[an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive]
অনন্ত যৌবনের সন্ধানে

মানুষের চিরকালই রোগভোগের ভয়। আমার মনে হয় ইদানীং সেটা আরও বেড়েছে। ছোটোবেলায় ও যুবাবস্থায় আমাদের স্বাস্থ্য ভালোই থাকে তাই তা নিয়ে মাথাব্যথাও অনেক কম। কিন্তু চল্লিশ পেরোলেই নানারকম আধিব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধে আর তাই নিয়ে সর্বক্ষণ চিন্তাও শুরু হয়। অনেক সময় স্বাস্থ্য-সচেতনতা একটা বাতিক হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এদেশে--আমেরিকায়--আমরা স্বাস্থ্য বা তার অভাব সম্পর্কে একটু বেশিই চিন্তা করি। সুখ বা 'হ্যাপিনেস'-এর পিছনে ছোটা আমাদের যেন 'রাষ্ট্রীয় কর্তব্য'। আর স্বাস্থ্য তো সুখের ক্ষেত্রে অপরিহার্য। স্বাস্থ্য না থাকলে আর সুখ কোথায়? এদেশে স্বাস্থ্য বলতে বোঝায় যৌবন। তাই যৌবন ধরে রাখার জন্য অসীম প্রচেষ্টা। মাথার চুলের রং থেকে ভিয়াগ্রা পর্যন্ত সবই এই যৌবন ধরে রাখার নিরলস চেষ্টা।

আমি সত্তরের দশক থেকে এদেশে ডাক্তারি পেশায় নিযুক্ত। সত্তরে ও আশিতে স্বাস্থ্য ও রোগভোগ নিয়ে এতটা বাড়াবাড়ি ছিলো না। আশির দশকের শেষভাগে ও নব্বুই দশক থেকে কয়েকটা বিশেষ ঘটনার জন্য স্বাস্থ্য ও রোগ এদেশের মানসিকতায় একটা বিরাট দখল বসিয়ে নিল। ওই সময় থেকেই আমেরিকানদের চিকিৎসা-বীমা ('মেডিক্যাল ইন্‌সিওরেন্‌স'), 'ম্যালপ্র্যাক্‌টিস' বা চিকিৎসায় গাফিলতির জন্য আদালতে ক্ষতিপূরণ চাওয়া, এবং স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য সাধারণ খরচ--এসবই অন্যান্য খরচ বা আয়ের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েই চলেছে। এমন, যে হাজার হাজার লোকেদের সাধারণ ওষুধ কেনাও ক্ষমতায় কুলোচ্ছে না। ঠিক এই সময় থেকেই আমরা দেখছি যে ওষুধ কোম্পানিগুলি সোজাসুজি জনতার প্রতি উদ্দেশ্য করে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছে। এইটা হঠাৎ আইনসম্মত হয়ে যাওয়ায় টেলিভিশন ছেয়ে 'লিপিটর' (কোলেস্টেরল), 'প্রাইলোসেক' (অম্বলের বা অ্যাসিড-রিফ্লাক্স), অ্যালেগ্রা (অ্যালার্জি) থেকে পুরুষদের যৌনক্ষমতা-বর্ধক ভিয়াগ্রা পর্যন্ত সব রকমের ওষুধের নাম ও কার্যপ্রণালীর বিজ্ঞাপন দেখানো শুরু হয়ে গেলো। এইসব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আম জনতাও জেনে গেল হরেক রকম রোগের উপসর্গ, চিকিৎসা ও নতুন ওষুধগুলোর নাম ও বিবরণ। দেশের লোকের হঠাৎ ক্যানসার বা অস্টিওপোরোসিস নিয়ে চিন্তার একমাত্র প্রধান কারণ এই বিজ্ঞাপনগুলো। শুধু জনসচেতনাতাই নয় (সেটা হয়ত একদিক দিয়ে হিতকারী), ওষুধের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধিরও কারণ এই বিজ্ঞাপনগুলি। এর আগে পর্যন্ত এইসব বিজ্ঞাপন শুধু ডাক্তারী জার্নালেই আবদ্ধ ছিল এখন সবাই একরাতে সর্বরোগ-বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠল ও ওষুধের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও বাড়তে লাগল।

জনসাধারণের মনে রোগ সম্পর্কে অতিসচেতনতা বা ভীতি উৎপাদনের আরেকটি প্রধান কারণ আন্তর্জাল। নব্বুই-এর দশক থেকে ইন্টারনেট বা আন্তর্জাল ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে। আজকাল জালমুক্ত জীবন কল্পনাই করা যায় না। ইন্টারনেটের সুবিধা ও গুণের তালিকা সবারই জানা। রোগ ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে হাজার হাজার ওয়েবসাইট আছে এবং প্রতিদিন নতুন সাইট ও তথ্যাবলী যোগ হচ্ছে। অনেকগুলি সাইট প্রসিদ্ধ সংস্থা দ্বারা পরিচালিত—যেমন অ্যামেরিকান ক্যানসার সোসাইটি, বা মেয়ো ক্লিনিকের বা ন্যাশনাল ইনস্টিটুট অফ হেলথ্‌-এর সাইটগুলি ডাক্তার ও রোগী দুইজনকেই জরুরী তথ্য জানান দেয়। কিন্তু অনেক সাইটেই অনেক ভুল ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয় যা সাধারণ মানুষের পক্ষে অনেক সময় বিচার করা অসম্ভব। ইন্টারনেটে কোনোরকম তত্ত্বাবধান না থাকার জন্যই এটা সম্ভব। এরকম সাইটের তথ্যে বিশ্বাস করে অনেকেই ভুল চিকিৎসায় প্রাণ হারিয়েছেন বা সর্বস্ব খুইয়েছেন। এছাড়াও এরকম সাইট নানারকম দুর্ভাবনা, উদ্বেগ ও অহেতুক ব্যাধি কল্পনার (hypochondria) সৃষ্টি করে।[১]



তৃতীয় কারণ, আমার মতে, ডাক্তারী খবরের রিপোর্টিং। এটা সম্প্রতি খুব বেড়েছে এবং সব বড় বড় টেলিভিশন খবর সংস্থায়, খবরের কাগজে, ও ম্যাগাজিনে এখন একাধিক ডাক্তারী বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা (যাঁরা অনেক সময়েই ডাক্তার নন) লেখেন। কোনো ডাক্তারী গবেষণার কাঁচা ফলাফল—তা ভাল করে প্রমাণিত হবার আগেই— বেশ ফলাও করে কাগজে ছাপা হয় বা টি. ভি.-তে সাক্ষাৎকারে দেখানো হয়। এইভাবেই আমরা আজ শুনি মাছ স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী, তো কালকেই অন্য কাগজে ছাপা হয় পারা ধাতুর সংমিশ্রণের ফলে মাছ দূষিত। একদিন পড়লাম কফি স্বাস্থ্যের পক্ষে উপকারী, দ্বিতীয় দিন শোনা যায় কফি একধরনের ক্যান্সার বাড়ায়। ম্যামোগ্রাম (Mammogram) স্তনের ক্যান্সার ধরতে পারে—পরে গবেষণায় দেখা গেল সেটা হয়ত সত্যি নয়। এক বছর হরমোনের খুব জনপ্রিয়তা, পরের বছর ক্যান্সার ঘটানোর জন্য হরমোন ত্যাগ করার উপদেশ। এই কোনটা ছেড়ে কোনটাকে ধরব, কাকে বিশ্বাস করব তাই নিয়ে বিচক্ষণ বিজ্ঞানীরাও মুশকিলে পড়েন। এর ফলে সাধারণ লোক হয় সবকিছু নাকচ করে ভাগ্যের হাতে নিজেদের সঁপে দেন অথবা কল্পিত উদ্বেগ ও আশংকায় ভোগেন। কোনোটাই কাম্য নয়।

আমি সর্বতোভাবে বিশ্বাস করি যে রোগীকে (আজকাল এঁদের healthcare consumer বলা হয়) তাঁর রোগ সম্বন্ধে সবকিছু খোলাখুলি জানানো এবং আলোচনা করা উচিত। চিকিৎসার বিধিবিচার সিদ্ধান্তের পুরোটাই রোগী বা তাঁর পরিবারের মতামত নিয়েই কার্যকরী করা উচিত। বিশেষ করে যাঁরা শিক্ষিত ও ইন্টারনেট বিশেষজ্ঞ তাঁরা ডাক্তারের সঙ্গে সমানভাবে মতামত দিতে পারেন। আগেকার যুগে যেমন ডাক্তারদের দেবতার মত মানা হত, এবং মুখ বুজে ডাক্তারের নিদান মেনে চলতে হত— সে জমানা আর নেই। কিন্তু অনেক সময়েই অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী হয়। অথবা খুব বেশি তথ্যজ্ঞানও কখনো কখনো অতি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আজকাল যে আমরা টেলিভিশন খুললেই নানারকম ওষুধের গুণাবলী শুনি তাতে অনেকেই বিশ্বাস করেন যে এসব ওষুধ ইচ্ছা করলেই পাওয়া যায়। বিশেষ করে life-style ওষুধগুলি - যেগুলি ভীষণ জনপ্রিয়ও বটে—যেমন টাকমাথার জন্য Minoxidil, মন ভালো করার জন্য Prozac, যৌন আবেদন বাড়াবার জন্য Viagra, ওজন কমাবার জন্য Dexatrim, বুড়ো বয়সেও শরীর সমর্থ ও সুন্দর রাখার জন্য নানারকম হরমোন ইত্যাদি ইত্যাদি।



আমেরিকার স্বাস্থ্য সচেতনতাকে সবথেকে বেশী প্রভাবিত করেছে নানারকম রোগ প্রতিষেধক পরীক্ষা (preventive test)। যেমন প্যাপ টেস্ট (Pap Smear) যা মারাত্মক প্রাণঘাতী জরায়ুর (cervix) ক্যানসার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে। এই রোগ ভারতে (ও অন্যান্য দেশে যেখানে সর্বতোভাবে প্যাপ টেস্ট চালু হয়নি) খুবই ব্যাপক। এই সহজ ও সুলভ পরীক্ষা ক্যানসার ছাড়াও ক্যানসারের আগের স্টেজের চিহ্ন ধরতে পারে। এবং তার মূল কারণ যে ভাইরাস (Papilloma Virus) তারও অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারে। এতে অবশ্যি অনেক মহিলার জীবন বেঁচেছে কিন্তু সেইসঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও ব্যয়সাপেক্ষ পরীক্ষানিরীক্ষা এবং চিকিৎসাও করতে হয়েছে--over treatment যাকে বলে। সাধারণ প্যাপ টেস্টের দাম বেশি নয় (দশ থেকে কুড়ি ডলারের মধ্যে) কিন্তু ভাইরাস টেস্টটা যোগ করলে দাম চারগুণ বেড়ে যায়। তখন এই টেস্টটা গরীব মহিলাদের আয়ত্তের মধ্যে থাকে না, অথচ এই টেস্ট এঁদের পক্ষেই বিশেষ প্রয়োজনীয় কারণ এই ভাইরাসের প্রাবল্য এই মহিলাদের শরীরেই সবথেকে বেশি। অথচ এঁরা এই পরীক্ষার উপযোগিতা পান না। এমনই আমাদের স্বাস্থ্যবীমার অবস্থা।

হয়ত আমাকে অনেকেই অদৃষ্টবাদী আখ্যা দেবেন। তা দিন, তবুও বলব যে আমাদের সবারই বোঝা উচিত যে এইসব রোগ প্রতিষেধক ওষুধ ও টেস্ট সত্ত্বেও যে কোনো মানুষের ক্যানসার হতে পারে এবং হয়ও। টেস্টগুলি অবশ্যই জনস্বাস্থ্যের পক্ষে হিতকারী কিন্তু একটি রোগীর জীবনে কোনো গ্যারান্টি নেই। আমরা বলতে পারি যে ১০০ জনের মধ্যে নব্বুই জনের অমুক রোগ হবে না। কিন্তু আপনি যে সেই দুর্ভাগা দশজনের মধ্যে পড়বেন না তা কেউ হলফ করে বলতে পারে না। এই সত্যটা আমাদের সবারই বোঝা উচিত। তাই প্রতিবছর প্যাপ টেস্ট, কোলোনোস্কোপি, প্রস্টেট টেস্ট, ম্যামোগ্রাফি ইত্যাদি করা সত্ত্বেও এবং সবরকম স্বাস্থ্যকর সুষম খাবার খাওয়া, সিগারেট ইত্যাদি না খাওয়া সত্ত্বেও ক্যানসার, হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। তার মানে এ নয় যে আপনি এসব চেক আপ বন্ধ রাখুন। শুধু পরিসংখ্যান (statistics) এর সত্যটা খেয়াল রাখবেন।

আমাদের প্রজন্ম (baby boomers) সবে বার্ধ্যকে পা রাখছে। কিন্তু এতে ভয়ের বা চিন্তার কোনো কারণ নেই। আমাদের আগেও আমাদের বাপ-মা, ঠাকুর্দা-ঠাকুরমারা বুড়ো হয়েছেন ও স্বর্গত হয়েছেন। তাঁরা কিন্তু বার্ধক্যকে একটা রোগ বলে মনে করেননি। আজকাল আমেরিকায় এইটাই ফ্যাশন হয়েছে--পাকা চুল রঙ করা, মুখের জরার চিহ্ন বোটক্স দিয়ে মসৃণ করা, বয়সোচিত দুর্বলতাকে টেস্টোস্টিরন হরমোন দিয়ে সবল করা, মেনোপজের সময় হট ফ্ল্যাশ সারাতে ইস্ট্রজেনের সাহায্য নেওয়া, যৌনদুর্বলতা (বয়সোচিত) দূর করতে ভায়াগ্রা বা সিয়ালিস নেওয়া ইত্যাদি। এ সবই তো বয়সের নিয়ম। আমাদের বাপঠাকুর্দারা তো এসব 'রোগে' কখনো ভোগেননি। যৌনদুর্বলতাটা তো হিন্দু শাস্ত্রে সংযমেরই আরেক নাম। জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে মোহ, কাম ইত্যাদি রিপু ত্যাগ করাটাই শ্রেয়, তাকে ভিয়াগ্রা দিয়ে চিকিৎসা করা নয়! আমার মনে আছে আমার মা তাঁর প্রথম পাকা চুল নিয়ে কত গর্ব করতেন। তাঁর কাছে বৃদ্ধাবস্থা মানে শ্রদ্ধা, সম্মান, অভিজ্ঞতার কৃতিত্ব! কিন্তু আমেরিকায় এটা ঠিক উলটো, এখানে সর্বত্রই যৌবনের জয়গান, অভিজ্ঞতার কোনো দাম নেই ও বুড়োবয়সের জন্য নেই কোনো শ্রদ্ধা বা সম্ভ্রম। তাই সবাই যেন তেন প্রকারেণ বুড়ো বয়সটা ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। এখন সত্তর বছরের বৃদ্ধরও চাই চল্লিশ বছরের মতো লাফঝাঁপ করা ও যৌন আগ্রহ দেখান। সেটা না হলেই অস্বাভাবিক।

এই ব্যাপারটা কি করে বা কবে থেকে শুরু হল তা আমি জানি না। আমাদের আগের প্রজন্মের লোকেদের তো এ-নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না। হয়তো অন্যান্য সমস্যা তাঁদের ব্যস্ত রাখতো। হয়তো দেবদেবীতে ভক্তি তাঁদের মনে শান্তি দিত। সেইরকম ধর্মকর্মেও আজকাল লোকেদের ভক্তি কমে গেছে। আমার মনে আছে আমার ঠাকুরমা গুন গুন করে 'ঠাকুর পার করো আমারে' গাইতেন। এখন এদেশে আশি বছরের কোনো বৃদ্ধা এরকম গাইলে তাঁকে ডিপ্রেশনের জন্য প্রোজ্যাক ধরিয়ে দেবে।

এদেশে আমরা দীর্ঘায়ু এবং সুস্থ সবল থাকার জন্য ব্যস্ত। ৯০ শতাংশ-এর অধিক জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের ডলার জীবনের শেষ বছরে খরচ হয়ে যায়। মৃত্যুর ঠিক আগেই আমরা দামী ওষুধ, হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকা, রেসপিরেটর, ইন্‌টেনসিভ কেয়ার ইউনিট ইত্যাদিতে জলের মত টাকা খরচ করি--অথচ রোগ হয়ত ক্যানসারের শেষ অবস্থা বা অ্যালজাইমার রোগ যার কোনো প্রতিকার নেই। আজকাল D. N. R (Do not Resuscitate), Living Will ইত্যাদির চল হয়েছে। আগে থেকে সেগুলি লিখে রাখলে হাসপাতালে যন্ত্রপাতি দিয়ে জীবিত রাখাটা রদ করা যায়, কিন্তু খুব কম লোকই এসব ভেবে রাখেন। আসল কথা, আমাদের সবাইকেই একদিন না একদিন মরতে হবেই। আগেকার যুগে লোকেরা নিজের বাড়িতে আত্মীয়স্বজন পরিবৃত হয়ে মারা যেতেন। নিউমোনিয়া ছিল অনেক সময়েই শেষ ব্যাধি। শ্বাস ওঠাটাও নিউমোনিয়ার অন্তিম লক্ষণ। নিউমোনিয়াকে বুড়ো মানুষদের 'বন্ধু' বলা হত। এখন অ্যান্টিবায়োটিকের দয়ায় খুব সহজেই নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করা যায়। বেশি কঠিন অবস্থা হলে হাসপাতালে I. C. U. ও রেসপিরেটর, অক্সিজেন ইত্যাদি তো আছেই। এর পরে এল হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু—তারও এখন খুব ভালো (এবং দামী) চিকিৎসা করা যায় হাসপাতালে। তাতেও মারা না গেলে আছে নিরাময়হীন অ্যালজাইমার। আসলে আমাদের একটা না একটার খপ্পরে পড়ে মৃত্যু হবেই। এর ছাড় নেই। এখন অ্যালজাইমারের ওষুধ আবিস্কার হলে আবার আরেকটা নতুন রোগের দেখা দেবে। এই-ই নিয়ম। এতসব চেষ্টা করেও আয়ু বেশী বাড়ানো যায় না--বরং শেষজীবনের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য-বাজেটের বেশিরভাগই খরচ হয়ে যায়। তার জায়গায় আমরা বুড়োরা যদি নিজেদের স্বার্থ একটুখানি ছেড়ে দিই, সেই পয়সায় ছোট বাচ্চা বা প্রসূতি মায়েদের অনেক চিকিৎসা, প্রতিষেধক টীকা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা যায়। সেটাই সমাজের পক্ষে লাভ নয় কি?

পাঠকরা প্রতিবাদ করার আগেই বলে রাখছি যে আমি মোটেই বুড়োদের পাহাড় থেকে অগাধ জলে ফেলে দিতে কিংবা একলা বনে নির্বাসন দিতে বলছি না কিন্তু একটু সাধারণ জ্ঞান নিয়ে ভাবলেই বোঝা যাবে যে অন্তিমকালে দামী ওষুধ, অপারেশন ইত্যাদির চেষ্টা না করে শান্তিতে, ব্যথা-বেদনাহীনভাবে মরতে দেওয়া সকলেরই কাম্য। আমরা বুড়োরা মৃত্যুকে ভয় করি না, ভয় করি মৃত্যুর আগে ব্যথা যন্ত্রণা, অপমান, অসম্মানের মনোকষ্ট। অপেক্ষাকৃত অল্প খরচেই এই সমস্যাগুলির মোকাবিলা করা যায়। সব দেশেরই স্বাস্থ্য বাজেট সীমিত। আমাদের উচিত এই সম্পদের বেশিরভাগ শিশু ও যুবকের রোগ ও স্বাস্থ্যের জন্য ব্যবহার করা।

আমেরিকার মত বিরাট, ধনী, নবীন দেশের বাসীরা স্বভাবতই আশাবাদী আর সুখী ভবিষ্যতে বিশ্বাসী। ব্যক্তিগত সুখকে তারা আয়ত্তাধীন বলে মনে করে। প্রযুক্তিবিদ্যার যুগে তারা কোনো রোগই দুরারোগ্য মনে করে না। অঢেল পয়সা দিয়ে যে কোনো বাধা অতিক্রম করায় এরা বিশ্বাস করে। এতদিন তা সম্ভবও হয়ে এসেছে কিন্তু এটারও সীমা আছে। একবিংশ শতাব্দীতে নতুন বাস্তবতার সম্মুখীন আমরা। অন্তহীন সুখের আশায় কিছু কাটছাঁট করতে হবে যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্মের জন্যও কিছুটা বাকী থাকে।


(এই রচনাটির মতামত লেখিকার নিজস্ব। 'পরবাস' বা সম্পাদক এর জন্য দায়ী নন।)

[১] এই প্রসঙ্গে রীতিমত উল্লেখযোগ্য যে আন্তর্জালের নিরীখে প্রায় আদ্যিকালেই এই বিষয়গুলি নিয়ে পরবাস-এর পাতাতেই দু'টি সুন্দর প্রবন্ধ লিখেছেন অরিন্দম বসু--(১) 'প্রসঙ্গঃ ইনটারনেট-এর মাধ্যমে তথ্যানুসন্ধান -- কতটা খাঁটি' (পরবাস-৪, ১৯৯৮), এবং (২) 'আন্তর্জাল ও সাম্প্রতিক চিকিৎসাবিজ্ঞান' (পরবাস-১০, ১৯৯৯)।

[an error occurred while processing this directive]

[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]