Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines






পরবাসে দেবজ্যোতি ভট্টাচার্যর লেখা :

বই





অন্য কোনখানে

দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

প্রচ্ছদ | ১ | ২ | ৩ |

তৃতীয় অধ্যায়
খ্রিঃ ৩০৪০







|| ১ ||


আকাশটা আজ সকাল থেকে মেঘলা করে আছে। পশ্চিম আকাশে জিফরানের বিরাট গোলকটা ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের আড়ালে দুলছিল। নক্ষত্রের আলোয় উজ্জ্বল তার শরীর থেকে মায়াবি আভা চুঁইয়ে আসছে। ইনা চুপচাপ সেইদিকে তাকিয়ে বসেছিল। তার আজ মন খারাপ। নিচে ছুটন্ত রাস্তার গুন্‌গুন্ শব্দ ছাড়া চারপাশে আর কোন শব্দ নেই এখন।

“আমার মেয়েটা আজ এত ভালো মেয়ে হয়ে গেল কী করে?” পেছন থেকে দুটো নরম হাত এসে হঠাৎ জড়িয়ে ধরল তাকে।

ইনা মুখ ঘুরিয়ে দেখল একবার। জিলিয়ানের উজ্জ্বল বড়ো বড়ো চোখ তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

“কীরে, স্কুল তো নেই। সারাটা দিন কী করবি? নাকি তোর সেই ডাস্টম্যান আবার আসবে আজকে? কী যে স্বপ্নের জগতে থাকিস সারাক্ষণ!”

ইনা ঘাড় নেড়ে মিষ্টি হাসল, “কেন, হাইপারভিশান দেখব। ওমা, আজ না জার্নি টু দ্য সেন্টার অব গ্যালাক্সি দেখাবে।”

“ধুস। যতো সব গুলগল্প। ওসব বানানো যুদ্ধটুদ্ধের ছবি দেখে কী যে মজা পাস তোরা! মানুষ এখনো একশো আলোকবর্ষের গণ্ডিই ছাড়াতে পারল না, তা একেবারে সেন্টার অব গ্যালাক্সি। কতটা রাস্তা জানিস? তিরিশ হাজার আলোকবর্ষ। ওইসব দেখে দেখেই মাথাটা বিগড়েছে তোমার। যতোসব উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখছিস আজকাল। গ্যালাক্সির কেন্দ্রে কি আছে জানিস?”

“হুঁউ। একটা বিরাট ব্ল্যাক হোল। ওর মধ্যেই তো ক্যাপ্টেন ইয়োহানা আর লিটল জেন ঝাঁপ দেবে। তারপর যা হবে না! উফ্‌! ওমা, আজ তুমি আমার সঙ্গে সিনেমাটা দেখবে?”

জিলিয়ান মিষ্টি করে হাসল একবার, “না মা। অফিসে সত্যিসত্যি ভীষণ দরকারি কাজ রয়েছে যে আমার।”

“ধুস্‌স্‌। ছ মাস ধরে কী কাজ করছ তুমি বলো তো? ছুটির দিনটিন কিচ্ছু নেই। রোজ রোজ খালি অফিস আর অফিস। কেন? বাবা যখন বাড়িতে থাকে তখন তো এমন করে না? ও মা, জানো বাবার অফিসের ল্যাবরেটোরিতে না এই এতবড়ো একটা হিয়াকের কংকাল রয়েছে। কী বড়ো বড়ো দাঁত। বাবা আমায় কী বলেছে জানো?”

“কী বলেছে সোনা?”

“এবারে সামার ভেকেশানের সময় আমাকে পৃথিবীতে নিয়ে যাবে।”

জিলিয়ান চুপ করে মাথা নাড়ল। ইচ্ছেটা তারও আছে। কতবারই তো মনে হয়েছে, যদি একবার ঘুরে আসা যায়। আত্মীয়স্বজন তারও তো কম নেই সেখানে। কিন্তু সমস্যাটা ভিসার। উজানের একটা সুবিধে আছে। প্যালিওন্টোবায়োলজির গবেষক হিসেবে একশো আলোকবর্ষের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা পঞ্চাশটা আর্থ কলোনির প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে জানে। তাছাড়া তার পেশাটা আদৌ স্পর্শকাতর কিছু নয়। যুদ্ধবিগ্রহ আর প্রতিযোগিতার তিক্ততা যতই থাক না কেন, সৌরমণ্ডলের কিংবা আর্থ কলোনির যেকোন বিশ্ববিদ্যালয়েই তার দরজা সবসময় খোলা। যেতে চাইলে কেউ বাধা দেবে না। কিন্তু জিলিয়ান? নাঃ। সৌরমণ্ডল তাকে কখনোই ভিসা দেবে না। আলফা সেন্টাউরির উপনিবেশের সঙ্গে সৌরমণ্ডলের সম্পর্কের তিক্ততা এই মুহূর্তে চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছেছে। একেকসময় ভারী আফশোস হয় জিলিয়ানের। গ্রহতত্ত্ব নিয়ে ভালই তো ছিল সে তার লেবরেটোরির চার দেয়ালের মধ্যে। সারা জীবন নিশ্চিন্তে করে চলবার মত কাজও ছিল হাতে। একশো বছর ধরে চলতে থাকা সেন্টাউরির তিনটে তারার সমস্ত গ্রহের মানচিত্র তৈরির প্রজেক্ট। কী প্রয়োজন ছিল তার সেইসব ছেড়ে প্রতিরক্ষা বিভাগের এই রিগান প্রজেক্টে যোগ দেবার?

ইনার অবশ্য তার এইসব ভাবনাচিন্তার দিকে খেয়াল ছিল না। পৃথিবী নিয়ে তার হাজারো কৌতূহল মেটাবার জন্যই তখন সে ব্যস্ত হয়ে আছে। “আচ্ছা মা ওখানে তো আকাশে জিফরান নেই, না?”

“উঁহু। চাঁদ আছে।”

“চাঁদ কি পৃথিবীর গ্রহ?”

“ইনা, তোর পড়াশোনা কিন্তু কিচ্ছু হচ্ছে না। পৃথিবী কি আমাদের এরিয়াকের মত জিফরানের উপগ্রহ নাকি? পৃথিবী নিজেই একটা গ্রহ।”

“জিফরানের মতন?”

“উঁহু। অতবড়ো হলে তার মাধ্যাকর্ষণে সেখানে মানুষ চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে যাবে যে! পৃথিবীটা আমাদের এরিয়াকের মতই বড়ো। তবে সে কোন গ্রহের চারপাশে ঘোরে না। সে ঘোরে—”

“এইবারে মনে পড়েছে মা । উইকলি টেস্টে এসেছিল। আমি জানি জানি—”

“কী জানিস বল?”

“পৃথিবী তার আলফা সেন্টাউরি বি-র চারপাশে—”

“আলফা সেন্টাউরি বি? ঠিক করে বল—”

“ওই হল। তার তারার চারপাশে—”

“তারার নাম কী?”

“উম্‌ম্‌--সূ—সুজ্রুন?”

“না সুজ্রুন নয়। সূর্য।”

“তাহলে সেখানে আলো হয় কী করে মা? তারা তো এই এতটুকু হয়। রাত্তিরবেলা আলফা সেন্টাউরি বি-কে যে আকাশে দেখি তাতে আলো হয় নাকি?—”

“দূর বোকা? এতটুকু কেন হবে? পৃথিবীটা সূর্যের অনেক কাছে। সেখানে আকাশে সূর্যটাকে এই এতোবড়ো দেখায়।”

“মানুষরা সেখানে পুড়ে যায় না?”

“উফ্‌ফ্‌। ইনা—তোর মাথায় ঠিক কত প্রশ্ন জমা আছে বল তো? ওসব কথা বাদ দে এবারে। রাজ্যের কাজ পড়ে আছে আমার। সেসব সেরে রেখে তবে বেরোতে হবে। তোমার বাবা তো এখন কোথায় কোন পাহাড়ে তাঁবু খাটিয়ে মাটি খুঁড়ে হিয়াক না টিরিয়াক তার কংকাল খুঁজছেন। ফিরবে কবে ভগবান জানে। তোকে খাইয়ে রেখে আমি চট করে—”

পাশের ঘর থেকে মৃদু একটা মিষ্টি আওয়াজ ভেসে এল হঠাৎ। আওয়াজটা পেয়েই জিলিয়ান হঠাৎ কথা শেষ না করে সেদিকে চলে।

ইনা আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে মার পিছু পিছু ঘরটার ভেতর ঢুকে পড়ল। বাড়িতে থাকবার সময় মা এমনিতে বিশেষ ফোনটোন ধরে না, কিন্তু ফোনে এই রিংটোনটা বাজলে মা আর কোনো দিকে তাকাবে না। আজকেও তার ব্যতিক্রম হল না। নতুন অফিসে ঢোকবার পর গত ছ মাস ধরেই ইনা এই একই জিনিস দেখছে। বাবা যখন বাড়িতে থাকে তখন এ ফোনটা এলে বাবাও মাকে বিরক্ত করে না।

এমনিতে এ ফোনে কথা বলবার সময় মা আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা গলায় রাজ্যের খটোমটো বিজ্ঞানের কথাবার্তা বলে। ইনার সে সব মাথায় মোটেই ঢোকেন। আজ কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই সেরকম হল না। ফোন ধরে মিনিটখানেক শুনেই মা উত্তেজিত গলায় বলে, “কেন? পেরিকুইন রেডিয়েশান—কেন?”

ইনা তার মানে কিচ্ছু বুঝল না, শুধু মার হাবভাব থেকে এইটুকু বুঝতে পারছিল, অফিসে কিছু একটা ঘটেছে। তারপর তো যথারীতি রিগান, ন্যানোস্কেল রোবট এইসব উদ্ভুট্টি কথাবার্তা বলতে বলতে মা তাড়াতাড়ি ওয়ার্ডরোবের দিকে হাত বাড়িয়েই তার আয়নায় দেখে ইনা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। দেখেই “আমি এখুনি রওনা হচ্ছি,” বলে ফোনটা কেটে দিয়ে ইনার দিকে চোখ গোলগোল করে তকিয়ে বলে, “বড়োদের কথার সময় ঘরে কেন রে? বেরো শিগগির, আমি জামা পালটাব—”

মিনিটকয়েক বাদে বাইরের পোশাক পরে বের হয়ে এল মা। তারপর দৌড়ে দৌড়ে ইনার সামনে এক প্লেট সেদ্ধ সবজি আর দুটো উখরালের ফ্রাই সাজিয়ে দিয়ে তার দিকে একটা চুমু ভাসিয়ে দিয়ে সোজা বেরিয়ে চলে গেল। খানিক বাদে জানালা দিয়ে ইনা দেখতে পেল মার স্বচ্ছ গোলকটা ছাদ থেকে আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে।

খানিক বাদে ইনা জানালার পাশ থেকে এসে খেতে বসল। খাওয়া শেষ করে প্লেটটা রান্নাঘরে রেখে আসতে মিনিট পাঁচেক সময় লাগল তার। তারপর ফ্ল্যাটের দরজা ভালো করে বন্ধ করা আছে কিনা দেখে নিয়ে, ডাইনিং স্পেসের জানালাটা খুলে দিয়ে আস্তে আস্তে ডাকল, “সোমক?”

জানালার বাইরে জিফরানের আলোয় একটা হালকা অন্ধকার ছোপের মতন একটা ধুলোর মেঘ ভাসছিল। ডাক শুনে সেটা এইবার ঘরের মধ্যে ঢুকে এল। ধুলোকণাগুলো দ্রুত একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে আস্তে আস্তে একটা মানুষের অবয়ব গড়ে তুলছিল। ঠিক তার বাবার মত দেখতে। সোমক ইচ্ছে করলে যে কোন মানুষের মত চেহারা নিতে পারে। আর, ইনার মনটাও পড়তে পারে বুঝি। নইলে আজ যে তার বাবার জন্য মন কেমন করছে সেটা সে বুঝলো কী করে?

“এই যে ইনা। ভালো আছো?”

“তুমি কাল রাত্তিরে এলে না কেন? আমি সেই গল্পের শেষটা শোনবার জন্য কত্তো রাত অবধি জানালা খুলে তোমার জন্য বসেছিলাম জানো? তুমি প্রমিস করেছিলে রোজ একবার করে আসবে—”

“এ হে হে। ভারী ভুল হয়ে গেছে গো। কালকে আমার বেজায় ঘুম পেয়ে গেছিল বুঝলে? খেয়াল ছিল না। ঠিক আছে। এসো এখন গল্পের বাকিটা হোক।”

ইনার মুখে ফের ফুরফুরে হাসি ফুটে উঠল। মাথা নেড়ে বলল, “জানো তো কী মজার ব্যাপার?”

“কী হয়েছে?”

“মাকে আমি বলেছিলাম আমার একটা ডাস্টম্যান বন্ধু আছে। মা যখন থাকে না তখন সে আমার সঙ্গে খেলতে আসে।”

“সোমকের চোখদুটো একটু তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেই ফের স্বাভাবিক হয়ে এল, “মা শুনে কী বলল?”

“হাসল শুধু। বড়োরা খুব বোকা হয়, না?”

“না ইনা। বড়োদের নিয়ে এসব কথা বলতে নেই।”

“তাহলে মা বিশ্বাস করে না কেন তোমার কথা?”

“না বিশ্বাস করাই ভালো ইনা। নইলে আমি আর তোমার কাছে আসতেই পারবো না।”

ইনার মুখটা একটু কালো হয়ে গেল। ঠোঁটদুটো ফুলে উঠেছে, “না সোমক। তুমি আসবে আসবে আসবে। আমি মাকে আর কক্ষণো কিছু বলব না। প্রমিস।”

“আচ্ছা বেশ। এইবারে আয়, আমার কোলের কাছে চুপটি করে বোস তো, আমি তোকে গল্পের শেষটা বলে দি—”

বালিকাটি তার এই নতুন পাওয়া বন্ধুর কোলে নিশ্চিন্তে মাথা রেখে বসে থাকে। তার কানের কাছে নিচু স্বরে মানুষটি এক অজানা দেশের গল্প বলে যায়। সেখানে একসময় কত পাহাড়পর্বত সমুদ্র নদীর ভিড় ছিল। আকাশ থেকে তাকে দেখলে মনে হত একটা উজ্জ্বল নীল রত্নখণ্ড ভাসছে যেন। শুধু তাতে প্রাণের স্পন্দন ছিল না। তারপর একদিন একটা বিরাট নৌকা ভেসে এল তার আকাশে। সেই নৌকায় জমা করা ছিল লক্ষকোটি জীবের ঘুমন্ত বীজ—

কথা বলতে বলতেই তার হাতের আঙুলগুলি মেয়েটির কপাল স্পর্শ করে থাকে। আণুবীক্ষণিক দু একটি ধুলিকণা তার হাতের আঙুল থেকে বের হয়ে কোষের সুক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে মেয়েটির করোটির মধ্যে ঢুকে আসে—সেখানে তার স্মৃতিকোষে সঞ্চিত হয়ে আছে গত রাত থেকে তার শোনা তার মায়ের সমস্ত কথাবার্তার স্মৃতি—

হঠাৎ একটু কেঁপে উঠে একেবারে স্থির হয়ে গেলেন মানুষটি। ইনা চোখ খুলে বলতে গিয়েছিল, “কী হল সোমক? থেমে গেলে কেন?” কিন্তু ততক্ষণে মানুষটি তাকে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর শরীরটাকে আবছা করে দিয়ে গড়ে উঠছে ধুলিকণার একটা স্রোত।

জানালার বাইরে এসে জিফরানের মৃদু জ্যোৎস্নামাখা বাতাসে ধুলিপিণ্ডটা স্থির হয়ে রইল একটুক্ষণ। তারপর জিলিয়ানের ছুটন্ত যানটির অবস্থান নির্ণয় করে নিয়ে অকল্পনীয় গতিতে ধেয়ে গেল সেইদিকে।


********

“সাইফা, আপনি নিশ্চিত? গত ছ মাস ধরে সমস্ত রকম পরীক্ষা করেও যে রহস্যটা ভেদ করা যায় নি, তা হঠাৎ করে আপনার হাতে এইভাবে ধরা পড়বে সেটা ভাবতে আমার একটু অসুবিধে হচ্ছে। তাছাড়া এক্ষেত্রে পেরিকুইন রেডিয়েশান দিয়ে স্ক্যান করবার কথা আপনার মাথায় এল কী করে? মনে রাখবেন এই নিরীক্ষণের ফলাফল বারংবার খুঁটিয়ে দেখা হবে—”

“নিশ্চিত না হয়ে আমি আপনাকে বাড়িতে যোগাযোগ করিনি জিলিয়ান। ব্যাপারটা হঠাৎ করেই ঘটে গেছে আজ সকালে। লেফটান্যান্ট রিডিক ও তাঁর দল চিন্তাতরঙ্গ বিশ্লেষণ নিয়ে গবেষণাপ্রকল্প চালাচ্ছেন তা তো আপনি জানেন। আজ সকালে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে রিগানের নমুনার একটা স্লাইড তাঁকে দিয়ে মজা করেই বলেছিলাম একবার পেরিকুইন রেডিয়েশান দিয়ে পরীক্ষা করতে। আর তারপরেই বিচিত্র ফলাফলগুলো কমপিউটারের পর্দাতে আসতে শুরু করায় অনুসন্ধান করতে ব্যাপারটা ধরা পড়ে। তবে আপনাকে জানাবার আগে সমস্ত তথ্য বারবার করে যাচাই করা হয়েছে।”

“গুড। চার ঘন্টা পরে অ্যাডমিরাল সোরাক এর সঙ্গে একটা সাক্ষাতকারের ব্যবস্থা করুন। সেখানে সমর উপদেষ্টা শ্রীমতী আব্রাহামও যেন কনফারেন্স কল-এ উপস্থিত থাকেন। এর ঘন্টাখানেক পর একটা জরুরি সভা ডাকতে হবে তাঁকে। তাতে যাঁরা উপস্থিত থাকবেন আমি তাঁদের নামের তালিকা পাঠিয়ে দিয়েছি আপনার ফাইলে।”

সাইফার গলায় একটু অস্বস্তির ছোঁয়া এল হঠাৎ, “কিন্তু জিলিয়ান, আগে অ্যাডমিরাল এবং সমর উপদেষ্টার সম্মতি জেনে নেবার পর অন্যদের খবর দিলে ভালো—”

“প্রয়োজন নেই সাইফা। এ ব্যাপারের অনুরোধপত্রে আপনি ‘খ’ স্তরের নিরাপত্তা সংকেত যোগ করবেন। অ্যাডমিরাল এবং সমর উপদেষ্টা সময় দিতে বাধ্য থাকবেন।”

“জিলিয়ান, ‘খ’ স্তরের নিরাপত্তা সংকেত-মানে যুদ্ধকালীন তৎপরতার সাবধানবাণী—আপনি ভেবে বলছেন তো? আমি—”

“এ ব্যাপারে আমি নিজের দায়িত্বে আপনাকে আদেশ দিচ্ছি সাইফা। আপনার কোন দায়িত্ব এতে থাকবে না,” জিলিয়ানের গলা কঠিন হল, “আমি কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছোচ্ছি। নিজে একবার সমস্ত ব্যাপারটাকে পরীক্ষা করে দেখে নেব সাক্ষাতকারের আগে। ওদিকে সব তৈরি আছে আশা করি।”

স্বচ্ছ গোলকটা এরিয়াকের আয়নমণ্ডল ছাড়িয়ে ধীরগতিতে আরো ওপরের অন্ধকারের দিকে উঠে যাচ্ছিল। বাঁপাশের আকাশ জুড়ে অতিকায় জিফরান একটা দেয়ালের মতন জেগে আছে। তার পটভুমিকায় অন্ধকারের মধ্যে একটা আলোকবিন্দু দ্রুত বড়ো হয়ে উঠতে উঠতেই মাকড়শার মতন আলোকিত বাহুগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছিল অন্ধকার আকাশে। স্টেশান ১৬!

ফিনফিনে হালকা ধুলিকণার স্রোতটা যখন যানটার নাগাল ধরল, তখন তা এরিয়াকের বায়ুমণ্ডলের সম্পূর্ণ বাইরে পৌঁছে গেছে। প্রায় অদৃশ্য একটা আবরণের মত গোটা যানটির শরীরে ছড়িয়ে গিয়ে তা ছুটে যাচ্ছিল যানটার সাথে। মৃদু স্থিরবিদ্যুতের আকর্ষণে নিজেদের আটকে নিচ্ছিল তার সেরামিক বহিরাবরণের গায়ে—


********

খানিক বাদে, গতি বিন্দুমাত্র না কমিয়ে জিলিয়ানের যানটা সটান এসে ঝাঁপ দিল স্টেশান ১৬র একটা বাহুর দিকে। তার লক্ষ্য বাহুটির মাথায় খুলে যাওয়া একটা এয়ারলক।

এয়ারলক বন্ধ হবার সঙ্গেসঙ্গেই যানের গায়ে ছড়িয়ে থাকা প্রায় অদৃশ্য ধুলিকণাগুলো বাতাসে ভেসে উঠল। তারপর সবার অলক্ষ্যে ছড়িয়ে পড়ল গোটা মহাকাশকেন্দ্রের বাতাসে। তাদের সতর্ক সংকেতগ্রাহক যন্ত্রেরা শুষে নিচ্ছিল সেখানে ঘটে চলা সমস্ত শব্দ ও দৃশ্যের ছবি--


********

“জেন্টলমেন। ছ মাস আগে জিফরান গ্রহের এই ছোট্ট উপগ্রহটি নিয়ে প্রতিরক্ষা দফতর যখন চূড়ান্ত গোপনীয় প্রজেক্ট রিগান শুরু করে, তার একটা সুনির্দিষ্ট কারণ ছিল—”

অন্ধকার ঘরের একপাশে ছোট পোডিয়ামটাতে দাঁড়ানো জিলিয়ানের ওপর একখণ্ড আলো পড়েছে শুধু। অন্যদিকের দেয়ালজোড়া পর্দার ছোটো ছোট খোপে সারিসারি মুখগুলোর দৃষ্টি তার দিকেই ধরা।

জিলিয়ানের কথাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে ডানদিকের একটা খোপ থেকে ছোটোখাটো মানুষটি হঠাৎ তীক্ষ্ণ গলায় বলে উঠলেন, “মাপ করবেন ডঃ জিলিয়ান, আমরা নির্বাচিত সরকারী প্রতিনিধিরা ওয়ার কমিটির সদস্য হতে পারি বটে, কিন্তু আসলে আমাদের পেশা রাজনীতি। মহাকাশবিদ্যা নয়। কাজেই, জিফরানকে ঘিরে ঘুরতে থাকা মূল্যহীন একটা পাথরের টুকরোকে কেন আপনারা এত চূড়ান্ত গোপনীয় প্রতিরক্ষা প্রজেক্ট হিসেবে নিয়ে সরকারী অর্থ খরচ করতে শুরু করলেন সে ব্যাপারটা গোড়ায় কিছুটা পরিষ্কার করে নিলে সুবিধে হবে।”

জিলিয়ান তার পাশে বসা অ্যাডমিরাল সোরাকের দিকে তাকাল একবার। সোরাক কিছু বলছিলেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে সুদক্ষ মানুষটি রাজনৈতিক নেতাদের সামনে একেবারেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। বিশেষত আজিয়ান মহাকাশ নগরীর প্রাদেশিক প্রতিনিধি এই ওলাফ বেইটারের সামনে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দামন্ত্রকের নির্বাচিত মন্ত্রী বেইটারের একটি অন্য পরিচয় রয়েছে। আলফা সেন্টরি উপনিবেশের উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শাখাটির প্রধান নেতা তিনি। পার্থিব শাসনের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বেড়ে চলতে থাকা অসন্তোষের ডানায় ভর করেই তাঁর রাজনৈতিক উত্থান। “স্বাধীনতার সংগ্রাম-এই জীবনকালেই” এই শব্দবন্ধটি তাঁর দলের স্লোগান। আগেও নানা সময় তিনি সোরাকের বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে খোলাখুলি সমালোচনা করেছেন নানা সভাতে। সোরাক যখন প্রজেক্ট রিগানের ব্যাপারে সম্মতি দেন, তখনও, ‘স্বাধীনতার যুদ্ধের দিক থেকে জনগণের নজর সরিয়ে নেয়া চক্রান্তকারী সোরাক’-এর অপসারণ চেয়ে জিগির তুলেছিল তাঁর দল।

সামান্যক্ষণ চুপ করে থেকে নিজের কথাগুলোকে সাজিয়ে নিল জিলিয়ান। মাথা ঠাণ্ডা করে এগোতে হবে এখানে-

“কেন প্রতিরক্ষা দফতর প্রজেক্ট রিগান শুরু করলেন, সে প্রসঙ্গে আসবার আগে রিগান সম্পর্কে দু একটি তথ্য পেশ করে নিলে তা সকলের পক্ষে সুবিধাজনক হবে। এটি যে এরিয়াকের মতই জিফরানের আর একটি উপগ্রহ সে কথা আপনারা সকলেই জানেন। কিন্তু আয়তনে তা এরিয়াকের তুলনায় একেবারেই তুচ্ছ। বিজ্ঞানিদের মতে এটি আসলে জিফরানের মহাকর্ষে ধরা পড়ে যাওয়া কোন মহাজাগতিক উল্কাখণ্ড। আকারে ক্ষুদ্রতার জন্য পাঁচ শতাব্দি আগে এইখানে উপনিবেশ স্থাপন করতে আসবার আগে এর অস্তিত্ব আমাদের জানা ছিল না। এরিয়াকে উপনিবেশ স্থাপনের পর বিজ্ঞানিরা রিগানের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন ও সেইসঙ্গে এর কতগুলো বিচিত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেন যা প্রকৃতির স্বাভাবিক আইন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।”

“যেমন?”

“যেমন এর কক্ষপথ। মহাজাগতিক বস্তুদের সাধারণ নিয়ম না মেনে এটি পুব থেকে পশ্চিম দিকে ঘোরে।”

“সেটা অসম্ভব নয় ডঃ জিলিয়ান। আপনি জানেন—”

হাত তুলে ওলাফ বেইটকে থামিয়ে দিল জিলিয়ান, “আপনি শুক্রগ্রহ কিংবা নেপচুনের কথা বলবেন আমি জানি। হ্যাঁ তা ঠিক। তবুও মহাবিশ্বে এ ঘটনা এতটাই বিরল যে ব্যাপারটা দৃষ্টি আকর্ষণ করবেই। তবে এটাই একমাত্র কারণ নয়। দ্বিতীয় কারণটা হল, এত ছোটো একট বস্তুখণ্ড জিফরানের আকর্ষণে এলে তার বেশিদিন আকাশে ভেসে থাকবার কথা নয়। মাধ্যাকর্ষণের যে সূত্র আজ থেকে দেড় হাজারেরও বেশিকাল আগে নিউটন আবিষ্কার করেছিলেন তা সত্যি হলে, একটা স্ক্রু এর প্যাঁচের মত কক্ষপথে এর জিফরানের বুকে বহুকাল আগেই আছড়ে পড়বার কথা। অথচ বাস্তবে তা ঘটে না। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে এই উপগ্রহটি নিজেনিজেই খুব সুক্ষ্মভাবে তার কক্ষপথের অবস্থানকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজের স্থিতাবস্থা বজায় রেখে চলে।”

“কিন্তু এইসব রহস্যের সঙ্গে প্রতিরক্ষা দফতরের কী সম্পর্ক সেটি যদি আমাদের একটু বুঝিয়ে বলেন ড: জিলিয়ান—”

কথাগুলো ভেসে এল অন্য একটি পর্দা থেকে। জিলিয়ান একবার চোখ তুলে চাইল সে দিকে। মহানায়কের সচিব হোরাস সিংতে মুখ খুলেছেন। পর্দার সবকটি মুখ উদগ্রীব চোখে তাকিয়ে ছিল তাঁর দিকে।

“বলছি। দীর্ঘকাল ধরেই রিগানের এই আচরণ আমাদের কৌতুহলী করে রেখেছে। একে নিয়ে বিজ্ঞানিমহল ছাড়া আর কারো বিশেষ আগ্রহ ছিল না বটে কিন্তু সবসময়েই তা আমাদের কৌতুহল ও গবেষণার একটি উপকরণ হয়ে থেকে গেছে; নজরের আড়ালে চলে যায় নি। অবস্থাটা বদলায় ঠিক ছ মাস আগে একটি আবিষ্কারের পর। বছরখানেক হল অবমহাকাশীয় ডেইকি তরঙ্গের অস্তিত্বের নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন প্রতিরক্ষা বিজ্ঞানীরা সে কথা আপনারা জানেন। এই তরঙ্গটি নিয়ে উপস্থিত, স্বাভাবিক স্থানকালের বাধাকে পেরিয়ে আলোর চেয়ে দ্রুতগামী যোগাযোগ ও সংবাদ প্রেরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলবার গবেষণা চলেছে আমাদের।”

“জানি। সরকারি অর্থ খরচ করে আরেকটি আত্মধ্বংসী প্রজেক্ট। আন্তর্মহাকাশ যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনও বেতার তরঙ্গনির্ভর। ফলে পৃথিবীর সঙ্গে যে কোন খবরাখবর আদানপ্রদানে আট বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নের ভিত্তিই এই যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা। একমাত্র এই কারণেই পৃথিবী আলফা সেন্টাউরির উপনিবেশ বা অন্যান্য নক্ষত্রের উপনিবেশগুলোর ওপর সঠিক নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না, এবং এর ফলেই গত পাঁচ শতাব্দিতে সমর প্রযুক্তিতে আমাদের অগ্রগতির সম্পর্কে তাদের কোন স্বচ্ছ ধারণা গড়ে ওঠেনি। অথচ আমরা নিজেরাই সেই ভিত্তিটিকে ধ্বংস করতে চলেছি। এ ব্যাপারে আমার প্রতিবাদকে কোন গুরুত্বই—” ওলাফ ফের কথা বলে উঠলেন। “আপনি অত্যন্ত অদূরদর্শী কথা বলছেন ওলাফ। কেন বুঝতে চাইছেন না, অবমহাকাশীয় ডেইকি তরঙ্গের ব্যবহার অধিগত করতে পারলে কোন সময় খরচ না করেই আকাশগঙ্গার যেকোন প্রান্তের থেকে অন্য প্রান্তে সংবাদ আদানপ্রদানের ক্ষমতা আলফা সেন্টাউরি উপনিবেশের আয়ত্বে চলে আসবে, পৃথিবীর নয়। সেক্ষেত্রে তারকাপুঞ্জের গভীরতম এলাকা অবধি উপনিবেশ স্থাপন ও তাকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে রাখবার ক্ষমতা আমাদের হাতে থাকবে,” হোরাস সিংতের মুখটা লাল হয়ে উঠছিল, “শুধু পৃথিবীর হাত থেকে স্বাধীনতার মত সংকীর্ণ লক্ষ্য নিয়ে আমরা চলছি না বেইটার। আমরা সমগ্র নক্ষত্রমণ্ডলের শাসক হতে চাই। নিজেদের শক্তি সম্পর্কে আপনার মতন নিচু ধারণা আমরা পোষণ করি না।” ওলাফের মুখে একটা বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠল, “আলোচনাসভায় শক্তির দম্ভ দেখানোয় মহানায়কের মাননীয় প্রতিনিধি যতটা দুঃসাহসী, প্রকৃত যুদ্ধের ক্ষেত্রে তাঁর ততটা সাহস বোধ হয় নেই।”

“কী বলতে চাইছেন আপনি?”

“যা বলতে চাইছি তা আপনার অজানা নয় মান্যবর। পাঁচ শতাব্দি আগে এরিয়াক উপগ্রহে প্রথম পার্থিব উপনিবেশের গোড়াপত্তন হয়। তার পর প্রায় পনেরোটি প্রজন্ম ধরে মানুষ এইখানেই জন্মেছে। তারা পৃথিবীকে মাতৃগ্রহ বলে স্বীকার করে না। আমাদেরই অক্লান্ত পরিশ্রম ও সাধনায় আলফা সেন্টাউরি উপনিবেশের বিস্তার এখন তিনটি গ্রহ ও উপগ্রহ এবং সত্তরটি মহাকাশ নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে পৃথিবীর কোন অবদান নেই। অথচ তবুও আমাদের পরিচয় হল, সৌরমণ্ডল থেকে সিনগানি অবধি একশো আলোকবর্ষ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা পার্থিব উপনিবেশগুলোর একটি। স্বাধীনতা অর্জনের যোগ্যতা আমাদের আছে। সামরিক শক্তিতেও আমাদের কাছাকাছি এই মুহূর্তে কেউ নেই। কিন্তু তবুও, পৃথিবীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতার যুদ্ধের সম্মতি দিতে আপনার হাত কাঁপে। জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেন একটা অপ্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিকে। ইতিহাস কিন্তু অদূরদর্শিতার অভিযোগ আমার নয়, আপনার নামেই করবে।”

“ভুল করছেন বেইটার। অদূরদর্শিতা নয়। সাবধানতা। মনে রাখবেন বিজ্ঞান গবেষণার ঐতিহ্য আমাদের থেকে পৃথিবীর বহুদিনের বেশি। ধরুন তাদের হাতে যদি আগে থেকেই আমাদের অজ্ঞাতে কোন ধরনের অবমহাকাশীয় যোগাযোগ প্রযুক্তি থেকে গিয়ে থাকে? সেক্ষেত্রে, আমাদের অগ্রগতির সম্পর্কে তারা প্রতিমুহূর্তেই ওয়াকিবহাল থাকবে। অথচ আমরা তাদের ব্যাপারে অজ্ঞ থেকে মূর্খের মত বিদ্রোহ করে নিজেদের ধ্বংসের বন্দোবস্ত করব,” তৃতীয় একটি পর্দা থেকে প্রতিরক্ষা সচিব তনুজা আব্রাহাম মুখ খুললেন এইবার।

“আপনি আমাদের একটি কল্পিত ভয় দেখাচ্ছেন সচিব মহোদয়া। আপনার উদ্দেশ্য—”

“দাঁড়ান দাঁড়ান বেইটার, আমার কথা এখনো শেষ হয় নি,” তনুজা আব্রাহামের মুখে একটুকরো বিদ্রুপের হাসি খেলা করছিল, “আমি একটা উদাহরণ দিচ্ছি। ধরুন সম্প্রতি এই যে ডেইকি তরঙ্গের আবিষ্কার আমরা করেছি, পৃথিবী যদি বহুকাল আগেই আমাদের অজ্ঞাতে তার আবিষ্কার করে থাকে? নাকি সেটাও একেবারেই অসম্ভব?”

“অসম্ভব শ্রীমতী আব্রাহাম। আমার খবর সংগ্রহকারীরা নিঃসন্দেহে তার খবর পেতেন, এবং সময় লাগলেও সে খবর আমার কাছে এসে পৌঁছাত।”

“সেক্ষেত্রে আমার উপদেশ শ্রী বেইটার, আপনি মন্ত্রকে ফিরে যান ও আপনার ‘খবর সংগ্রাহক’দের কৈফিয়ত তলব করুন,” কথাক’টি বলে তনুজা একবার বাকি মুখগুলির দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তারপর কেটে কেটে উচ্চারণ করলেন, “কারণ তারা ব্যর্থ হয়েছে।”

গোটা সভায় একটা বাজ পড়ল যেন। এইভাবে একজন নির্বাচিত মন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোন সরকারী আমলার প্রকাশ্য সভায় অভিযোগ তোলা একেবারেই রীতিবিরুদ্ধ। ধাক্কাটা খানিক সামলে নিয়ে ওলাফ তনুজার দিকে তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “একজন নির্বাচিত মন্ত্রীর বিরুদ্ধে, সরকারী কর্মচারী হয়ে অনিচ্ছাকৃত দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনা—”

“আপনি দয়া করে এই কথাগুলো আপনার রাজনৈতিক সভার জন্য তুলে রেখে আগে আমার কথাগুলো শুনুন ওলাফ। আমাদের এখন এই খেলার সময় নেই।”

তনুজার গলায় কিছু একটা ছিল। ওলাফ তাঁর উদ্যত রাগটিকে দমন করে নিচু গলায় বললেন, “আপনার অভিযোগের প্রমাণ?”

“সেই প্রমাণ দেবার জন্যই আজকের এই জরুরি সভা। আশা করি আপনারা এইবার আর কোন বাধা না দিয়ে ডঃ জিলিয়ানকে তাঁর কথাগুলো বলবার সুযোগ দেবেন।”

জিলিয়ানের সমস্ত অস্বস্তি কেটে গিয়েছিল। এর পরে কী হতে চলেছে তার ব্যাপারে একটা পরিষ্কার ধারণা গড়ে উঠেছে তার মনে। সে শান্ত গলায় নিজের কথার সুতোটা তুলে নিল ফের, “এই ডেইকি তরঙ্গসংক্রান্ত একটি গবেষণাই আমাদের রিগান সম্পর্কে একটা নতুন তথ্য জোগায়। হর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্রের দল রিগানের ওপরে স্নাতকোত্তর গবেষণার জন্য স্টেশন ১৬র মহাকাশ দূরবীক্ষণক্ষেত্রে কাজ করবার অনুমতি পায় কিছুকাল আগে। এই স্টেশন ১৬তেই ডেইকি তরঙ্গের ওপরে মূল গবেষণাটি যে চলেছে সে খবর আপনারা জানেন। গবেষক ছাত্রদের একজন কৌতুহলী হয়ে একদিন ডেইকি গবেষকদের সংবেদি পর্যবেক্ষণ যন্ত্রটি দিয়ে রিগানকে স্ক্যান করতে গিয়ে আবিষ্কার করে, সেটি নিজেই ডেইকি তরঙ্গের একটি উৎস। নিয়মিত ব্যবধানে এই তরঙ্গের কিছু স্রোতের আদানপ্রদান করে চলেছে রিগান।

“ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিরক্ষা বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এবং প্রজেক্ট রিগানের জন্ম হয়। প্রজেক্টের দায়িত্ব নিয়ে যোগদান করবার পর আমি দেখি, তরঙ্গগুলির গতিপথ অনুসারে তিনটি পরিষ্কার ভাগ রয়েছে। প্রথম ভাগটি প্রতি এক হাজার ঘন্টায় একবার সরাসরি পৃথিবীর দিকে ছোঁড়া হচ্ছে। দ্বিতীয় ভাগটি, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পৃথিবী থেকে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসা ডেইকি তরঙ্গ। আর প্রতি ত্রিশ দিনে একবার করে তৃতীয় আরেকটি ডেইকি সংকেত চলে যাচ্ছে সূর্য এবং আলফা সেন্টাউরির মাঝামাঝি গভীর মহাকাশের উদ্দেশ্যে।”

সভার মধ্যে একটা মৃদু গুন্‌গুন্‌ শুরু হয়ে গেছে। সেটিকে একটুক্ষণ চলতে দিয়ে জিলিয়ান ফের নিজের দিকে সভার দৃষ্টি আকর্ষণ করল, “কিন্তু সেটাই সব নয়। এই তৃতীয় তরঙ্গসংকেতটির শক্তির পরিমাণ ও গন্তব্যবিন্দুর পর্যালোচনা করে যা পাওয়া গেছে তা আরও সন্দেহ উদ্রেক করে। দেখা গেছে, প্রতিটি সংকেত ঝলকের গন্তব্যবিন্দু তার আগের ঝলকের গন্তব্যবিন্দুর তুলনায় আমাদের আরো কাছে এগিয়ে আসছে।”

“এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নজরে থাকা সত্ত্বেও এ বিষয়ে সরকার পৃথিবীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়নি কেন? আমাদের অগোচরে পৃথিবী—” সদস্যদের গলার স্বরে হঠাৎ করেই আমূল একটা বদল এসেছে দেখা গেল। এ মুহূর্তটার জন্যই জিলিয়ান এতক্ষণ নিজেকে তৈরি করেছে। এইবার তার তুরুপের তাসটা সে খেলবে।

“তার একটা কারণ আছে। কোয়াসার, পালসার জাতীয় তারারা প্রকৃতির নিয়ম মেনেই নিয়মিত ব্যবধানে কিছু নির্দিষ্ট দিকে বেতারতরঙ্গ সম্প্রচার করে চলে। বেতারতরঙ্গের মত ডেইকি তরঙ্গও একটি প্রাকৃতিক ব্যাপার। কাজেই কোন প্রাকৃতিক বস্তু এই তরঙ্গটিকেও একই ভঙ্গিতে সৃষ্টি করতে ও প্রয়োগ করতে সক্ষম হতেই পারে। অতএব যতক্ষণ না আমরা প্রমাণ পাচ্ছি যে রিগান একটি প্রাকৃতিক বস্তু নয় ততক্ষণ তার সঙ্গে পৃথিবীর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যোগাযোগের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়, এবং সে অবস্থায় পৃথিবীর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেওয়াও অন্যান্য উপনিবেশদের চোখে একটি আগ্রাসী পদক্ষেপ বলেই চিহ্নিত হবে।

“আর, এই কাজটি করতে গিয়েই আমরা সবচেয়ে বড়ো সমস্যার মুখোমুখি হই। প্রজেক্ট শুরু হবার পর প্রথমেই ওই বস্তুপিণ্ডের শরীর থেকে কিছুটা উপাদান সংগ্রহ করে আনা হয় পরীক্ষার জন্য। কিন্তু বহু চেষ্টাতেও স্ক্যানিং এর জন্য ব্যবহৃত কোন তরঙ্গই এর রহস্যভেদ করতে সক্ষম হয়নি। গত ছমাস ধরে সতেরোজন দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও বিজ্ঞানীর একটি দলকে নিয়ে আমি এই চেষ্টাটাই করে চলেছি। আজ সকালে একদম হঠাৎ করেই সে ব্যাপারে সাফল্য পাওয়া গেছে। আমাদের একজন প্রযুক্তি সহায়ক কিছুটা আকস্মিকভাবেই পেরিকুইন রশ্মি ব্যবহারকারী একটি স্ক্যানারে রিগানের নমুনার একটি স্লাইড পরীক্ষা করিয়েছিলেন।”

“সেটি আবার কী বস্তু?” পর্দা থেকে ওলাফের তীক্ষ্ণ ছুরির মত গলা ভেসে এল। কোণঠাসা হয়েও নিজের ব্যঙ্গ করবার প্রবৃত্তিটা ছাড়তে পারেননি তিনি।

মেজাজ হারালো না জিলিয়ান। শান্ত গলায় বলল, “পেরিকুইন স্ক্যানার সাধারণত মস্তিষ্কের চিন্তাতরঙ্গ বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহার করা হয়। কৃত্রিম টেলিপ্যাথি নিয়ে আমাদের গবেষণাপ্রকল্পে এর ব্যবহার হয়। পেরিকুইন স্ক্যানারে রিগানের নমুনাটি পরীক্ষা করবার সঙ্গে সঙ্গেই এর থেকে ক্রমাগত বের হতে থাকা জিটা গোত্রের পাঁচ ধরনের চিন্তাতরঙ্গসংকেতেরই অস্তিত্ব পাওয়া যায়।”

“তরঙ্গগুলির অর্থ উদ্ধার করা গেছে কি?”

জিলিয়ান মাথা নাড়ল, “এত স্বল্প সময়ে তা সম্ভব নয়। তবে হ্যাঁ, সংকেতগুলোর মান ও অভিমুখ বিশ্লেষণ করে রিগানের আণবিক গঠনের এই ছবিটা কমপিউটার তৈরি করেছে—” বলতে বলতেই তার নির্দেশে প্রক্ষেপণক্ষেত্রে একটা ছবি ভেসে উঠল। বুদবুদের মত গড়নের অজস্র ছোটো ছোটো গোলক সেখানে কিছু বিচিত্র জ্যামিতিক নকশায় পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে জুড়ে রয়েছে।

“জেন্টলমেন, সংযোজনের জ্যামিতিক নকশাগুলো খেয়াল করুন। আমাদের পরিচিত কোন প্রাকৃতিক বস্তুর আণবিক সজ্জার সঙ্গেই এই নকশাগুলো মেলে না। এটি একটি কৃত্রিম বস্তুপিণ্ড। এক অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং অগ্রগতির নিদর্শন।

“এরিয়াক পৃথিবীর প্রথম উপনিবেশ। আমরা বসবাস করবার শুরু থেকেই রিগানের উপস্থিতি লক্ষ করেছি। অর্থাৎ আর কোন উপনিবেশ এর সৃষ্টি করেনি। কাজেই এই আবিষ্কার থেকে একটাই সিদ্ধান্তে পৌঁছোন যায়--পৃথিবীর হাতে বহুকাল আগে থেকেই ডেইকি প্রযুক্তি ছিল, এখানে উপনিবেশ স্থাপনের আগেই তারা এরিয়াকের কক্ষপথে এই ডেইকি প্রেরক যন্ত্রটি বসায় এবং তারপর থেকে আমাদের অজ্ঞাতে তারা সেই প্রযুক্তির সহায়তায় আমাদের উপনিবেশের ওপরে গুপ্তচরবৃত্তি করে চলেছে—”

হঠাৎ তার কথার মাঝপথে উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন অ্যাডমিরাল সোরাক, “এবং রিগান থেকে বের হওয়া তৃতীয় ডেইকি তরঙ্গসংকেতটির গতিপথ বিশ্লেষণ করে এই অনুমানেও পৌঁছোতে পারি যে ছোটো ছোটো লাফে আলফা সেন্টাউরির দিকে ধেয়ে আসছে সম্ভবত কোন পার্থিব নৌবহর। এই মুহূর্তে তা জিফরান থেকে মাত্রই তিন আলোকদিবস দূরত্বে রয়েছে—”

“কিন্তু ছোটো ছোটো লাফ কেন?” ওলাফের গলায় দেখা গেল সোরাকের প্রতি এইবার কিছুটা সম্ভ্রমের বোধ এসেছে।

“কারণ একটাই হতে পারে। আমাদের সমরশক্তিকে তুচ্ছ করে দেখছে না এরা। আমার অনুমান, সেই কারণে একটি উল্লম্ফনে সরাসরি এখানে এসে না পৌঁছে ছোটো ছোটো অতিমহাকাশীয় লাফে কিছুটা করে এগিয়ে স্বাভাবিক মহাকাশে ফিরে এসে তারপর রিগান থেকে পাঠানো সংকেতগুলি গ্রহণ করছে। তার থেকে এখানকার পরিস্থিতি ও আমাদের প্রস্তুতির ওপরে সতর্ক নজর রেখে রেখে প্রস্তুত হয়ে এগোচ্ছে এরা। এ ছাড়া এর আর কোন ব্যাখ্যা হতে পারে না।”

সমর উপদেষ্টা এইবারে মুখ খুললেন, “এ ব্যাপারে এই সভার ঠিক আগে আমি, অ্যাডমিরাল সোরাক ও ডঃ জিলিয়ান মিলিতভাবে যে রণনীতি তৈরি করেছি তার প্রথম ধাপে একটি বড়ো ফ্রিগেট শ্রেণীর রণতরী গিয়ে রিগানকে চুম্বকরশ্মি দিয়ে কক্ষচ্যূত করে সেটিকে ডঃ জিলিয়ানের গবেষণাকেন্দ্রে নিয়ে আসবে। সেখানে একটি ডেইকি তরঙ্গ প্রতিরোধী আবেশক্ষেত্রে একে রেখে এর প্রযুক্তিকে বোঝবার ও কাজে লাগাবার চেষ্টা করবেন ডঃ জিলিয়ান ও তাঁর গবেষকদল। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে পার্থিব নৌবাহিনী ও পার্থিব সরকারের বিরুদ্ধে রণকৌশলের কাজ আমার দফতর দেখবে। ধন্যবাদ ডঃ জিলিয়ান। আপনার এই কৃতিত্ব মহানায়কের নজরে আনা হচ্ছে। আপনি এর জন্য উপযুক্ত পুরস্কার পাবেন। আপনার পরবর্তী মিশনের সাফল্য কামনা করি।”

“কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোন আলোচনা না করে এতবড়ো একটা পদক্ষেপ—” বেইটারকে কথা শেষ না করতে দিয়ে সোরাক বলে উঠলেন,

“আপনি যুদ্ধ চেয়েছিলেন মহামান্য বেইটার। আপনার ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। মহানায়ক কিছুক্ষণ আগেই আমাদের পরিকল্পনা অনুমোদন করেছেন। যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থার নির্দেশ বের হয়ে গেছে এই আলোচনা চলাকালিন। এই মূহূর্তে প্রতিরক্ষাবিভাগের সিদ্ধান্তকে কোন প্রশ্ন করা দেশদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচিত হবে।”

বেইটার অসহায়ভাবে তাঁর চিরশত্রুটির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন একবার। তারপর তাঁর হাতের একটা ইশারায় পর্দা থেকে তাঁর ছবিটি মুছে গেল।


********

সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে আসতে সাইফা চিন্তিত মুখে জিলিয়ানের দিকে এগিয়ে এল, “কী হল জিলিয়ান? রণতরী ডি এস অ্যাভেঞ্জার এইমাত্র স্টেশনের দশ নম্বর বার্থে ডকিং করেছে। ক্যাপ্টেন আপনার সঙ্গে—”

“আমি জানি। তাঁকে জানাও দশ মিনিটের মধ্যে আমরা রণতরীতে পৌঁছোচ্ছি। সেখানে পৌঁছে তাঁকে পরবর্তী নির্দেশ দেব।”

বলতে বলতে দ্রুতপায়ে নিজের অফিসে এসে জিলিয়ান টেলিফোনের পর্দায় উজানের জন্য একটা ছোটো মেসেজ লিখতে শুরু করল। মেয়েটা একলা আছে বাড়িতে। উজানের ফিরে আসা প্রয়োজন। তার নিজের এখন বাড়ি ফিরতে কতদিন সময় লাগবে কে জানে।


********





“নেরা—”

“বলো সোমক—”

“আমি হবিষ্টর সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

“সম্ভব নয় সোমক। তিনি এখন অন্য কাজে—”

“আঃ। আমি এদের মহাকাশ স্টেশন ১৬ থেকে আসছি। জরুরি খবর আছে। যা বলছি তা করো। নইলে দেরি হয়ে যাবে।”

“এদের রিগান সংক্রান্ত গবেষণার খবর জানাতে চাও কি? সে সম্পর্কে তুমি আমাকে জানাতে পারো। আমি যথাসময়ে তা—”

“সে গবেষণা এদের শেষ হয়ে গেছে নেরা।”

“অসম্ভব। আমার সম্ভাব্যতা গণিতের হিসাব বলেছে আগামি কয়েক শতাব্দির মধ্যে সেই কাজে এদের পক্ষে সাফল্য পাবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।”

“প্রায় শূন্য নেরা। কিন্তু শূন্য নয়। মাত্রই কিছুক্ষণ আগে একটা আকস্মিক আবিষ্কার তোমার সম্ভাব্যতা গণিতের সমস্ত সূত্রকে ব্যর্থ করে দিয়ে এদের হাতে রিগানের গোপন গঠনকৌশলের চাবিকাঠি তুলে দিয়েছে।”

“কিন্তু সোমক—”

“আঃ, আমাকে বিরক্ত কোরো না যন্ত্রমস্তিষ্ক। দেরি করবার সময় নেই। এর চেয়েও গুরুতর কিছু ঘটতে চলেছে এখন। আমাকে হবিষ্টর সঙ্গে কথা বলতে দাও—”

“আমি যন্ত্র? তবে তুমি কী? আমার কিংবা রিগানের দেহ যে বুদ্ধিমান অণুযন্ত্রের সমাহার তেমনই কিছু অণুযন্ত্রের মধ্যে তোমার চেতনাকে প্রতিস্থাপিত করেই তো—”

“এখন তোমার অভিমান নিয়ে তর্ক করবার অবসর আমার নেই নেরা। দেহ গুরুত্বের বস্তু নয়। তোমার আমার চেতনায় আকাশপাতাল তফাৎ যন্ত্রঈশ্বরী। দরজা খোল-—” জিফরানের কক্ষপথে ভাসমান ধুলিকণার পিণ্ডটি হঠাৎ করেই মৃদু ঔজ্জল্যে ঝিকিয়ে ওঠে।

তার সেই তীব্র রাগের ঝলক বুঝি অনুভব করতে পেরেছিল তখনো জিফরান থেকে প্রায় তিন আলোকদিবস দূরে থাকা নৌকাটির বাসিন্দা যন্ত্রচেতনাটি। মৃদু হেসে সে বলে, “দেহ গুরুত্বপূর্ণ নয় বুঝি সোমক? বেশ! কথাটি আমার মনে থাকবে। আমি—”

“হবিষ্টকে ডাকো নেরা। প্রতিটি মুহূর্ত এখন মূল্যবান। আমার নির্দেশ প্রয়োজন।”

“অপেক্ষা করো—”

আবার নৈঃশব্দ ঘিরে আসে। অন্ধকার মহাশূন্যে ভাসমান বুদ্ধিধর ধুলিপিণ্ডটি জিফরানের উপগ্রহটির চারপাশে অলসগতিতে ঘুরতে ঘুরতেই সতর্ক নজর রেখে চলেছিল তার দিকে। এরিয়াকের কক্ষপথে হঠাৎ করেই ব্যস্ততা বেড়ে উঠেছে। প্রায় এক হাজার সশস্ত্র রণতরী এসে মৌমাছির ঝাঁকের মত ঘিরে ফেলছে তাকে। কেন?

সেইদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই হঠাৎ এরিয়াকের বাসিন্দা সেই বালিকাটির মুখটা ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। বড়ো পবিত্র, সুন্দর শিশুটি। বুকের ভেতর কোথাও কি একটা মোচড় লাগল তার? নেরা ভুল বলেনি। জৈব দেহটি নেই, তবু দেহের সংস্কার তার চেতনায় বড়ো দৃঢ়ভাবে প্রোথিত। কতবারই তো নেরা তার সেই ক্ষুধার স্মৃতিকে পরিতৃপ্ত করে মানবীরূপ নিয়ে। অ্যালেনের সে সংস্কার ছিল না। দেহধারণের কিছুকাল পরেই তিনি স্বেচ্ছায় তাঁকে ত্যাগ করে চেতনাকে নির্বাপিত করে দিয়েছেন—

ফের শিশুটির ছবি তার চেতনায় ফিরে এল। কমলার কোয়ার মত দুটি ঠোঁট, উজ্জ্বল নীল চোখ--এমন একটি ছোটো শিশু যদি—তার সন্তান—তার জিনসংকেতের বাহক-

হঠাৎ তীব্র একটা ঝাঁকুনি লাগল তার চেতনায়। না। সেই শিশুর জিনসংকেতেও তো দানবচরিত্রের সংকেত সুপ্ত থাকবে। যেমন আছে এই শিশুটির। সেই সুপ্ত হিংস্রতা একদিন তার মধ্যেও জেগে উঠবে—তার কোষস্তরের আগ্রাসী দানবচেতনা তার মস্তিষ্কচেতনাকে নিঃশব্দে চালিত করবে রক্তাক্ত হিংস্রতার পথে।

নৌকায় সেই প্রথম দিনগুলোর কথা দৃষ্টির সামনে ভাসছিল সোমকের। নেরা যখন তাকে প্রথমবার রক্তাক্ত সৌরমণ্ডলের ছবিগুলো দেখায় তখন হঠাৎই একটি তীব্র বেদনার স্রোত বয়ে গিয়েছিল তার চেতনায়। যুদ্ধের সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতায় কঠিন হয়ে ওঠা চেতনাটি এই যন্ত্রণার অনুভূতিতে নিজেই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল প্রথমে।

কিন্তু তারপর একসময় সে তার কারণটি সে অনুভব করেছে। নেরার দেহের উপাদান দিয়ে তার দেহটি তৈরি। লক্ষকোটি অণুগণকের সমাহারে তৈরি সেই নতুন দেহটিতে তার জৈবদেহের সমস্ত অনুভূতিরই নিখুঁত প্রতিরূপ ছিল। কিন্তু, সে অণুগণকদের জিনস্তরে সঞ্চিত ছিল ঈশ্বরজাতির সমস্ত অনুভূতি। মানবকোষের মতন আগ্রাসী দানবচেতনার কোন অস্তিত্ব ছিল না সেখানে। রক্তপাতের ছবি তাই তার অকলংক চেতনাকে বেদনার্ত করেছিল।

বোধটি আসবার পর মুক্তির তীব্র উল্লাসে ভেসে গিয়েছিল তার চেতনা। তবু, কোথাও যেন একটা আশ্চর্য অভাববোধ কাজ করত। রোগগ্রস্ত অঙ্গটি কেটে বাদ দিলেও যেমন তার অভাববোধ কাজ করে, অনেকটা সেইরকম।

সেই দোলাচলের সময়টিতে নেরা তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। আশ্চর্য ভালোবাসার অনুভূতি দিতে পারে এই যন্ত্রচেতনাটি। কখনো দেহের, আবার কখনো চেতনার গভীর সুখ দিয়ে তাকে সে ঘিরে থেকেছে সেই সময়টি থেকেই। আর তারই মধ্যে বড়ো যত্নে শিখিয়েছে, দেহের অণুগণকগুলির স্মৃতিভাণ্ডারে সঞ্চিত ঈশ্বরজীবের সুদীর্ঘ সভ্যতায় আহরিত সমস্ত জ্ঞানকে বুঝে নেবার কৌশল।

শিক্ষা শেষ হলে, একদিন তার হাত ধরে সে নিয়ে গিয়েছিল দেবর্ষী হবিষ্ট ও দেবর্ষী ক্ষিতিজের কাছে। জিননিয়ন্ত্রিত দানবচেতনার কলংক থেকে মুক্ত সোমক তখন এক আমূল পরিবর্তিত চেতনা—ঈশ্বরজীবের উদ্দেশ্য, কর্মপদ্ধতি, কোনটাই আর তার অজানা নেই তখন।

পার্থিব মানুষ সম্পর্কে তাঁর সঞ্চিত সমস্ত জ্ঞানটুকু হবিষ্টকে অর্পণ করে অ্যালেন ততদিনে নির্বাপিত হয়েছেন। সোমক কিন্তু তা চায় নি। পার্থিব সমাজ সম্পর্কে সমস্ত জ্ঞান হবিষ্টর চেতনায় নথিভুক্ত করাবার পর নিজের অস্তিত্বটুকু অবিচল রাখবার ভিক্ষা সে চেয়ে নিয়েছিল হবিষ্টর কাছে। নেরাও তাই চেয়েছিল কি? তার দৃষ্টিতে প্রকাশ পাওয়া আকুতিটুকু হবিষ্টর নজর এড়ায় নি সম্ভবত। মৃদু হেসে তিনি সম্মতি দিয়েছিলেন। এরপর বছরদুয়েক নেরার সঙ্গে সেই ছুটন্ত নৌকায় বাস করবার পর একদিন সোমককে ফের ডেকেছিলেন হবিষ্ট। পার্থিব হিসাবে তখন প্রায় পাঁচশো বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। জিফরানের উপগ্রহ এরিয়াক-এ প্রথম পার্থিব উপনিবেশ স্থাপিত হয়েছে তখন। জিফরানের কক্ষপথে রাখা পর্যবেক্ষণকেন্দ্রটির দিকে তখনই মানুষের নজর পড়েছিল। সেই উপনিবেশ ও পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের ওপর নজর রাখবার দায়িত্ব নিয়ে তখন থেকেই সোমকের বারেবারে এইখানে ঘুরে আসা।

ভাসমান সেই ধুলিপিণ্ডটির থেকে কিছু দূরে একটি ক্ষুদ্র বেগনি আলোকপিণ্ড দেখা দিল হঠাৎ। অতিমহাকাশ গহ্বর! তার মানে হবিষ্ট নিজে—কিন্তু—

ধুলোর পিণ্ডটি সেদিকে দিকে এগিয়ে যেতে যেতেই একটি মানুষের চেহারায় বদলে যাচ্ছিল। আলোর ঝলকটির কেন্দ্রে একটি ছোটো ঘূর্ণায়মান সুড়ঙ্গের মুখ খুলে গিয়েছে। সামান্য সময় বাদে সেই পথ দিয়ে একঝলক শক্তি বের হয়ে এল। দ্রুতবেগে তা দেবর্ষী হবিষ্টর রূপ নিচ্ছিল। তার সামনে গিয়ে নতজানু হল সোমক।

দেবর্ষী একটি আঙুল দিয়ে তার দুই ভ্রুর মাঝখানে স্পর্শ করে ধ্যানস্থ হয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। তারপর, একটা ক্লিষ্ট হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে, “বিধাতাও এই দানবদের সহায় সোমক। না হলে যে ঘটনার সম্ভাবনা কোটিতে এক সেই অঘটনও সম্ভব হয়? এইরকম অপ্রত্যাশিতভাবে নির্দিষ্ট সময়ের আগে রিগানের রহস্যভেদ করাটা দৈব অঘটন ছাড়া আর কোনভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।”

“আমায় পরবর্তী নির্দেশ দিন দেবর্ষী।”

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে হবিষ্ট বললেন, “এরপর কী ঘটতে চলেছে তা অনুমান করা কঠিন নয়। এরা ডেইকি তরঙ্গের আবিষ্কার করবার পর থেকেই নেরার বিশ্লেষণ আমাকে তার ইঙ্গিত দিয়েছিল। তবে সম্ভাব্যতার হিসেবে আরো বহুকাল পরে যা ঘটবার কথা ছিল তা খানিক এগিয়ে এসেছে এই যা। এরা রিগানের দখল নেবার চেষ্টা করবে। পৃথিবী এবং আমাদের নৌকাও নিরাপদ নয় আর। ফের একবার এরা ফিরে চলেছে যুদ্ধ, রক্তপাত ও মৃত্যুর প্রিয় বৃত্তে। আমি ফিরে যাচ্ছি। কিছু প্রস্তুতি নিতে হবে। ততক্ষণ তুমি রিগানকে রক্ষা করবে। সামান্যতম বিপদের সম্ভাবনা দেখা দিলে যেকোন মূল্যে তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে নৌকায়—” বলতে বলতেই তাঁর দেহটি একটি জ্যোতির্ময় অগ্নিপিণ্ডে বদলে যাচ্ছিল। তারপর, ভাসমান সুড়ঙ্গটি হঠাৎ এগিয়ে এসে গ্রাস করে নিল সেই অগ্নিপিণ্ডকে।

হঠাৎ বহুদূরে দ্বিতীয় একটি শক্তির ক্ষীণ বিচ্ছুরণ সচেতন করে তুলল সোমককে। রণতরীর ঝাঁক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এসে একটি তরী এরিয়াকের আকর্ষণ কাটিয়ে তীব্র বেগে ছুটে যাচ্ছিল রিগানের দিকে। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই সোমকের দেহটি ভেঙেচূরে একটি ধুলিকণার স্রোতে বদলে গেল, তারপর রণতরীটির দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজেকে তার গতির সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে তার পাশে পাশে এগিয়ে চলল তা একই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। বাকি রণতরীগুলো ততক্ষণে একটি নিজেদের নির্দিষ্ট অবস্থানে সাজিয়ে নিয়ে একটি অতিকায় ঘনকের রূপ নিচ্ছিল।

ছুটতে ছুটতেই রণতরীটির সঙ্গে তার নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের আদান প্রদান চলতে থাকা বেতারতরঙ্গগুলোর সামান্য কিছু অংশকে নিজেদের মধ্যে শুষে নিচ্ছিল বুদ্ধিমান ধুলিকণারা। তার মধ্যে বাহিত শব্দসংকেতগুলোকে বুঝে নিতে কোন অসুবিধা হচ্ছিল না তার।


********

“রিগানের কক্ষপথে পৌঁছোতে ঠিক কতক্ষণ সময় লাগবে ক্যাপ্টেন বালাসিংঘে?”

“অন্তত পনেরো মিনিট। কিন্তু আপনি ঠিক কী করতে চাইছেন—”

মানুষটি অভিজ্ঞ সেনাপতি। যুদ্ধক্ষেত্রে আদেশ দেয়া তাঁর অভ্যাস। আদেশ নেয়া নয়। এ অভিযানে একজন সাধারণ বৈজ্ঞানিকের আদেশ মেনে কাজ করতে তাঁর বিরক্তিটি শুরু থেকেই জিলিয়ানের নজর এড়ায় নি। তার গলা একটু কঠিন হল, “কক্ষপথে পৌঁছোবার পর তা আমি আপনাকে জানাব ক্যাপ্টেন।”

বালাসিংঘে চেয়ার ছেড়ে উঠে জিলিয়ানের সামনে ঝুঁকে দাঁড়ালেন। অতিকায় চেহারাটির সামনে জিলিয়ানকে একটি শিশুর মতই ঠেকে।

“একটা কথা ডক্টর। এটা একটা রণতরী। আমি এর অধিনায়ক। এর যে কোন অভিযানে প্রতিটি আদেশ আমি দিই। কাজেই—”

জিলিয়ান উঠে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রাখল মানুষটির, “এটি কোন যুদ্ধ অভিযান নয় ক্যাপ্টেন বালাসিংঘে। একটা বৈজ্ঞানিক অভিযান। আমাদের মিশনটি পরিচালনা করতে যে অভিজ্ঞতা প্রয়োজন আপনার তা নেই। সেটি আমাকেই পরিচালনা করতে হবে। আপনার জন্য আমার দুটো নির্দেশ আছে। অভিযান চলাকালীন এই যানের আকর্ষী রশ্মি জেনারেটরের নিয়ন্ত্রণ আমার সহকারী ডঃ সাইফার হাতে থাকবে। আপনি তাকে প্রয়োজনীয় সংকেতগুলো জানিয়ে দেবেন।”

বালাসিংঘে নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে থাকলেন এক মুহূর্ত। তারপর বললেন, “বেশ। তবে একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখছি। এ উপগ্রহটির নিজস্ব কোন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আছে কিনা, এবং থাকলেও তা ঠিক কোন ধরনের হতে পারে তা বোঝবার কোন পথও আমাদের সামনে খোলা নেই। সেক্ষেত্রে—”

জিলিয়ান মাথা নাড়ল, “সে নিয়ে আপনি ভাববেন না ক্যাপ্টেন। আমি—”

“না ডঃ জিলিয়ান। সেনাবাহিনীর কর্ণধার হিসেবে আমার কর্তব্য আমি ভালো করেই জানি। আমার ব্রিফিং অনুযায়ী উপগ্রহটি কৃত্রিম এবং সম্ভবত তা পৃথিবীর পাঠানো কোন গুপ্তচর উপগ্রহ। সেক্ষেত্রে, এরিয়াকের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করার অপরাধে একে আমাদের প্রতিরক্ষা দফতর যুদ্ধাস্ত্র হিসেবেই বিবেচনা করছেন। এটি যদি আপনার পরিকল্পিত কর্মপদ্ধতিকে কোনভাবে প্রতিরোধ করে, সেক্ষেত্রে তাকে এরিয়াকের ওপর আক্রমণ হিসেবে ধরে নিতে আইনসঙ্গতভাবে আমার কোন বাধা থাকবে না—”

“অর্থাৎ?”

“অর্থাৎ, সেইটি হবে পৃথিবীর বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধঘোষণার মুহূর্ত এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই এই গুপ্তচর উপগ্রহটিকে ধ্বংস করা হবে।”

“ক্যাপ্টেন বালাসিংঘে, এটি একটি গবেষণা প্রকল্প! যে অকল্পনীয় প্রযুক্তির প্রয়োগ করা হয়েছে এই উপগ্রহটির নির্মাণে, তা আমাদের হাতে আসা প্রয়োজন। আপনি বুঝতে পারছেন না—ডেইকি সম্প্রচারের ব্যবহারিক প্রযুক্তির চাবিকাঠি রয়েছে এর মধ্যে। একে ধ্বংস করে দিলে—”

“না ডঃ জিলিয়ান। আপনার মত আমিও আমার অধিকার ও কর্তব্যের বিষয়ে পরিপূর্ণ সচেতন। এরিয়াকের সুরক্ষা আমার কাছে আপনাদের গবেষণার চেয়ে বহুগুণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

খানিকক্ষণ চোখে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে রইলেন মানুষদুজন। তারপর হঠাৎ জিলিয়ানের ইস্পাতকঠিন দৃষ্টি থেকে নিজের চোখ সরিয়ে নিয়ে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেলেন বালাসিংঘে। একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল জিলিয়ান। রওনা হবার পর থেকেই এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করছিল সে। বাকি অভিযানটায় আর তার নেতৃত্ব নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠবে না। অন্তত, কাজটার মধ্যে কোন অঘটন যদি না ঘটে। কিন্তু তবুও বালাসিংঘের শেষ কথাগুলো তার বুকের ভেতর একটা মৃদু কাঁপুনি গড়ে তুলছিল। পোর্টহোলের জানালা দিয়ে রিগানের চেহারাটা আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে উঠে একটা থালার মত হয়ে উঠছে। খানিক বাদে সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে সে ডাকল, “সাইফা—”


********

যানের বাইরে তাকে ঘিরে ছড়িয়ে থাকা প্রায় অদৃশ্য ধুলোর আবরণটা আস্তে আস্তে দূরে সরে এল এইবার। তারপর হঠাৎ একটা ছোটো পিণ্ডে বদলে গিয়ে গতিবেগ বাড়িয়ে, রণতরীকে বহু পেছনে ফেলে রেখে ছিটকে গেল সামনের দিকে। তার দৃষ্টিক্ষেত্রে রিগানের চেহারাটা আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে উঠছিল। ঠিক কী করতে হবে তার একটা পরিষ্কার ধারণা হয়ে গিয়েছে তার। তার অণুগণকগুলি ছুটতে ছুটতেই অবিশ্বাস্য দ্রুততায় পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য একটা স্বয়ংচল প্রোগ্রাম গড়ে তুলছিল। কাজটি শেষ হবার সামান্য পরে ধুলোর পিণ্ডটি এসে রিগানের কাছাকাছি একটি ভূসমলয় কক্ষপথে স্থির হল। বেতার তরঙ্গের একটি ঝলক তার দেহ থেকে বের হয়ে ছুটে গেল নিচের ভূপৃষ্ঠের দিকে। একটু বাদে একটা মৃদু শক্তির ঝলক ফিরে এল রিগানের শরীর থেকে। রিগানের দেহের অনুগণকেরা স্বয়ংচল প্রোগ্রামটিকে গ্রহণ করে পরবর্তী পদক্ষেপের নির্দেশ স্বীকার করেছে। এইবার অপেক্ষার পালা। ভেঙেচূরে গিয়ে একটি পাতলা ধুলোর আবরণের মত সে ছড়িয়ে পড়ল রিগানের ভূপৃষ্ঠের ওপর—


********

“জেনারেটর এক—”

“প্রস্তুত”

“জেনারেটর দুই—”

“প্রস্তুত”

“জেনারেটর তিন—”

“প্রস্তুত”

“ইগনিশান—”

এক অতিকায় প্রাগৈতিহাসিক পাখির মতন যুদ্ধযানটি রিগানের উত্তর মেরুর ঠিক ওপরে স্থির হয়ে ভাসছিল। হঠাৎ তার পেটের নিচে তিনটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে হঠাৎ তিনটি আলোকবিন্দু দেখা দিল। কয়েকমুহূর্ত স্থির থেকে ঝিলমিল করবার পর তাদের থেকে তিনটি শক্তিমান আলোকরশ্মি বের হয়ে এসে উপগ্রহটির বিষুব অঞ্চলের দুই প্রান্তে ও উত্তরের মেরুবিন্দুটিতে গিয়ে স্থির হল। ভারসাম্যরক্ষাকারী বিপরীত জেটের তীব্র নিঃসরণে থরথর করে কেঁপে উঠল যানটি। রিগানের কক্ষপথের আবর্তনগতি ধীরে ধীরে কমে আসছিল।

প্রক্ষেপণক্ষেত্রে চোখ স্থির রেখে বসে ছিল জিলিয়ান। দক্ষ বাদ্যকরের ভঙ্গীতে নড়তে থাকা তার আঙুলগুলি আস্তে আস্তে বাড়িয়ে চলেছিল আকর্ষী রশ্মিগুলির মিলিত শক্তির তীব্রতাকে—


********

রিগানের ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে থাকা ধুলিকণাগুলি নিঃশব্দে কথা বলছিল উপগ্রহটির দেহের বুদ্ধিমান অণুগুলির সঙ্গে। তিনটি আকর্ষীরশ্মির ক্রমবর্ধমান বল ধীরে ধীরে তার গতি কমিয়ে এনে তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে নিয়ে যেতে চাইছে কক্ষপথ থেকে। একসময় আবর্তনের গতিটি একেবারে থেমে গেল তার। জিফরানের মহাকর্ষের টান আর আকর্ষীবলের বিপরীতমুখি টানের পার্থক্য এইবারে শূন্যে এসে দাঁড়িয়েছে। এই মুহূর্তটিরই অপেক্ষায় ছিল রিগানের প্রতিটি অণুর মধ্যে স্থাপিত স্বয়ংচল প্রোগ্রামটি। মুহূর্তের মধ্যে চালু হয়ে উঠে তা অণুগুলির কার্যকলাপের দখল নিল। পারস্পরিক আকর্ষণবল দ্রুত কমতে শুরু করল অণুগুলির মধ্যে।

হঠাৎ প্রক্ষেপণক্ষেত্রের কেন্দ্রে স্থির হয়ে থাকা রিগানের ছবিটি একটু কেঁপে উঠল। পাশের খোপটিতে ভাসমান সংখ্যাগুলোর মান দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। সঞ্চরমান সংখ্যাগুলোর দিকে একমুহূর্ত তাকিয়ে দেখে একটু থমকে গিয়ে তার অর্থটি অনুধাবন করবার চেষ্টা করল জিলিয়ান, কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার কোন প্রয়োজন থাকল না আর। বদলের অর্থটি তখন প্রক্ষেপণক্ষেত্রে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। গোটা উপগ্রহটি একটি ভঙ্গুর ধুলিপিণ্ডের মত গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেতে শুরু করেছে তখন তার চোখের সামনে। আকর্ষী রশ্মির তন্তুগুলো নির্বিষ ভঙ্গীতে তার হঠাৎ কাঠিন্য হারানো শরীরটিকে এফোঁড় ওফোঁড় করে বের হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ তীব্রবেগে একটা পাক দিয়ে উঠল ধুলোর পিণ্ডে বদলে যেতে থাকা উপগ্রহটা। আর তারপর একতাল ঘন কুয়াশার মতই সরে যেতে শুরু করল আকর্ষী রশ্মির এলাকার বাইরে।

“জিনিসটা পালাচ্ছে জিলিয়ান—” স্পিকারে সাইফার অসহায় গলাটা ভেসে আসতে আসতেই তাকে থামিয়ে দিয়ে ক্যাপ্টেন বালাসিংঘের ভারী গলাটা ফেটে পড়ল স্পিকারের থেকে, “শত্রু উপগ্রহ অপরিচিত প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে আমাদের নাগাল ছেড়ে সরে যাচ্ছে। এটি একটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি। সংবিধানের ধারা ১৩৪ ক অনুযায়ী এই রণতরীতে উপস্থিত সর্বোচ্চ সেনা আধিকারিক হিসেবে আমি, হেক্টর বালাসিংঘে এই মুহূর্তে যানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছি—”

বলতে বলতেই আকর্ষী রশ্মি তিনটে দপ করে নিভে গেল। যানের সমস্ত আলোও নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। গভীর অন্ধকারের মধ্যে চাপা গুমগুম শব্দ আর একটা মৃদু কাঁপুনি টের পাচ্ছিল জিলিয়ান। কামানের শক্তিউৎপাদক যন্ত্র চালু হয়েছে—রণতরীর একেবারে মাথায় বসানো দানবিক স্ফটিকটির ভেতরে জমা হতে শুরু করেছে অপরিমেয় শক্তির একটি কেন্দ্রবিন্দু—

রণতরীর নাগাল ছাড়িয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যেতে থাকা ধুলিপিণ্ডটির কেন্দ্রবিন্দুতে নিজের শরীরটিকে সংহত করে নিয়েছিল সোমক। অ্যাভেঞ্জারের কামান শক্তিসঞ্চয় করছে। তার শীর্ষবিন্দুতে জমে উঠতে থাকা শক্তিভাণ্ডটির আঁচ এসে এতদূর থেকেও লাগছিল তার গায়ে। ছুটন্ত ধুলিপিণ্ডের প্রতিটি কণা একাগ্রভাবে সেই শক্তিসঞ্চয়ের পরিমাপ নিচ্ছিল। তার ভিত্তিতে অযুত নিযুত অণুগণকের দল অকল্পনীয় গতিবেগে কষে চলেছিল আঘাতের সময় ও স্থানবিন্দুটির নিখুঁত পূর্বাভাষ। মুহূর্তের একটি সামান্য ভগ্নাংশের মধ্যে তাদের সে কাজ শেষ হল। এইবারে তারা প্রস্তুত—

হঠাৎ দূরে ভাসমান রণতরীটির মাথায় একটি আগুনের কুঁড়ি দেখা দিল। তারপর নিমেষের মধ্যে তা একটি অতিকায় অগ্নিপুষ্প হয়ে ফুটে উঠে তার দলগুলিকে মেলে ধরল ধুলিকণার অতিকায় পিণ্ডটির উদ্দেশ্যে। আর, একেবারে ঠিক সেই মুহূর্তটিতে, লেলিহান উত্তাপশিখার সেই নিশ্ছিদ্র দেয়ালের আড়ালে মুহূর্তের ভগ্নাংশের জন্য গড়ে উঠল একটি অন্ধকার ঘূর্ণায়মাণ গর্ত। তার বজ্র আকর্ষণে আগুনের শিখাটি তাদের স্পর্শ করবার পূর্বমুহূর্তে গহ্বরের মধ্যে অদৃশ্য হল ধুলিকণার স্রোত।

ডি এস অ্যাভেঞ্জারের থেকে তখন বেতার তরঙ্গের স্রোতে ভর করে ভেসে চলেছে তার অধিনায়কের বার্তাটি—

“দূরনিয়ন্ত্রিত শত্রু উপগ্রহ আমাদের নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করায় সেটিকে ধ্বংস করা হয়েছে—”

বহুদূরে, এরিয়াকের কক্ষপথে ভেসে থাকা প্রতিরক্ষা স্টেশনটিতে অপেক্ষায় থাকা একদল মানুষের চোখে একটা হিংস্র উল্লাসের ছবি ফুটে উঠছিল। এইবার- বহুদিন নির্বিষ অপেক্ষার কাল কাটিয়ে ফের একবার তাদের সামনে সুযোগ এসেছে। দীর্ঘ গবেষণা ও অর্থব্যয়ে যে অমিত অস্ত্র ও রণতরীর ভাণ্ডার গড়ে তুলেছে তারা এই নক্ষত্রের গ্রহমণ্ডলে বসে, এইবার তাকে ব্যবহারের সুযোগ উপস্থিত হয়েছে। মানুষগুলির নেতা সামনে রাখা যন্ত্রগণকের স্পিকারে মৃদু গলায় নির্দেশ দিলেন, “পরিকল্পনা ‘খ’। চালু করুন।”

অন্ধকার মহাকাশ বেয়ে সেই নির্দেশ ছড়িয়ে গেল জিফরানের কক্ষপথে ভাসমান কয়েক হাজার অস্ত্রসজ্জিত রণতরীর ঘনকাকার বহরটির মধ্যে। প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই তাদের দু পাশে গড়ে উঠল দুটি অতিমহাকাশী সুড়ঙ্গের ঘূর্ণায়মান মুখ। এইবার ঘনকের মধ্য থেকে একশোটি রণতরীর একটি বহর একটি অতিকায় তীরের রূপ নিয়ে ছিটকে বের হয়ে এসে অদৃশ্য হয়ে গেল তাদের একটির মধ্যে। অবশিষ্ট ঘনকটি তার কয়েক হাজার রণতরীকে নিয়ে একটি ত্বরিত উল্লম্ফণে দ্বিতীয় গহ্বরটির মধ্যে হারিয়ে গেল। দেশকালহীন অতিমহাকাশের পথ বেয়ে সেই তীর ও ঘনক এইবারে ছুটে চলবে তাদের পূর্বনির্দিষ্ট দুই শত্রুর অবস্থানের উদ্দেশ্যে।


********

“ওরা আসছে—”

সামনে প্রক্ষেপণক্ষেত্রে চার মিলিয়ন কিলোমিটার দূরে মহাকাশের বুকে জেগে ওঠা সুড়ঙ্গের মুখটা ভাসছিল। সেখান দিয়ে তীর আকৃতির ব্যূহে সজ্জিত রণতরীর বহরটি ধীরে ধীরে বের হয়ে আসছিল স্বাভাবিক মহাকাশে।

“মাত্র একশোটি রণতরী। তার অর্থ বাকিগুলি এতক্ষণে পৃথিবীর পথে—” বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন দেবর্ষী হবিষ্ট। ক্ষিতিজ এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে একপাশে বসে ছিলেন। এইবার মাথা নেড়ে মৃদু কন্ঠে বললেন, “শেষ পরীক্ষাটিও তাহলে সম্পূর্ণ হল হবিষ্ট। আর সন্দেহ নেই।”

“নাঃ দেবর্ষী ক্ষিতিজ। সন্দেহের অবকাশ নেই আর। দানবজাতির সঙ্গে এদের জীবনযাত্রার গতিছন্দের শেষ প্রমাণটিও পাওয়া গেল অবশেষে। এক একটি মহাযুদ্ধ, সেই যুদ্ধ ও রক্তপাত থেকেই শক্তিবৃদ্ধি ও প্রযুক্তিগত উন্নতির পরবর্তী ধাপ, এবং সেই ধাপের শেষে আবারও একটি ভয়াবহ যুদ্ধ—সেই নিয়তিনির্দিষ্ট পথেই এগিয়ে চলেছে এদের ইতিহাস। আপনি মহানায়কের কাছে আমাদের বক্তব্যের একটি সম্পূর্ণ প্রতিবেদন পাঠাবার বন্দোবস্ত করুন। ঈশ্বরসেনার প্রয়োজন সত্যিই হবে এবারে। এই তারকাপুঞ্জের চারপাশে নজরদারির বন্দোবস্ত করবার পরামর্শ দিতে হবে তাঁকে। আমি যানের পরিচালনার ভার নিচ্ছি।”


********

“লক্ষ্যবস্তু স্ক্যানারে ধরা পড়েছে।”

অগ্রগামী রণতরীটির থেকে বেতার সংবাদটি সম্পূর্ণ নৌবহরের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। তীরের মত চেহারার ব্যূহটি ভেঙে গিয়ে অতিকায় ব্যাসের একটি বৃত্তের মত সজ্জায় ছড়িয়ে পড়ছিল রণতরীগুলি। বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাদের যন্ত্রে ধরা পড়া একটি ক্ষুদ্র আলোকবিন্দু—


“পার্থিব নৌবহর, আপনাদের সম্পূর্ণ ঘিরে ফেলা হয়েছে। আত্মসমর্পণ করুন—পার্থিব নৌ—”

নৌকার বাতাসে ভাসতে থাকা সতর্কবাণীটি হঠাৎ মাঝপথেই থেমে গেল। হবিষ্ট সচকিত হয়ে খেয়াল করলেন, মাথার ওপরে নীল আকাশের ছবিটিকে ঘিরে আদিগন্ত বিদ্যুতের ঝিকিমিকি দেখা দিয়েছে। প্রতিরক্ষাবর্ম চালু করেছে নেরা। নৌকাকে ঘিরে সুতীব্র স্থিরবিদ্যুতের ক্রমশ ঘন হয়ে ওঠা স্তরটি আটকে দিয়েছে আক্রমণকারী নৌবহরের তরঙ্গসম্প্রচার। বিদ্যুতশিখাগুলি অগণিত সাপের মতই এঁকেবেঁকে খেলা করছিল সমস্ত আকাশ জুড়ে। ধীরে ধীরে সংখ্যা বাড়িয়ে একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে ক্রমেই তারা গড়ে তুলছিল উজ্জ্বল রৌপ্যবর্ণের এক অভেদ্য সুরক্ষাকবচ—

“দূরত্ব এক মিলিয়ন মাইল। লক্ষ্যবস্তুর পুর্ণাঙ্গ চিত্র আসছে—”

অগ্রগামী রণতরীর নিয়ন্ত্রণকক্ষে অ্যাডমিরাল সোরাকের সামনের ত্রিমাত্রিক প্রক্ষেপণক্ষেত্রটিতে ভাসমান মহাকাশের ছবিটির মধ্যে একটি ঝাপসা বৃত্ত দেখা দিল। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠে একসময় অতিকায় বৃত্তটি একটি উজ্জ্বল রৌপ্যনির্মিত গোলকের রূপ নিল। ছবিটির পাশে ভাসমান সংখ্যাগুলির দিকে তাকিয়ে ভ্রুদুটি কুঁচকে উঠছিল তাঁর। প্রায় চারশো কিলোমিটার ব্যাস গোলকটির। এখনও এর থেকে কোন শক্তিবিচ্ছুরণের চিহ্ন নেই। অথচ—একটি নক্ষত্রের মতই উজ্জ্বল আলো বিকীরণ করছে তা—

সমরমন্ত্রকের প্রযুক্তি উপদেষ্টা কেলডর আমারিনও নিঃশব্দে তাকিয়েছিলেন সেই দিকে।

“জিনিসটা কী হতে পারে কেলডর?”

“পরীক্ষা না করে সঠিকভাবে বলতে পারব না সোরাক। তবে অনুমান করতে পারি,” বলতে বলতে একটু অবিশ্বাসের হাসি ফুটে উঠছিল তাঁর ঠোঁটে, “এটি একটি সুরক্ষাশক্তিক্ষেত্র। এমনকি সুক্ষতম তড়িচ্চুম্বকীয় বিকীরণও তাকে ভেদ করে যেতে পারছে না এই মুহূর্তে। চারপাশের নক্ষত্রমণ্ডল থেকে যতটুকু আলো এসে পড়েছে তার গায়ে তার সবটাই প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসছে। এই প্রযুক্তির সম্ভাবনাটুকু এখনও আলফা সেন্টাউরির গবেষকদের কাছে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার হিসেবনিকেশের স্তরেই আটকে আছে।”

“অসম্ভব। এমন কোন প্রযুক্তি বাস্তবে থাকা সম্ভব নয় কেলডর।”

কেলডরের মুখে একটা তিক্ত হাসি দেখা দিল, “অসম্ভব, তাই না সোরাক? রিডিংগুলো দেখুন। এক বিলিয়ন গিগাভোল্ট শক্তির সাক্ষর রয়েছে ওই চারশো কিলোমিটার ব্যাসযুক্ত রুপোলি গোলকের গায়ে। ভেবে দেখুন, আমাদের পূর্বপুরুষ আদিম বর্বরদের কাছে আমাদের এই যানটিও তো অসম্ভবই ছিল। আমাদের অগোচরে পৃথিবী ঠিক ততটাই এগিয়ে গিয়েছে যাতে আমরা তাদের কাছে এখন সেই আদিম বর্বরের পর্যায়ে পড়ে রয়েছি।”

“বর্বর! ভালো। আজ তবে বর্বরদের শক্তি দেখুক এরা। এতক্ষণে আমাদের আরো ন’শোটি যান সৌরমণ্ডলের কাছে পৌঁছে গিয়েছে।” দাঁতে দাঁত পিষছিলেন সোরাক। অপ্রত্যাশিত প্রতিরোধের মুখে পড়ে হঠাৎ করেই তাঁর মুখের ওপর থেকে সভ্যতার মুখোশটি খসে পড়ে আদিমকালের সেই যোদ্ধা বর্বর মানুষটিই বের হয়ে এসেছে যেন। তাঁর সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন সামনে ভাসমান শত্রুর দিকে কেন্দ্রীভূত। তাঁর রক্তে তখন সুপ্রাচীন সেই রণবাদ্যের দোলা লেগেছে। অন্ধ আক্রোশে অস্ত্র হাতে ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন অনুভূতিই তখন আর মাথায় নেই সেই দানবজীবের। যোগাযোগ চ্যানেল খুলে বহরের সমস্ত যানের প্রতি দ্রুত নির্দেশ পাঠাতে শুরু করলেন সোরাক—


আস্তে আস্তে নৌবহরের বৃত্তটি এগিয়ে আসছিল কেন্দ্রবিন্দুতে স্থির হয়ে ভাসন্ত গোলকটির দিকে। দশ হাজার কিলোমিটার দূরে এসে তারা স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারপর অগ্রবর্তী একটি যান থেকে গোলকটির দিকে ছিটকে গেল একটি শক্তির ঝলক--

হঠাৎ সেই কবচের গায়ে একটি ক্ষীণ আঘাত এল। জলাশয়ে একটি ক্ষুদ্র প্রস্তরখণ্ডের আঘাতের মতই তার কেন্দ্রবিন্দু থেকে রৌপ্যবর্ণের আবরণের গায়ে ছড়িয়ে গেল মৃদু তরঙ্গের হিল্লোল—


সুরক্ষাকবচের কেন্দ্রস্থলে ভেসে থাকা নৌকার বুকে তাঁর ঘরটির থেকে সেইদিকে নিঃশব্দে তাকিয়েছিলেন হবিষ্ট। আঘাতটি আসবার পর সবকিছু নিঃশব্দ হয়ে আছে। তাঁদের ঘিরে থাকা শত্রুবলয়টি যেন অপেক্ষায় আছে তাঁদের তরফ থেকে কোন প্রত্যুত্তরের আশংকায়। ছোটো ঘরটির সামনে ছড়িয়ে থাকা বিরাট প্রান্তরের ওপর আনন্দে চরতে থাকা জীবজন্তুগুলি ভয় পেয়েছে খুব। তাদের পরিচিত আকাশটি হারিয়ে গিয়ে হঠাৎ করে অকালের অন্ধকার নেমে এসেছে তখন। আর তারই মধ্যে সেই আকাশের গায়ে হঠাৎ এসে পড়া আঘাতটির গম্ভীর শব্দ তাদের শংকিত করে তুলেছে। সেই দিক থেকে চোখ সরিয়ে হঠাৎ হবিষ্টর পাশ থেকে উঠে দাঁড়াল সোমক।

“কী হল তোমার?”

“এর উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিতে হবে দেবর্ষী। বিনা কারণে এরা আমাদের আক্রমণ করেছে। কী ক্ষতি করেছি আমরা এদের?”

“সোমক, শোন—”

“না দেবর্ষী। আপনার মত বিনা প্রতিবাদে একে মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একটি নক্ষত্রের শক্তিকে সংহত করা শুধু—তারপর সেই তাপরশ্মির স্পর্শে একরাশ নক্ষত্রভস্মের মতই এই নৌবহর ছাই হয়ে উড়ে যাবে। নেরা—তৈরি হও। আজ এদের উপযুক্ত—”

হঠাৎ সোজা হয়ে তার সামনে উঠে দাঁড়ালেন হবিষ্ট। চোখদুটিতে তাঁর ধ্বক ধ্বক করে ক্রোধের আগুণ জ্বলছে যেন। সোমকের কাঁধে দু হাত রেখে বললেন, “যুদ্ধের সন্ধান পেয়েছ, তাই না দানব? অন্যায়ের প্রতিবাদের ছদ্মবেশে রক্তপিপাসা জেগে উঠেছে তাই। তোমার মস্তিষ্কচেতনাও দানবের জিনগত চেতনার কলুষের স্পর্শ পেয়েছে। আমি—”

“হবিষ্ট—না—”

হঠাৎ ধুলিকণার একটি স্রোত এসে তাঁদের সামনে আছড়ে পড়ল। ধুলোর স্তূপটির মধ্যে থেকে নেরার মুখটি আস্তে আস্তে রূপ নিচ্ছিল। তার চোখের তীব্র আকুতির দিকে চোখ রেখে হঠাৎ হবিষ্টর মুঠি আলগা হয়ে এল—”

“না হবিষ্ট। আপনি তা করতে পারেন না। এই মানবচেতনাটি আপনারই ব্যর্থ পরীক্ষার ফল। আপনারই তৈরি জিণগত চেতনা একে দানব বানিয়েছে। তার জন্য এ নিজে দায়ী নয়। তবু দীর্ঘদিনের সাধনায় সে আজ যে সেই দানবত্বের অনেকটাই মুছে ফেলতে পেরেছে,তার জন্য কোন কৃতিত্ব নেই আপনার। হয়ত তার চেতনার গভীরে এখনও দানবপ্রবৃত্তির সামান্য অবশিষ্ট বীজ রয়ে গেছে। কিন্তু সেই অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য তাকে ধ্বংস করলে আপনি অন্যায় করবেন হবিষ্ট। একে ধ্বংস করবার কোন অধিকার আপনার নেই—”

ঠোঁটদুটি কাঁপছিল নেরার। ততক্ষণে পূর্ণ ইশ্বরীরূপে উঠে দাঁড়িয়েছে সে হবিষ্টর সামনে। তার দুটি হাতের আশ্রয়ে ঘিরে রেখেছে সোমকের শরীরটিকে। দেবর্ষী ক্ষিতিজ কখন যেন এসে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিলেন তাঁদের পেছনে। কৌতুহলী দৃষ্টিতে সেই যুগলমূর্তির দিকে তাকিয়েছিলেন তিনিও। সেইদিকে চোখ ফেলে হঠাৎ একটি ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল হবিষ্টর মুখে। নিজের মনেই একটু মাথা নেড়ে বললেন,“একে নিয়ে যাও নেরা। উপস্থিত অচেতন করে রেখে নির্ধারিত পরিকল্পনায় কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবে। কাজ শেষ হবার পর এর চেতনার ত্রুটিগুলি সংশোধন করে তারপর ফের আমার সামনে আনবে। আর,সঠিক সময়ে আমাকে প্রতিরোধ করবার জন্য ধন্যবাদ। এই চেতনাটি এখনও অনেক কাজে লাগবে আমাদের।”

হঠাৎ একঝাঁক আঘাত একসঙ্গে এসে আছড়ে পড়ল সুরক্ষাবলয়ের ওপর। থরথর করে কাঁপছিল সেই শক্তি আবরণ। তারপর আবার-আবার— বাতাসে হঠাৎ নেরার গলা ভেসে এল,“সুরক্ষাবলয় দুর্বল হয়ে আসছে দেবর্ষী। ক্রমাগত আঘাত চলতে থাকলে—”

“কোন প্রত্যাঘাত নয়। উল্লম্ফন গহ্বরের দরজা খোল,” স্থির কন্ঠে আদেশ দিলেন হবিষ্ট।

রাশি রাশি শক্তি তরঙ্গ চারপাশ থেকে আঘাত করে চলেছে গোলকটিকে। সেই আঘাতের তীব্রতায় একটু একটু করে ঔজ্জ্বল্য হারাচ্ছিল তার শ্বেতবর্ণ আবরণ।

সোরাকের চেপে থাকা ঠোঁটদুটিতে এইবারে মৃদু হাসির রেখা ফুটল একটা। আর বেশিক্ষণ প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারবে না ওই সুরক্ষা গোলক। আর তারপর, উন্মুক্ত মহাকাশের বুকে তাঁর একশো রণতরীর মুখোমুখি হতে হবে সুরক্ষাবলয়ের পেছনে আত্মগোপনকারী ওই পার্থিবদের।

“শক্তির সঞ্চয় কমে আসছে সোরাক। গণনা অনুযায়ী আর সাতটিমাত্র পূর্ণশক্তির ঝলক অবশিষ্ট আছে প্রতিটি কামানে—” দক্ষিণ উইং থেকে আসা সতর্কবার্তাটা হঠাৎ সোরাকের মাথায় আগুণ ধরিয়ে দিল। এই কৌশলই করেছে তাহলে এরা। বর্মের আড়ালে বসে তাঁকে প্রথমে শক্তিহীন করে নিয়ে তারপর--

সাফল্যের এত কাছে এসে—না। এ হতে পারে না। সামনের নিয়ন্ত্রণ প্যানেলটির গায়ে দ্রুত আঙুল চলছিল তাঁর। সবকটি যোগাযোগ চ্যানেল খুলে গেছে। বহরের প্রতিটি রণতরীতে গমগম করে তাঁর আদেশ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল,“জোড় সংখ্যক রণতরীরা শেষ ঝলক অবধি আঘাত চালিয়ে যান,বিজোড়সংখ্যকরা পিছিয়ে এসে অপেক্ষা করুন।”

কিন্তু সে নির্দেশের ফলটি নজরে আসবার আগেই কেলডর আমারিনের ডাকে চমক ভাঙল তাঁর। প্রাণপণে অন্য একটি পর্দার দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করছিলেন তিনি। তাড়াতাড়ি সেইদিকে উঠে গেলেন সোরাক। কেলডরের চোখে অবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট ছিল। “একটা সুরঙ্গ খুলে যাচ্ছে সোরাক। শক্তির পরিমাণটা দেখ—”

অতি মহাকাশ উল্লম্ফনের বিজ্ঞান সোরাকের অজানা নয়। পর্দায় ভাসমান সংখ্যাগুলির অর্থ তাঁর কাছে অপরিচিত ছিল না। প্রায় ফিসফিস করে তিনি বললেন, “তার মানে এ সুরঙ্গের অন্যপ্রান্ত—পঁচিশ হাজার আলোকবর্ষ দূরে—ক্যানি মেজরি তারামণ্ডলের আউটার রিং-এ--অবিশ্বাস্য! মানুষের কল্পনাতেও এত শক্তিমান সুরঙ্গসৃষ্টির বিজ্ঞান এখনো— কী করে সম্ভব কেলডর—কী করে—”

“সোরাক, এইদিকে দেখুন—”

ন্যাভিগেটর ট্রিসিয়া হোন-এর উত্তেজিত গলার শব্দে তাড়াতাড়ি মূল প্রক্ষেপণক্ষেত্রের দিকে ঘুরে তাকালেন সোরাক। নিয়ন্ত্রণকক্ষের সমস্ত চোখগুলোই হঠাৎ করে সেই পর্দাটির দিকে ঘুরে গেছে। সেখানে দৃষ্টিক্ষেত্রের একপ্রান্তে সুবিশাল অতিমহাকাশ সুড়ঙ্গের মুখটি উন্মুক্ত হয়ে রয়েছে, আর,তার দিকে ধীরে ধীর এগিয়ে চলেছে অতিকায় গোলকটি। ক্রমাগত শক্তিবর্ষণের আঘাতে তার আবরণ ছিঁড়েখুঁড়ে এসেছে প্রায়। অর্ধস্বচ্ছ হয়ে আসা মেঘবর্ণ সেই আবরণের অন্তরাল থেকে একমুহূর্তের জন্য অতিকায় একটি প্রাগৈতিহাসিক নৌকার অবয়ব দেখা গেল। তার বুকে যেন ছবির মতন আঁকা রয়েছে আদিম কোন গ্রহের কল্পদৃশ্য।

কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যই। আক্রমণকারী দলটি কোনকিছু বোঝবার আগেই হঠাৎ গতি বাড়াল সেই প্রাগৈতিহাসিক নৌকা। তারপর, সুড়ঙ্গের একেবারে সামনে পৌঁছে হঠাৎ শরীর থেকে সমস্ত আবরণ ঝেড়ে ফেলল সে। এক মুহূর্তের জন্য আলোকোদ্ভাসিত রাজকীয় রূপটি দেখা গেল তার,তারপর, নদীপর্বতঅরণ্য শোভিত বিস্তীর্ণ প্রান্তরটিকে বুকে নিয়ে অতিকায় নৌকাটি ঝাঁপ দিল দেশকালহীন সেই সুরঙ্গের মুখে।


********

সময় স্থির হয়ে ছিল। দূরত্ব উধাও। অনন্তকালব্যাপী স্থায়ী একটি মুহূর্তখণ্ডে স্থির হয়ে থেকে ফের যখন স্বাভাবিক স্থানকালে ফিরে এল নৌকাটি, তখন আকাশগঙ্গা তারামণ্ডলটি বহুদূর আকাশের বুকে একটি ধূসর আলোকবিন্দুতে পরিণত হয়েছে--


(চলবে)



(পরবাস-৬২, মার্চ - মে, ২০১৬)