গানকে প্রকৃত রবীন্দ্রসংগীত বলতে দ্বিধা তো হয় না। অমিতা সেন, সাহানা দেবী, মালতি ঘোষাল, অমিয়া ঠাকুর, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র, সুবিনয় রায়, সুনীলকুমার রায়, সমরেশ চৌধুরি, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন — এঁরা তো একই ভঙ্গিতে গান করেননি। এঁদের প্রত্যেকের গানই রবীন্দ্রসংগীতের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও। অন্য দিকে রবীন্দ্রসংগীতে প্রশিক্ষিত নন এমন শিল্পীর স্বরলিপি-সম্মত গানকেও তো রবীন্দ্রসংগীত বলতে ইচ্ছে করে না। তাহলে গায়কি কী? প্রবন্ধটি এমন অনেক প্রশ্ন তুলেছে।

অন্যান্য প্রবন্ধের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হল অনির্বাণ রায়ের 'গীতবিতান পাঠ: প্রেমপ্রকৃতিকথা'। শিবশম্ভু পাল রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে তেমন কোনো অন্তর্লীন আলোচনা করেননি, গানের কাঠামো বা শৈল্পিক উৎকর্ষ বিষয়েও কিছু বলেননি, কিন্তু তাঁর কিশোরকাল থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে কীভাবে তিনি পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গানকে, শ্রেষ্ঠ শিল্পীরা কীভাবে তাঁর গান শোনার অভ্যাসকে তৈরি করে দিয়েছেন তার একটা চমৎকার ব্যাখ্যান পাওয়া যায় তাঁর রচনাটিতে।

'কল্পলতা'-র পরিকল্পনা এই আলোচকের যে খুব ভালো লেগেছে এ কথা বলা যাবে না। তবে এর প্রবন্ধ অংশে নিঃসন্দেহে কয়েকটি ভালো রচনা স্থান পেয়েছে। সেখানেই বইটির সার্থকতা।