হিমঘরে একা

ত্তর আমেরিকার ঠিক মাঝখানটায় কয়েক হাজার মাইল জুড়ে এক অদ্ভুত ঘাস জমি আছে, ভৌগোলিকেরা তার নাম দিয়েছেন প্রেয়ারি। এককালে এখানে বাইসন আর রেড ইন্ডিয়ানদের রাজত্ব ছিল। এখন সেসব সাফসুতরো করে সাহেবরা চাষের ক্ষেত আর পশুখামার বানিয়েছেন, ইদানীং মাটির তলায় তেলের ভাণ্ডারও মিলেছে, কাজেই লোকজনের হাতে দেদার পয়সা। জুন মাস নাগাদ যদি সেদেশে যান তাহলে ঢেউ খেলানো আদিগন্ত সবুজ আর ঘন নীল আকাশে ধবধবে সাদা মেঘের পাল দেখে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। তখন রাত্তির নটা অবধি ঝকঝকে রোদ্দুর থাকে, ছোটবড়ো অসংখ্য লেকের ওপর মাছধরা নৌকা আর মেঘের ছায়ারা ভেসে চলে, ছোট ছোট শহরগুলো ক্যানভাসে আঁকা ছবির মত দেখায়। হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গেলে দেখবেন, দুপাশে যতদূর চোখ যায় ফাঁকা সমতলভূমি গড়াতে গড়াতে যুক্তরাষ্ট্র পার হয়ে কানাডার মধ্য দিয়ে সিধে উত্তর মেরুর দিকে চলে গেছে। কিন্তু এদেশে গরমকাল মাত্র তিনমাস। সেপ্টেম্বর এসে গেলেই হাওয়ায় শিরশিরানি টের পাওয়া যায়, গাছের পাতার রং বদলাতে শুরু করে। মাসখানেকের মধ্যেই সবুজ উধাও হয়ে গিয়ে উজ্জ্বল লাল আর হলুদ রঙের পাতারা সারাদিন ধরে ঝরে পড়তে থাকে। বিরাট ঘাসের ক্যানভাসে ইচ্ছেমতন রঙের তুলি বুলিয়ে দেবে সেইসব পাতারা, মেপল গাছের ডালে ডালে আগুনের শিখার মতো জ্বলতে থাকবে রঙের পাগলামি। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঘনিয়ে আসবে শীতল কুয়াশা, এলোমেলো হাওয়ার ঝাপটায় রাস্তার ওপরে শুরু হয়ে যাবে শুকনো পাতার বিরামহীন নাচ। এইসময় যদি আপনি শহরতলিতে একটু সান্ধ্যভ্রমণের মতলবে বেরিয়ে পড়েন, দেখবেন বাড়িগুলোর সামনে জ্বলছে কুমড়োর খোল দিয়ে বানানো ভৌতিক জ্যাকল্যান্টার্ন। এখানে ওখানে মাথা তুলেছে বেওয়ারিশ কবরখানা, ছেঁড়া কাপড় পরা কঙ্কাল আর তেকোনা টুপি মাথায় ডাইনিবুড়ি, লম্বা কোর্ট পরা ড্রাকুলা, সবার সঙ্গেই আপনার মোলাকাত হয়ে যাবে। মৃতদের আত্মা, ভূতপ্রেত, ডাইনি, পিশাচদের এই উৎসবের নাম হ্যালোউইন বা মৃত মানুষদের উৎসব। শুকনো পাতার সরসর আওয়াজ, হঠাৎ করে ঠাণ্ডা হাওয়ার শিরশিরানি, মেঘলা আকাশ আর স্যাঁতসেঁতে কুয়াশা সবকিছুর সাথেই বেশ খাপ খেয়ে যায় এই অশরীরী আবেশ, আগুনের চারপাশে বসে ভয়াল ভয়ঙ্কর সব কাহিনী, ব্ল্যাক ম্যাজিক আর শয়তানির ইতিবৃত্ত। এখন অবশ্য এর সবটাই বানিয়ে তোলা নিরাপদ, ভয় পাওয়াটাই এখন মজা, পাড়ার বাচ্চারা এদিন ভূতপ্রেত সেজে বাড়ি বাড়ি চকোলেট আদায় করতে যায়। কিন্তু শহর ছাড়িয়ে আপনি যদি পুরনো গাছপালা আর শুকনো পাতায় ঢাকা কবরখানার দিকটায় যান, আমি বাজি ধরে বলতে পারি হ্যালোউইনের রাত্তিরে আপনি হয়ত নিজের অজান্তেই শিউরে উঠবেন। আপনাকে তাড়া করে ফিরবে পো’র লেখা সেই অদ্ভুত লাইনগুলো —

‘Be silent in the solitude
Which is not loneliness – for then
The spirits of the dead who stood
In life before thee are again
In death around thee and their will
Shall overshadow thee; be still.’
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ঘাসের রং হলদেটে, চেরি আর মেপল গাছেরা বিলকুল ন্যাড়া, ঠাণ্ডা হাওয়ার ঝাপটায় শুকনো পাতারা উড়ে গেছে, তার সঙ্গে পাখিরাও উধাও। সরু ছুঁচের মতো ঘনসবুজ পাতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শুধু পাইনগাছ, তাদের গায়ে মাখামাখি হয়ে আছে পেঁজা তুলোর মতন সদ্য জমা বরফ। দিন ছোটো হতে হতে ছটার মধ্যেই অন্ধকার। অফিস থেকে ফেরার সময় আপনি দেখতে পাবেন লেকের জল জমে বরফ হয়ে গেছে, কুয়াশার মধ্যে পাইনগাছ আর ইলেকট্রিক পোলের মাথা ছুঁয়ে ছুঁয়ে গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলেছে মস্তবড়ো একটা ঘোলাটে চাঁদ। তারপর প্রতি সপ্তাহে ঠাণ্ডা বাড়তেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে, সারারাত ধরে বয়ে চলবে তুষারঝড়, নি:শ্বাসের হাওয়া থেকে চাঁদের আলো অবধি সবকিছু জমে বরফ হয়ে যাবে একদিন। এইভাবেই কাটবে মাসের পর মাস,আপনিও সূর্যের মুখ দেখতে বেমালুম ভুলে যাবেন, রাস্তার দুধারে বরফের গাদা রোজ আরো উঁচু হতে থাকবে। এরই মধ্যে একদিন আপনি সকালে উঠে দেখবেন, থার্মোমিটার দেখাচ্ছে শূন্যের তলায় চল্লিশ ডিগ্রি, জানলার বাইরে যতদূর চোখ যায় ছড়িয়ে আছে এক অপার্থিব সাদা চাদর। চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল রোদ কিন্তু তাতে এক ফোঁটা উত্তাপ নেই, পাইন গাছেরা যেন সাদা ক্যানভাসের ওপরে পেনসিল দিয়ে আঁকা ছবি। পৃথিবীর সব দরজা সেদিন বরফের ভারে বন্ধ হয়ে গেছে, স্কুলকলেজ, অফিস বা দোকানপাট কোথাও জ্যান্ত প্রাণীর কোনো চিহ্ন নেই। হাড় মজ্জা জমিয়ে দেওয়া হাওয়া বয়ে চলেছে সোজা উত্তর মেরু থেকে তার মধ্যে উড়ন্ত কোটি কোটি বরফের সূঁচ। আপনি এইরকম এক রাত্রিশেষে মাথা সমান বরফের গাদা সরিয়ে, শহরের শেষপ্রান্তে একটা জমাট বাঁধা লেকের ধারে হাজির হয়েছিলেন। ওইরকম পিছল রাস্তায় গাড়ি স্কিড করাই স্বাভাবিক কেননা আপনাকে গাড়িশুদ্ধ রাস্তার ধারে একটা বরফভর্তি খাদের মধ্যে পাওয়া গেছিল। হাইপোথার্মিয়ায় জমে যাওয়া আপনার শরীরটাকে ওরা কিছুক্ষণ আগে হাসপাতালে দিয়ে এসেছে। আমিও ছত্রিশ ঘন্টা এখানে আটকে আছি, এতক্ষণে একটু ফাঁকা পেয়ে পালাবার তাল করছিলাম, এর মধ্যে স্ট্রেচারে চড়ে আপনি এসে হাজির হলেন। আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স, ক্রেডিট কার্ড বা অন্য কোনরকম পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি কিন্তু গাড়ির নাম্বার প্লেট টেক্সাসের। এই জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ দেশের আরামদায়ক গরম ছেড়ে নর্থ ডাকোটার তুন্দ্রায় যে এসেছে তার হয় তেলের কোম্পানিতে চাকরি হয়েছে নয়তো স্রেফ মাথা খারাপ। আপনার বয়স পঞ্চাশের আশেপাশেই হবে, চেহারা দেখে মনে হচ্ছে আপনি ভারতীয়, খুব সম্ভবত: বাঙালি কারণ আপনার চুলের প্রান্তে সিঁদুরের প্রায় অদৃশ্য রেখা আর হাতে সোনা বসানো শাঁখা দেখতে পাচ্ছি। এতবড় অ্যাক্সিডেন্ট সত্ত্বেও আপনার ঘাড়ে ইনজুরি হয়নি, কোথাও হাড় ভাঙেনি, কাটাকুটিও কিছু নেই, মাথার স্ক্যান একদম পরিষ্কার। ঠাণ্ডায় জমে কাঠ হয়ে গেলেও আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে বেশ আরামে ঘুমিয়ে আছেন, সারা গা, মাথা ইলেকট্রিক কম্বলে জড়ানো, শিরার মধ্যে চলছে গরম স্যালাইন। আপাতত: আর কিছু করার নেই, আমি বরং এই সুযোগে পুলিশ অফিসারের সঙ্গে কথাটা সেরে ফেলি তারপর আপনার বাড়ির লোকদের খোঁজখবর করতে হবে। এই শহরে আমিও তো কাউকে চিনি না। আমার মাথার মধ্যে রাত্তির জাগার ধোঁয়াটে ক্লান্তি আর বাইরে তুষার ঝড়ের একটানা গোঙানি মিলিয়ে বেশ একটা আধিভৌতিক আমেজ। আচ্ছা আপনি তো এখন গভীর কোমায়, আপনার আত্মাটা কি শরীরের বাইরে, এই কেবিনের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে? মাঝে মাঝে যেন আপনার চোখের পাতা নড়ছে, নীলচে ঠোঁটের ফাঁকে একটু হাসির রেখা দেখা দিয়েই আবার মিলিয়ে যাচ্ছে, ফাঁকা ঘরের মধ্যে কিরকম যেন একটা ফিসফিসে শব্দের ঢেউ খেলে যাচ্ছে, কানের পাশে কেঁপে উঠছে গরম বাতাসের স্রোত।

‘নীলু এসেছিস?’

‘কেমন আছো মা? দেখো তো কি বিপদ বাঁধালে।’

‘বিপদ কেন বলছিস রে নীলু? এভাবে না হলে কি তোর সাথে আর দেখা হতো? কোনদিন কি স্বপ্নেও ভেবেছিলাম যে’—

‘মানুষ স্বপ্নে যা দেখে তার অনেকটাই সত্যি মা। যে দেখেছিলে তা বিশ্বাস করতে পারোনি। শুধু শুধু কতবড়ো একটা ভুল করতে যাচ্ছিলে মা?’

‘আপশোষ এই যে ভুল শোধরানোর সুযোগ আর পাবো না।’

‘কি যে বলো। তোমাকে ওই সুযোগটা দেবার জন্যেই তো আসা।’

‘চেষ্টা করবো রে। কথা দিচ্ছি চেষ্টা করবো। আসলে এতদিন মনে হতো যে আমার জীবনটা নেহাৎ অন্যায়ভাবে ওলটপালট হয়ে গেছে। তুই তো জানিস ভগবানের ওপর আমার খুব বিশ্বাস ছিল। ঘর ভর্তি ঠাকুর দেবতার ছবি, পুজো না করে আমি খেতাম না, প্রণাম না করে বেরোতাম না কোথাও, আমার ছবির মতো সাজানো সংসারের জন্য ঠাকুরকে ধন্যবাদ দিতাম রোজ। সেই আমারই জীবনে এমন নিষ্ঠুর দুর্ভাগ্যের আঘাত আমার কাছে সাংঘাতিক অবিচার মনে হয়েছিল, সেটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি। শাস্তি দেবার জন্য ভগবানকে তো হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না, তাই নিজেদেরই তিলে তিলে মারতাম। কখনো গলা দিয়ে একটু হালকা কথা, একটু হাসির আওয়াজ বেরোলেই সাথে সাথে শিউরে উঠতাম, যেন কি একটা অশ্লীল অবৈধ আচরণ করে ফেলেছি। তারপর মনে হতে লাগল, আমার সঙ্গে আরেকটা মানুষও সারাজীবন অসুখী থাকবে, এটাও তো ঠিক কথা নয়। শাস্তি যাদের পাওয়া উচিত তারা তো বহাল তবিয়তে রয়েছে।’

‘কাউকে শাস্তি দিয়ে কি দুর্ভাগ্যের হিসেব মেলানো যায় মা?’

‘নীলু আমি কিন্তু সব কথা জানিয়ে একটা চিঠি লিখতে শুরু করেছিলাম।’

‘জানি মা। চিন্তা কোরো না, চিঠিটা ঠিক জায়গাতেই আছে। আমি এখন যাই, তুমি রাত্তিরটা ঘুমিয়ে নাও। কাল সকালে তোমার জন্য একটা বিরাট সারপ্রাইজ আছে।’

‘আমার জন্য সারপ্রাইজ । জেগে উঠলেই পুলিশ এসে গ্রেফতার করবে, এই তো?’

‘না মা, ওটা প্লেজেন্ট সারপ্রাইজ। দেখে নিও।’

‘তুই কি করে জানলি শুনি?’

‘মা, তোমাদের কাছে সময় একটা সরলরেখা, তার শুধু পিছনদিকটাই তোমরা দেখতে পাও। মৃতদের কাছে সময় সার্কুলার, অতীত, বর্তমান ভবিষ্যৎ সব একজায়গায় আবার কেউ কোত্থাও নেই। তাই যে মৃত একমাত্র সেই ত্রিকালজ্ঞ।’

‘তুই তাই বলে এমন স্বার্থপরের মতো আমাকে ছেড়ে গেলি নীলু।’


এবার আমাকে উঠতেই হয়। আই-সি-ইউ’র বাইরে দুজন পুলিশ অফিসার হাজির হয়েছেন। আমাকে দেখে দুজনেই উঠে দাঁড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলেন কিন্তু মুখ দেখে মনে হল ডাক্তার হিসাবে এই বিজাতীয় অল্পবয়েসী ছোকরাকে দেখে একটু হতাশই হয়েছেন। আমি মনে মনে হাসলাম। এইরকম শীতকালে এঁদের চেনা ডাক্তারবাবু এখন লম্বা ছুটি নিয়ে মেক্সিকোয় রোদ্দুর পোয়াচ্ছেন। কাজ চালাবার জন্য কমদামী দেশি ডাক্তার আমদানি না করলে এদের হাসপাতালের দরজাগুলো ফটাফট বন্ধ করে দিতে হবে। সে যাই হোক আমি পুলিশের আনা জিনিসপত্রগুলো খুঁজে দেখছিলাম, আপনার বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনের কোন খোঁজ পাওয়া যায় কিনা। যা দেখলাম তাতে আমার পিলে চমকে গেল। ব্যাগের মধ্যে বেশ কিছু ক্যাশ টাকা আর খোলা খামের মধ্যে ভাঁজ করে রাখা বাংলায় লেখা চিঠি ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। চিঠিটা আপনি শেষ করেননি, খামের মুখ বন্ধ করে স্ট্যাম্পও লাগাননি, সম্ভবত: তার আগেই আপনার গাড়ি গাড্ডায় পড়েছে। সে যা হোক প্রথম কয়েক লাইনেই আপনি বেশ খোলসা করে লিখেছেন যে আপনার এখানে আসার উদ্দেশ্য ‘মার্ডার সুইসাইড’ অর্থাৎ কিনা আপনি কয়েকজনকে খুন করার পর নিজেও আত্মহত্যা করতে চান। বাংলায় লেখা বলে পুলিশ তার একবর্ণও বুঝতে পারেনি। ঠাণ্ডার মধ্যে গাড়িটাও ভালো করে খুঁজে দেখেনি বোঝা যাচ্ছে, কেননা সীটের নিচে একটা পকেট তৈরি করে আপনি নাকি পিস্তল লুকিয়ে রেখেছেন। এই মগজের ঘিলু জমিয়ে দেওয়া ঠাণ্ডায় দুটো পয়সার জন্য অন্যের প্র্যাকটিস সামলাতে এসে এ কি ঝামেলায় জড়িয়ে পড়লুম রে বাবা। আপনি তো কোমায় ঝুলে আছেন, আমি এখন আপনাকে সামলাই না পুলিশকে খবরটা দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলি। মুশকিল এইখানে যে আপনি একজন বাঙালি ভদ্রমহিলা, আপনাদের জন্য জান কবুল করা আমার ছোটবেলাকার বদভ্যাস। আপনি যেহেতু খুন বা আত্মহত্যা কোনোটাই এখনো করে উঠতে পারেননি, আমিও এসব নিয়ে এক্ষুনি শোরগোল পাকাতে চাই না। পুলিশ ব্যাটারা আপনার আন্ম গোত্র খুঁজে বার করুক, আমি সেই ফাঁকে আপনার চিঠিটা পড়ে ফেলি।


‘নীলু এই চিঠিটা তোর বাবার কাছে পাঠাবো কিন্তু এটা আসলে তোকেই লেখা। আমি জানি তোর বাবা আমাকে ক্ষমা করবে না, কিন্তু আমার বিশ্বাস যে কোনো অলৌকিক উপায়ে এই চিঠি পড়তে পারলে তুই আমাকে ক্ষমা করে দিবি। এই ভয়ঙ্কর কাজটা না করতে পারলে আমার মুক্তি নেই। সেই যে মর্গের হিমঘরে টেবিলের ওপর তোকে দেখেছিলাম, আমার আত্মাটাও সেখানেই, সেই জমাট বাঁধা যন্ত্রণায় জমে আছে। আমি জানি চরম ভায়োলেন্ট একটা কিছু না হলে, রক্তের স্রোত না বইলে এ বরফ গলবে না, আমিও অনন্ত কালের জন্য ওখানে আটকে থাকবো। এই দু:স্বপ্নের জন্য যারা দায়ী তোর বাবা তাদের ক্ষমা করে দিয়েছে, ওর কাছে আমিই বরং মানসিক রোগী হয়ে উঠেছি। এই অস্বাভাবিক জীবন, একটানা হেরে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া দিনগুলো আমি আর টানতে পারছি না। নয় মিলিমিটার গ্লক পিস্তলটা চালাতে শিখেছি, ওটা এখন সীটের তলায় রয়েছে, ওর জন্যেই প্লেনের বদলে গাড়ি করে এতটা পথ আসতে হলো। আমি বরফ জমে যাওয়া এই জঘন্য শহরটাকে ঘৃণা করি, ওদের সভ্য মুখোসের পিছনে লুকিয়ে রাখা আদিম হিংস্রতাকে ঘৃণা করি, পুলিশ নামের ওই ইউনিফর্ম পরা রেসিস্ট শয়তানগুলোকে ঘৃণা করি। সবচেয়ে ঘৃণা করি মিথ্যুক আর দালালদের আস্তানা ওদের ওই জুডিশিয়াল সিস্টেমকে। আমি ওদের ক্ষমা করবো না, নিজের হাতে ওদের শাস্তি দেবো। তারপর তোর হাত ধরে চলে যাবো আমাদের সেই রোদ্দুর ভরা ময়দানে, যেখানে হাড় হিম করা বাতাসে নি:শ্বাস নিতে হয় না, অসাড় আঙুল দিয়ে ওভারকোর্টের বোতাম খুলতে হয় না প্রতি সন্ধ্যায়।

অনিন্দ্য তোমার ওপর আমার একটুও রাগ নেই। আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম, আশা করি নতুন জীবনে তুমি আমাদের যথাসময়ে ভুলে যাবে।’

ব্যাস, চিঠি এখানেই শেষ। বোঝাই যাচ্ছে এর পিছনে ভাঙা সংসার আর অপঘাত মৃত্যু নিয়ে বেশ একটা জটিলরকমের গল্প আছে। কিন্তু আপনাকে দেখে তো ঠিক শ্রীমতী প্রতিহিংসা বলে মনে হয় না, খুবই নরম আর শান্ত চেহারা, অনেকটা আমার দিদির মতন। কাঁচের জানলার ওপারে গুচ্ছের যন্ত্রপাতি, টিউব, আর মনিটরের মধ্যে আপনি দিব্যি ঘুমিয়ে আছেন, আপনার নীল ঠোঁটের কোণায় লেগে আছে একটা আবছা হাসির রেখা। আজ সারারাত আপনাকে ব্যস্ত থাকতে হবে।

বরফের ওপর সূর্যের আলো পড়লে ভারি সুন্দর দেখায়, চারপাশটা এমন ঝকঝক করে ওঠে যে মনে হয় এক ছুটে বাইরে বেরিয়ে যাই। কিন্তু আমার ভালোই জানা আছে যে এই সময়টাই সব থেকে বিপজ্জনক। ব্লিজার্ডের পর লোকজন বাড়ি থেকে বেরোবার চেষ্টা করবে, তখনই ট্র্যাফিক অ্যাক্সিডেন্ট, পা পিছলে পতন এবং কোমর ভাঙা, ফ্রস্টবাইট বা নিউমোনিয়া ইত্যাদি যাবতীয় ঝঞ্ঝাট হয়ে থাকে। রাস্তাঘাট এখনো পরিষ্কার হয়নি, যে ডাক্তারের আমাকে ছুটি দেবার কথা তার টিকিরও দেখা নেই। ব্রেকফাস্ট খেতে গিয়ে দেখি দুই পুলিশ অফিসার সেখানে হাজির, তাদের সঙ্গে বসে আছে এক অপরিচিত তরুণী। মেয়েটি চোখে পড়ার মতো সুন্দরী, টানা টানা চোখ, এক পিঠ এলোমেলো কালো চুল, গায়ের রং উজ্জ্বল বাদামী। চোখেমুখে ভয়, অবিশ্বাস আর বিভ্রান্তি। ওর পরনে আটপৌরে রাতপোষাক, তার ওপর কোনমতে একটা কোট জড়ানো তাই ঠাণ্ডাতেও বেশ কাবু হয়েছে মনে হল।

‘আসুন ডাক্তার। আপনার পেশেন্ট কেমন আছেন এখন?’ বয়স্ক অফিসারটি চেয়ার টেনে আমাকে বসতে দিলেন।

‘একটু ভালো, আশাকরি বিকেল নাগাদ জ্ঞান ফিরে আসবে।’

‘আমার নাম অফিসার উইলেট, ইনি আমার সহকারী রজার, আমরা দুজনেই আপনার নিষ্ঠা আর কর্মদক্ষতা দেখে মুগ্ধ।’ ভদ্রলোকের গলায় আন্তরিক প্রশংসার সুর। আমেরিকানদের এই একটা স্বভাব আছে বটে। বিদেশীকে প্রথমেই সন্দেহের চোখে দেখবে কিন্তু ভালো কাজ দেখালে তার দাম দিতে কঞ্জুসি করবে না, তারিফও করবে গলা খুলে।’

‘এই মেয়েটির নাম অ্যাঞ্জেলা মার্টিনেজ, উনি খুব অদ্ভুতভাবে এখানে এসে পড়েছেন। আপনি এঁকেও পরীক্ষা করে দেখুন, তারপরে আমরা আগের পেশেন্টের কাছে যাবো।’ উইলেট মেয়েটিকে দেখিয়ে দিলেন।

‘কি হয়েছে আপনার মিস?’

‘আমরা কি একটু অন্যঘরে যেতে পারি?’ মেয়েটির গলা কাঁপছে।

‘অবশ্যই। আমি নার্সকে বলছি আপনার রেজিস্ট্রেশন করিয়ে ক্লিনিকে নিয়ে যাবে। আমি এক মিনিটের মধ্যে আসছি।’

‘প্লীজ আপনারা আমাকে পাগল মনে করবেন না। আমি একদম সুস্থ মানুষ, কোনো ওষুধ খাইনা, নেশাও করি না। আমার শরীরেও কোনো কষ্ট নেই।’

‘আপনি শান্ত হোন, চলুন সব কথা কনফিডেনশিয়ালি খুলে বলবেন।’

‘ডাক্তার উনি ব্লিজার্ডের মধ্যে রাস্তায় ছুটে বেরিয়েছিলেন। সঙ্গে বছর চারেকের একটি বাচ্চাও ছিল, সে এখন পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে। ওদের দুজনেই মারা যেতে পারতেন বিশেষ করে বাচ্চাটি। ওঁর ধারণা উনি নাকি ভূত দেখেছেন।’ রজার নামের অন্য পুলিশটি মুখ খুললো, তার গলায় সহানুভূতির কোনো চিহ্ন নেই।

‘সেসব কথা পরে হবে, আমায় আগে ওঁকে পরীক্ষা করতে দিন।’ আমি নার্সকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে উঠে পড়লাম। ঘরের দরজাটা বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি প্রায় আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। ওর মুখ ফ্যাকাশে, চোখগুলো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসবে, আঙুলের ডগা কাঁপছে থরথর করে।

‘ডক্টর প্লীজ আমায় হেল্প করুন। লিপিকা কোথায়? আমার এক্ষুনি ওঁর সঙ্গে দেখা করা দরকার।’

‘শান্ত হোন মিস, আপনি যদি রাত্রে ভর্তি হওয়া মহিলাটির কথা জানতে চান তো বলবো উনি হাইপোথার্মিক কোমায় অচেতন হয়ে আছেন, ওঁর সাথে দেখা করার প্রশ্নই নেই। কিন্তু আপনি ওঁর নাম জানলেন কি করে? ঘর ছেড়ে এই ঠাণ্ডায় রাস্তায় বেরিয়েছিলেনই বা কেন, তাও আবার বাচ্চা নিয়ে, চটি পায়ে?‘

‘বলছি কিন্তু কথা দিন ধৈর্য্য ধরে সবটা শুনবেন।’

‘ওটাই আমার কাজ। আস্তে আস্তে কফিটা খান আর সবকথা খুলে বলুন।’

‘পাঁচ বছর আগের কথা। লিপিকারা আমাদের কাছাকাছিই থাকতেন, ওঁর স্বামী অনিন্দ্য এই হাসপাতালেই ডাক্তার ছিলেন। ওঁদের একমাত্র ছেলে নীলাদ্রি আর আমি একই হাইস্কুলে পড়তাম। নীল ছিল আমার প্রথম বয়ফ্রেন্ড, আমার সুইটহার্ট, আমার সন্তানের বাবা।’

মেয়েটার চোখের জল এখন গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, আমি এদেশের দস্তুর অনুযায়ী একটা টিস্যু পেপার এগিয়ে দিলাম।

‘আগে আমার কথা একটু বলে নিই। আমার মা মেক্সিকো থেকে আসা বেআইনি ইমিগ্র্যান্ট, বাবা কে আমি জানি না। ছোটবেলা থেকে দেখেছি, মা একটা মেইড সার্ভিস অর্থাৎ লোকের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করার কোম্পানি চালায়, সেখানে অন্যান্য মেক্সিকান মেয়েরা কাজ করে। এদেশে মেক্সিকানদের জন্য কতগুলো বাঁধা কাজ আছে তার মধ্যে এটাও একটা। আমরা ছেলেমেয়েরা কিন্তু আমেরিকান, একটা স্কুলে যাই, কিন্তু তফাৎ যে কোথাও একটা আছে সেটাও আমাদের অজানা নেই। আমার অবাক লেগেছিল যখন দেখলাম যে চামড়ার রং বাদামী হলেও শিক্ষিত ভারতীয়রা নিজেদের শ্বেতাঙ্গ সমাজেরই অংশ মনে করে, অশ্বেতকায়দের ছোট চোখে দেখে। নীল বলেছিল ভারতে নাকি যাদের টাকাপয়সা ক্ষমতা আছে তাদের ‘সাহেব’ বলে ডাকা হয় আর কালো মেয়েদের বিয়ে হয় না।’ অ্যাঞ্জেলা একটু হাসলো।

বিয়ের ব্যাপারে বাদামী সাহেবদের জাতিবর্ণ বিচারের হিসেব আমার ভালোই জানা আছে। এ মেয়ে না জেনে সাপের গর্তে পা দিয়েছিল।

‘অনিন্দ্য প্রথম থেকেই আমাকে পছন্দ করেননি, লিপিকা আমার সঙ্গে ভালোই ব্যবহার করতেন কিন্তু ব্যাপারটা এতটা গভীরে যাবে সেটা বোধহয় উনিও আন্দাজ করতে পারেননি। ভদ্রমহিলার পুরো মানসিক জগৎটাই ছিল ছেলেকে ঘিরে। নীলের লাঞ্চবক্স থেকে ওঁর হাতে বানানো খাবারগুলো ভাগ করে খেতে খেতেই আমাদের বন্ধুত্বের শুরু। নীলও পাগলের মতো মা’কে ভালোবাসত, কিন্তু এই যুগের আমেরিকান টিনএজার হিসাবে মাঝে মাঝে ওরও যে নিজস্ব খানিকটা জায়গার দরকার, ওর পরিবারের কেউই সেটা বুঝতো না। পড়াশুনায় সত্যিই ভালো ছিল নীল, ক্যালিফোর্নিয়ার একটা নামকরা কলেজে ওর ভর্তি হবার কথা ছিল। আমিও ঠিক করেছিলাম ওর সঙ্গে যাবো, ওখানে একটা ছোটখাটো কাজের ব্যবস্থাও করে ফেলেছিলাম। আমাদের ঘনিষ্ঠতা যত বাড়তে লাগলো আমাদের সামাজিক অবস্থানের ফারাকটা ততই প্রকট হয়ে উঠলো। সাদা আমেরিকান পরিবারে ছেলের গার্লফ্রেন্ড হলে হয়ত এতটা সমস্যা হতো না, অনেক ভারতীয় পরিবারেই ওটা হয়ে থাকে, নীল বলতো ওটা নাকি গর্বের বিষয়। কিন্তু একজন মেক্সিকান সিঙ্গল মাদার। যে নাকি লোকের বাড়ি পরিষ্কার করে খায়, তাকে তোমাদের অতি সুশীল সমাজে মানিয়ে নেওয়া একটু শক্ত। ওর বাবার কাছে এটা ছিল খুবই অপমানজনক, সামাজিকভাবে কয়েক ধাপ নেমে যাওয়া। আমাদের গ্র্যাজুয়েশনের কয়েক মাস আগে বাবার সঙ্গে একটা প্রচণ্ড ঝগড়াঝাঁটি করে নীল রাগের মাথায় বাড়ি ছেড়ে এক বন্ধুর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে ওঠে। সেই বন্ধুটি আমাদের থেকে কয়েক বছরের বড়ো, ইতিমধ্যেই সে পাশ করে আর্মিতে যোগ দিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই তাকে দেশের বাইরে যেতে হলো এবং সেই অ্যাপার্টমেন্টে আমরা দুজনে একসাথে থাকতে শুরু করে দিলাম।’

ঘরের দরজায় কে যেন বারবার টোকা দিচ্ছে। বাইরে গিয়ে দেখি অফিসার উইলেট একগাদা কাগজপত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভদ্রলোককে বেশ বিচলিত মনে হলো।

‘ডক্টর এই পেশেন্টের অনেক ইতিহাস আছে। ভদ্রমহিলাকে দেখেই আমার চেনা চেনা লেগেছিল। কিন্তু মুখ চোখ ঢাকা থাকায় বুঝতে পারিনি। পাঁচ বছর আগে এই একই দিনে, ঠিক এই জায়গায় ওঁর একমাত্র ছেলে নীল পুলিশের গুলিতে মারা যায়। ছেলেটি খুব জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল, পুলিশ অফিসারের ধারণা হয় যে ও গাড়িটা চুরি করে পালাচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে ওকে বাইরে আসতে বলা হয়, ও আপত্তি করে, বচসা হয়, বোধহয় হাতাহাতিও হয়ে থাকবে, তারপর গুলি চলে। সেদিনও ব্লিজার্ড হচ্ছিল, ছেলেটিকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এই হাসপাতালেই নিয়ে আসা হয়। এই নিয়ে বিরাট গণ্ডগোল হয়ে গেছিল, পুলিশ ডিপার্টমেন্টের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছিল কিন্তু শেষ অবধি কারো শাস্তি হয়নি। আমি সেই মামলায় সাক্ষী ছিলাম। সবচেয়ে মজার কথা সেই অফিসার কে জানেন? রজার অ্যান্ড্রুজ, যার সাথে আজ সকালবেলা আপনার আলাপ হলো। আপনি মেয়েটিকে দেখুন আমি রজারকে ডেকে আনছি। এর মধ্যে উনি আবার কোথায় গেলেন কে জানে।’

যেমন ঝড়ের মতো এসেছিলেন তেমনই ঝড়ের মতো বেরিয়ে গেলেন অফিসার উইলেট। ঘরের মধ্য থেকে একটা চাপা অথচ তীক্ষ্ণ শীৎকার ভেসে এল। দরজা খুলে দেখি অ্যাঞ্জেলা মেঝের ওপর পড়ে আছে, অজ্ঞান, মুখ থেকে ফেনা বেরোচ্ছে, মৃগী রোগীদের যেমনটা হয়। এই ছোট হাসপাতালে মাত্র দুটোই আই-সি-ইউ বেড, এখন মেয়েটিকে লিপিকার সঙ্গে না রেখেও উপায় নেই।

মেয়েটাকে ওষুধপত্র দিয়ে বেডে শুইয়ে দিয়েছি। ঘর থেকে বেরোতে গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেলাম। কি যেন একটা কানে আসছে, আবার আসছেও না। ফিসফিসে গলায় যেন একটা কথাবার্তা চলছে অথচ কান পেতে শুনতে গেলেই মিলিয়ে যাচ্ছে চারদিকের মৃদু যান্ত্রিক গুঞ্জনের মধ্যে।

‘মা দেখো কে এসেছে।’

‘ওমা অ্যাঞ্জি। কতদিন বাদে তোদের একসাথে দেখলাম। আহা, যদি পাঁচ বছর আগে ফিরে যাওয়া যেত, আমি আর ওইরকম বোকামি করতাম না রে। তোদের জীবনের ঠিক-ভুল তোদেরই বুঝে নিতে দিতাম।’

‘মা তুমি জানতে চাও, সেদিন ব্লিজার্ডের মধ্যে রাত্রিবেলা আমি কোথায় গেছিলাম? অ্যাঞ্জিকে নিয়ে এসেছি, ওর কাছেই শুনে নাও।’

‘সেদিনটা ছিল এইরকমই শীতার্ত, বরফ আর কুয়াশায় মাখামাখি। আমাদের গ্র্যাজুয়েশন হয়ে গেছে, তোমার ভারতীয় বন্ধুদের বাড়িতে বাড়িতে ঝলমলে সব পার্টি, উচ্চাশা আর সাফল্যে টইটুম্বুর মানুষদের ভিড়, স্কচ আর শ্যাম্পেনের ফোয়ারা। তোমার বাড়িতে পার্টি হয়নি, তুমি গোঁ ধরে বসে আছো, আমি না এলে পার্টি হবে না, আমাকে মেনে না নিলেও তুমিও বাড়ি ফিরবে না। তুমুল ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে। এখন তুমি সোফার ওপর গোঁজ হয়ে বসে একটার পর একটা বিয়ার খেয়ে চলেছো।’

‘ও: নীলু সেই অভিশপ্ত দিনটা। তুই আর তোর বাবা কি বিশ্রীভাবে ঝগড়া করেছিলি। আমি শেষ অবধি বলেছিলাম, ঠিক আছে তোর গার্লফ্রেন্ডকে আনতে পারিস, কিন্তু কলেজে তোরা একসাথে থাকতে পারবি না, তোকে ভালো করে পড়াশুনা করতে হবে, মেডিক্যাল কলেজে ঢোকা এই দেশে সহজ নয়। যখন তুই তাতেও রাজি হলি না, তখন তোর বাবা হঠাৎ বলে উঠলো—এই আঠেরো বছরের প্রত্যেকটি সজাগ মুহূর্ত যাকে গড়ে তুলতে ব্যয় করেছি সে যদি একটা মেয়ের সঙ্গে বিছানায় শোবার জন্য নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে ফেলে, তেমন ছেলের মরা মুখ দেখাও ভালো। আঃ সেই মরা মুখই তো দেখতে হলো।’

‘নীল আমিও এখন বুঝতে পারি জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে কতটা নিরাপত্তাহীন করে তুলেছিল। আমি ভয় পেতাম, দূরে গেলেই বুঝি আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে, তুমি আরো উঁচুতে উঠে যাবে, ডাক্তার হবে, গরম রোদ্দুরে ভরা ক্যালিফোর্নিয়ায় সমুদ্রের ধারে তোমার বাংলো থাকবে। তখন তোমার নতুন সম্পর্ক হবে বাড়ির পছন্দমতো কোনো উঁচুদরের মহিলার সঙ্গে, আমি থেকে যাবো এই হাড় জমানো তুন্দ্রায়, নর্থ ডাকোটার ক্ষুদে শহরে। আসলে আমরা দুই মহিলাই সর্বস্ব দিয়ে তোমাকে বাঁধতে চেয়েছিলাম। মা’র কাছে তুমি পেতে শর্তহীন স্নেহ, অপরিমিত শুভকামনা, আবাল্য অভ্যাসের আরাম কিন্তু আমারও তো ছিল প্রথম ভালোবাসার বাঁধভাঙা আবেগ, শরীরের অমোঘ আকর্ষণ। মাঝখান থেকে দীর্ণ হচ্ছিলে তুমি। আমি হেরে যেতে চাইনি নীল। যখন দেখতাম তুমি পদে পদে মা’র অভাব বোধ করছো, বাবার প্রতি দায়বদ্ধতা তোমাকে যন্ত্রণা দিচ্ছে, আমি ভেতরে ভেতরে অসহায় বোধ করতাম। ভাবতাম আমি তোমাকে আর কি দিতে পারি যাতে তোমার মনের দাঁড়িপাল্লা পাকাপাকিভাবে আমার দিকে ঝোঁকে। সেইজন্যেই মাসতিনেক আগে চুপিচুপি বার্থ কন্ট্রোল পিল খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম।

‘অ্যাঞ্জি সেদিন আমি খুব কুন্ঠিতভাবেই বোঝাতে চেয়েছিলাম তোমাকে। বাবা-মা’র সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক শেষ দেওয়ার বদলে আমি চেয়েছিলাম আপাতত: একলা কলেজে চলে যেতে। আমার আশা ছিল একবার তোমার সঙ্গে ভালো করে পরিচয় হলে, ওঁরাও তোমাকে আস্তে আস্তে মেনে নেবেন, কলেজ শেষ করেই আমাদের এনগেজমেন্ট হবে।’

‘নীল সেদিনের ব্যবহার নিয়ে আমার লজ্জার শেষ নেই। তুমি আর আমাকে ওই দিনের কথা মনে করিয়ে দিওনা। এতবড়ো একটা দায়িত্ব না থাকলে হয়ত আমি বেঁচে থাকতেই চাইতাম না। দেখো পাঁচ বছর হয়ে গেল এখনও আমি সেদিনের ভার বয়ে চলেছি।’

‘জানি অ্যাঞ্জি। মাকে বলেছি, তোমাকেও বলছি, যে মৃত একমাত্র সেই সর্বজ্ঞ। আমাকে বিশ্বাস করানোর জন্য মুখ ফুটে কিছু বলা দরকারী নয়।’

‘আমি খুব নাটকীয়ভাবে আমার প্রেগনেন্সি টেস্টের রিপোর্টটা তোমার মুখের ওপর ছুঁড়ে ফেলেছিলাম। বলেছিলাম আমার মায়ের মতো আমিও তোমার সন্তানকে একাই মানুষ করতে পারবো। তোমার রেসিস্ট, সুবিধাবাদী, ভণ্ড, তোমাদের সঙ্গে আমাদের কোনদিন মিল হবে না। তুমি বরং সারাজীবন মায়ের কোলেই থেকে যাও, শুধু মায়ের সঙ্গে একটা কাজ হওয়া সম্ভব নয় বলেই তো একজন বৌ দরকার, তার ব্যবস্থাও ওরাই করে দেবে এখন। তারপরে ওই ঝড়ের মধ্যেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেছিলাম সোজা হাইওয়ে দিয়ে শহরের অন্যপ্রান্তে যেদিকে আমার নিজের মায়ের অ্যাপার্টমেন্ট।’

‘এই যুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না। শুধু ক্ষতস্থান গোপন করে কাটাতে হয় সারা জীবন।’

‘জানি নীল। বাড়ি গিয়েই আমার হুঁশ হয়েছিল। হায় ভগবান, আমি কি শেষ অবধি ব্ল্যাকমেল করে জিততে চাইছি! ভাবলাম তোমাকে ফোন করে বলি যে আমি ফিরে আসছি, চিন্তা কোরো না, আলাদা থাকতে আমার আপত্তি নেই। মাত্র তিন সপ্তাহের প্রেগনেন্সি, দরকার হলে অ্যাবোর্ট করে দেবো। তুমি ফোন ধরেই রেখে দিলে আমি শুধু একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর আর কোনো খবর নেই। জানলার বাইরেটা তখন মৃতদেহ চাপা দেওয়া চাদরের মতো সাদা, চারদিকে ইস্পাতের ছুরির থেকেও শীতল, ভয়ঙ্কর হাওয়া শনশন করে বয়ে চলেছে।

‘আমি বন্ধুর গাড়িটা নিয়ে তোমায় খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। তাই পুলিশ যখন আমাকে দাঁড় করালো আমার নামের সঙ্গে গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের নাম মিললো না, ও আমাকে গ্রেফতার করতে চাইলো। আমি অফিসারটিকে সব খুলে বললাম, কিন্তু ওর বদ্ধ ধারণা যে এই কালো চামড়ার ছেলেটা গাড়ি চুরি করে পালাচ্ছে। আসলে স্যুট টাই পরা না থাকলে ওরা বাদামী রঙের শেডগুলো ঠিক ধরতে পারে না। হুড লাগানো সোয়েটশার্ট পরে আমাকে অবিকল ওই ঘেটোর কালো ছেলেগুলোর মতই দেখাচ্ছিল বোধহয়। তখনই তোমার ফোনটা এলো, আমি জামার মধ্যে হাত ঢুকিয়েছি কি পুলিশটি দুম করে পিস্তল বার করে ফেলল। ও হয়ত ভেবেছিল আমিও ছোরাছুরি কিছু বার করছি। তারপর গুলিটা কখন বেরিয়ে গেল কে জানে। এদেশের আইন কি বলে জানো তো—পুলিশ যদি সংগত কারণে বিশ্বাস করে যে তার ওপর হামলা হবার আশংকা আছে তাহলে সে গুলি চালাতে পারে। এবার কারণটা সংগত না অসংগত সেসব তো পরে ঠাণ্ডামাথায় বিচার হবে, আপাতত: যে গুলি খেলো সে তো খেলোই। পুলিশে-প্রসিকিউটরে মাসতুতো ভাই, জুরিও কালাদের পছন্দ করে না তাই এ ধরনের কেসে পুলিশ শাস্তি পেয়েছে এরকম দৃষ্টান্ত প্রায় নেই। প্রায় প্রতি মাসে আমেরিকায় এরকম একটা-দুটো কাণ্ড হয়ে থাকে, মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি কিছু হলে কয়েকদিন ট্যুইটারে হইচই, মোমবাতি নিয়ে প্রতিবাদ, ইত্যাদি হয় তারপর আবার যেমনকে তেমন। সে যাকগে, গত পাঁচ বছর তোমরা দুজনেই যেরকম বিদঘুটে অপরাধবোধ নিয়ে দিন কাটিয়েছো, তাতে আমারও বেজায় অসুবিধা হচ্ছে। তার ওপর যেখন দেখলাম মা’র মাথাটা একেবারে খারাপ হতে বসেছে তখন আর উপায় থাকলো না। আমাদেরও কড়া নিয়ম আছে, জ্যান্ত মানুষদের কারবারে মাথা না গলানো তবে কিনা মাঝে মাঝে ছাড় মিলেও যায়। অ্যাঞ্জি, আর দেরি কোরো না, পাশের ঘরে আমাদের ছেলেটা কাঁদছে, ওকে ঠাকুমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দাও। ওর মুখের দিকে তাকালেই মা’র মাথার ব্যামো সেরে যাবে। বাবাও বোধহয় এতক্ষন এয়ারপোর্টে এসে আটকে রয়েছে, কয়েক ঘন্টার মধ্যেই হাজির হলো বলে। তোমরা এবার আই-সি-ইউ থেকে বেরোও দেখি, অন্য রোগীদের চিকিৎসা করতে হবে। ডাক্তারবাবুকে আমার হয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে দিও।’

আই-সি-ইউর নিস্তব্ধতা ফাটিয়ে দিয়ে পরপর দুটো গুলির আওয়াজ শোনা গেল। আমি ঢুলতে ঢুলতে চমকে জেগে উঠলাম। আমার সামনে লিপিকা আর অ্যাঞ্জেলা দুজনেই দিব্যি উঠে বসে চোখ কচলাচ্ছেন।

‘ডক্টর সেন আপনি পুরো দুদিন ধরে অনেক ঝামেলা সামলেছেন, এবার আপনার ছুটি।’

এখন আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ব্লিজার্ডের হাওয়া বইছে, শূন্যের তলায় মাত্র বাইশ ডিগ্রি। পার্কিং লটে আমি হতবুদ্ধির মতন দাঁড়িয়ে আছি, সামনে পাঁচটা পুলিশের গাড়ি, স্ট্রেচার, লোকজনের ছোটাছুটি, এই ঠাণ্ডার মধ্যে টেলিভিশনের লোক অবধি চলে এসেছে। রোমহর্ষক ব্যাপার সন্দেহ নেই, বরফ পরিষ্কার করার যে বুলডোজারের মতো পেল্লায় যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, তার তলায় দুজন লোক চাপা পড়েছে। ড্রাইভারের বক্তব্য লোকদুটো সামনের উঁচু বারান্দার রেলিং টপকে তার গাড়ির সামনে লাফিয়ে পড়েছিল। পার্কিং লটের ক্যামেরাও তাই বলছে। অবাক কাণ্ড এই যে লোকদুটো পাগল, মাতাল জাতীয় নয়, রীতিমতো ইউনিফর্মধারী পুলিশ অফিসার। ভিডিও ক্যামেরায় দেখে মনে হচ্ছে ওরা যেন কাউকে তাড়া করেছিল, দুজনেরই পিস্তল খাপের বাইরে। কিন্তু তন্ন তন্ন করে দেখেও ওখানে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির খোঁজ পাওয়া যায়নি।

আমি ভালো করে ভাবতে পারছি না, মাথার মধ্যেটা যেন বিলকুল ফাঁকা হয়ে গেছে। এক্ষুনি হ্যান্ড-ওভার দিয়ে এলাম, আই-সি-ইউ’র ওই দুটো বেডে এখন অফিসার উইলেট আর অ্যান্ড্রুজ পাশাপাশি শুয়ে আছেন, দুজনেরই ঘাড় ভেঙে গেছে, প্রাণে বাঁচলেও কোয়াড্রিপ্লেজিয়া অর্থাৎ কিনা হাতে পায়ে পক্ষাঘাত কেউ ঠেকাতে পারবে না।

আপনি এখন নতুন পাওয়া নাতি কোলে নিয়ে লাউঞ্জের চেয়ারে বসে গল্প করছেন। আপনার দুপাশে অনিন্দ্যবাবু আর অ্যাঞ্জেলা, তিনজনের মুখেই হাসি ধরছে না। আপনাদের মধ্যে কখনো যে কিছু ঝগড়াঝাঁটি ছিল, কার বাবার সাধ্য তা আন্দাজ করে। ছেলেটির মুখচোখে কলকাতার গল্প লেখা, হাসিটা অনিন্দ্যবাবুর মতন, চোখগুলোয় নাকি একেবারে নীলুর চোখ বসানো। কাল রাত্তিরের ভৌতিক চিকিৎসার কথা আপনাদের আদৌ মনে আছে কিনা জানি না কিন্তু দেখাই যাচ্ছে তাতে কাজ হয়েছে মোক্ষম। সে যাই হোক আপনারা সুখে থাকুন, আমার এবার বাড়ি ফেরার পালা।

শহর থেকে বেরোবার সময় অ্যাক্সিডেন্টের জায়গাটায় এক মিনিটের জন্য গাড়ি থামালাম। রোদ্দুরে জ্বলজ্বল করছে দিগন্তজোড়া এক রূপোলি ক্যানভাস, তার ওপরে পাইনবনের আলপনা। রাস্তার একপাশে কে যেন রেখে গেছে রক্তলাল এক তাজা গোলাপের গুচ্ছ।



(পরবাস-৬২, মার্চ - এপ্রিল, ২০১৬)