Parabaas Moviestore




Parabaas Moviestore




Subscribe to Magazines



পরবাসে ভবভূতি ভট্টাচার্যের লেখা






শ্বেতা অম্বালা

ড় কড় কড় কড় শব্দে প্রচণ্ড বজ্রপাতের সঙ্গে সঙ্গে ফের তুমুল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

মধ্য-জুলাইয়ে মুম্বাই নগরীতে এ’হেন বৃষ্টিপাত কোনো ব্যতিক্রম নয় যদিও, সপ্তাহের আজ প্রথম কাজের দিনেই ভোর থেকে শুরু হয়ে গেছে প্রবল বারিপাত। এখন এই সকাল এগারোটায় আকাশের মুখ ভার সন্ধে ছ’টার মতো।

হাতের প্ল্যাস্টিকের ফোল্ডারটি মাথায় ধরে কোনোক্রমে না-ভেজার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে দৌড়ে বড় রাস্তাটা পেরিয়ে বিশাল হেন্ডারসন-ম্যানশনের গেটে এসে ঢুকে পড়ল শ্বেতা। এই বৃষ্টিতে অনেকেই চাতালটায় এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের ভিড় ঠেলে মস্ত হলঘরটিতে ঢুকলো। তার ব্যাঙ্কেই কাজ, আর তাই সেই আটটা দশের লোকালটা ধরে বীরার থেকে আসছে মেয়েটি। ইতিউতি তাকালো শ্বেতা এদিক-ওদিক। এতো কাউন্টারের মধ্যে কোনটিতে ঠোকরানো উচিত? শেষে ‘মে আই হেল্প ইয়ু?’ দেখে সেদিকের ভিড়েই এগিয়ে যায়।

প্রাচীন কলোনিয়াল ছাঁদের অট্টালিকা শহরের এই ফোর্ট অঞ্চলেই এখনও গুটিকয় বেঁচে আছে। তেমনই এক শতাব্দীপ্রাচীন বাড়িতে এ’টি ব্যাঙ্কের প্রধান শাখা মুম্বাই শহরে। ‘হেল্প ইয়ু’-কাউন্টারে গ্রাহকের ভিড় মন্দ নয় এই বৃষ্টির দিনেও। শ্বেতার টার্ন আসতে কাউন্টারের দিদিমণি পাশবই আর দরখাস্তটিও একবার কম্প্যুটর দেখে চোস্ত মারাঠিতে, “তিনবছর আগে বাবা মারা গেছেন আর আজ এসেছেন টাকা ক্লেইম করতে? সেকেন্ড ফ্লোর।” বলে ছুঁড়ে ফেরত দিলেন পাশবইটই। “আমি আসলে এখানে ...” মেয়েটিকে আর বেশি কিছু বলতে না দিয়ে পিছনের ভদ্রলোকের দিকে তাকান দিদিমণি আর তিনিও কনুই-ঠেলে এগিয়ে এলেন।

লাইন থেকে বেরিয়ে আরো দিশেহারা লাগে শ্বেতার, বড়ো অসহায়। আজকাল তার বারবার মনে হতে শুরু করেছে যে মাত্তর একটা টিভি কনটেস্টের ফার্স্ট প্রাইজ হাতিয়ার করে বম্বের মতো প্রবল প্রতিযোগিতার বাজারে গাইয়ে হতে আসা উচিত হয়নি। না তার আর্থিক সঙ্গতি আছে, না কোনো মামা-দাদা-চাচা। বাবার একাউন্টে পড়ে থাকা এ’ টাকা-ক’টা পাওয়া গেলে এখন বড়ো কাজে আসবে। এবার সেকেন্ড ফ্লোরে কার কাছে যাবে সে? সিঁড়িটা কোন্‌ দিকে? এ’দিক ও’দিক তাকাতে তাকাতে হলের কোণে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধের দিকে হঠাৎ নজর গেল। মাথায় কালো ফেজ, শেরওয়ানি-চোস্ত-ভেস্টকোট পরা বৃদ্ধ তারই দিকে সরাসরি তাকিয়ে যেন মুচকি মুচকি হাসছেন। একবার পিছনের দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো শ্বেতা, অন্য কারোকে দেখে নয় তো? না, সে-ই লক্ষ্য। এবার তাঁর দিকে গুটি গুটি এগিয়ে যায়, শুধোতে। বৃদ্ধ কিন্ত পিছনের দরোজার দিকে ইতোমধ্যেই হাঁটতে লেগেছেন, ইঙ্গিতে যেন তাকে অনুসরণ করার বার্তা দিয়ে। অতএব শ্বেতাও কী ভেবে তাঁর পিছু পিছু বড় হলটি ছেড়ে পিছনের চত্বরে বেরিয়ে এলো। প্রাচীন অট্টালিকার ভিতরে আদ্যিকালের লোহার খাঁচায় ভরা লিফট। সেই মুহূর্তে অনেকেই হুড়হুড় করে উঠছে লিফটটায়। শ্বেতাও উঠে পড়ল। আবার কড়কড়াৎ করে এক মস্ত বাজ পড়ল আর লিফটটা দুলতে দুলতে উঠতে লাগল ঊর্ধ্বপানে।


***

তিনতলায় নেমেই মনে হল, আরে, কৈ সেই বুজুর্গ ব্যক্তিটি তো নামলেন না এ’তলায়? লিফট তো ঐ ফের উঠতে লেগেছে। পরক্ষণেই ভাবলো শ্বেতা, থোড়িই উনি তার পথপ্রদর্শক। তাকে তো তিনতলায় আসতেই হত। ঐ বৃদ্ধকে ফলো করাটা কাকতালীয়, হয়তো তার অনুমান।

এ’তলায় আরও যে দু’তিনজন নেমেছিল তারা ডাইনে-বাঁয়ের করিডর বেয়ে এ’দিক-ও’দিক চলে গেল। একা দাঁড়িয়ে শ্বেতা। কাকে শুধোয় এবার ? কোন্‌দিকে ব্যাঙ্কের ক্লেইম-সেকশন? ডাইনে এবং বামে দীর্ঘ করিডরে মস্ত মস্ত কাঠের দরোজায় নানান কোম্পানির নেমপ্লেট সাঁটা। কোন্‌দিক দিয়ে শুরু করা উচিত? হঠাৎ বাঁয়ে দূরে শেষপ্রান্তের দিকে এক দরজায় যেন ব্যাঙ্কের লোগোটা দেখতে পেয়ে সেদিকেই হাঁটা লাগালো শ্বেতা।


***

একটা দু’টো তিনটে দরোজা পেরিয়েছে। রুম নাম্বার টু-এ টু-বি টু-সি ...। চতুর্থ দরোজাটি আধখোলা। টু-ডি। কিন্তু এ’দরোজার পিতল-পট্টিতে তো ‘প্যারামাউন্ট ফিল্ম কোং’ লেখা! সম্বিৎ ফিরলো খোনা গলায় এক "গুডমর্নিং ম্যাডামজী" শুনে। খাকি পরিহিত এ’ফ্ল্যাটের দ্বারবান খটাক্‌ স্যালুট ঠুকছে তাকে, “ওয়েলকাম, ওয়েলকাম, ম্যাডাম!” হকচকিয়ে গেলেন কুমারী শ্বেতা ঘোষাল, বিগত ছ’মাস ধরে দরোজায় দরোজায় ওয়েলকাম নয়, গলাধাক্কা খেতেই যিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন এই মুম্বাই নগরীতে এসে থেকে। তাকেই বলছে? শুধোতে প্রত্যুত্তর, “আপকো কৌন নহি জানতা, ম্যাডাম?” অবাক ও মজা মিলিয়ে, 'দ্যাখাই যাক্‌ না কী হয়’-ভেবে সেই টু-ডি ফ্ল্যাটটির ভিতরে ঢুকে পড়ল শ্বেতা। আর্দালিটি এক সুপ্রশস্ত অফিসঘরে নিয়ে এসে বসালো তাকে, “দো মিনট বৈঠিয়ে হজৌর, সা’ব আভ্‌ভি আতে হি হোঙ্গে।”

এখানে সময় যেন পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেই থমকে রয়েছে। মোটা মোটা সেকালের সেগুন কাঠের ভারি চেয়ার-সোফা-সেক্রেটারিয়েট টেবিল দিয়ে পুরনো ধাঁচে সাজানো পেল্লায় ঘরখানি। টেবিলে আদ্যিকালের কালো ভারি টেলিফোন, ডায়ালের ঘরে নাম্বারও নেই সেটায়। মাথার উপর এক হাঁড়িফ্যান ঘুরে চলেছে ধীরলয়ে। দিনের বেলায়ও আলো জ্বলছে। পাশের কোনো ঘর থেকে ভেসে আসছে সেই চল্লিশের দশকের হিট গানা, “আঁখিয়াঁ মিলাকে পিয়া ভরমাকে চলে নহী যানা ...।” না, চলে কে যাবে? চলে যাবে বলে তো আর দরোজা ঠেলে ঢোকেনি এ’ঘরে শ্বেতা। ঢুকেছে মজাটা কী হয় দেখতে। কার সঙ্গে এরা গুলিয়ে ফেলেছে তাকে?

চারিদিকে দেওয়ালে পুরনো পুরনো অয়েল পেন্টিং, নানা মানুষজনের ছবি। পরপর দেখতে দেখতে একজনের ছবিতে চোখ আটকে গেল শ্বেতার। এক বৃদ্ধের তৈলচিত্র, মৃদুমন্দ হাসিহাসি মুখ, মাথায় কালো ফেজ টুপি ... এক পশ্চিমা মুসলমানের ছবি। কোথায় যেন দেখেছে এনাকে, কোথায় যেন ... ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকে উঠলো মনে। আরে, ইনিই তো সেই বৃদ্ধ যিনি এইমাত্র পথ দেখিয়ে তাঁকে তিনতলায় নিয়ে এসে ছেড়ে দিয়ে গেলেন! আশ্চর্য! নিজেই নিজের ঘরে এতো বড়ো তৈলচিত্র টাঙিয়ে রেখে দিয়েছেন? নাঃ, এটা হয়তো এনার পিতৃদেবের।

এই ভাবতে ভাবতে ক্যাঁচ করে পাশের মস্ত দরোজাখানি খুলে গেল ও “আস্‌সালাম আলেইকুম ... আস্‌সালাম আলেইকুম” বলতে বলতে ডানহাত বার বার ঝোঁকানো কপালে ঠেকাতে ঠেকাতে ঘরে এসে ঢুকলেন সেই বৃদ্ধ, বা তাঁর কোনো জড়ুয়া ভাই! অবাক চোখে তাকিয়ে শ্বেতা প্রত্যাভিবাদন ভুলে গেল, মিনিট খানেক পরে, “আলেইকুমাসসা ... ”

যেন বহুকালের পরিচিত এমন সহজ গলায়, “এবার বম্বে আসতে কোনো অসুবিধে হয়নি তো? আম্বালা থেকে এলেন কি ফ্রন্টিয়র মেইলে? ট্রেন ঠিক টাইমে ছিল?' শুধোন বৃদ্ধ।

কী উত্তর দেবে? এরা কার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছে শ্বেতাকে? দ্বিধা কাটিয়ে স্মার্টলি জবাব দিলো শ্বেতা, “আমি কালকের ভোরের জেট এয়ারওয়েজে এসেছি। টাইমে ছিল।”

“জেট এয়ারওয়েজে?!” এমন অবাক চোখে তাকালেন উনি যেন নামটা এই প্রথম শুনছেন। সেটা এক লহমার জন্যে মাত্র, পরমুহূর্তেই তুখোড় ব্যবসায়ীর ঢঙে সামলে নিয়ে সহর্ষ ঘোষণা, “আজ তাহলে কন্ট্রাক্ট সহি-সাবুদ হয়ে যাবে। নিশ্চয়ই শুনেছেন, এবার গুলাম মুহাম্মদ সাহাব মিউজিক করছেন আমাদের ফিল্মের। শুনবেন এখন পাক্কা রাজপুতানী নাল আর ঢোলক আর রাবণহাট্টার সুর।”

“কেন? নৌশাদ সাহেব?”

শুধিয়ে ফেলেই এমন চমকে উঠলো শ্বেতা যে উনি কী জবাব দিলেন কানেই গেল না সেটা। এটা কী বললো শ্বেতা? কে বললো? কেন বললো?

টুংটাং টুংটাং করে মনের মধ্যে নয়, ঘরের কোণে দাঁড় করানো ক্লকটি বেজে উঠলো, একবার ঢং করেই থেমে গেলো। সাড়ে বারোটা। ঠিক দুটোয় কোলাবা কজওয়ের ব্যারিস্টায় অমিত আসবে। যথেষ্ট সময় আছে। ফেসবুকে স্টেটাস আপডেট করে দেওয়া যাক। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করতে গিয়ে ভয়ংকর চমকে উঠলো শ্বেতা। নেই। নেই মোবাইলটা। ইন ফ্যাক্ট, পকেটটাই নেই জিনসের। জিনস তো নয়, তবে আজ কি শালোয়ার-কুর্তা পরে বেরিয়েছিল নাকি সকালে? হঠাৎ বড্ড ভয় ও অসহায়তা চেপে ধরলো মেয়েটিকে। এ’কোথায় এসে পড়লাম? কোনো জোচ্চরের আড্ডায় কি? এ’সব কী ঘটে চলেছে? কী সব বলছে সে? তার মুখ দেখে ঐ বৃদ্ধ কিছু অনুমান করে থাকবেন, সসম্ভ্রমে শুধোন, “বাঈ, আপনি কিছু খুঁজছেন?”

“হ্যাঁ ... মানে আমার মোবাইলটা ...”

“জী?” যেন ‘বেগ ইয়োর পার্ডন' বললেন ভদ্রলোক।

“না, মানে আমার মোবাইল ফোনটা পকেটেই ছিল ... পাচ্ছি না ... কোথায় যে গেল।”

“মোবাইল ফোন ... পকেটে ... মানে? বুঝলাম না ...”

ভদ্রলোকের অবাক মুখ থেকে দৃষ্টিটা ঘুরে গেল ... সেই মুহূর্তে আর্দালিটি ট্রে ভরে টিপট কাপ-প্লেট এনে ফেলেছে ভাগ্যিস। চমৎকার দার্জিলিং। চুমুক দিতে জুড়িয়ে গেল প্রাণটা।

“হ্যাঁ, হ্যাপিভ্যালি ...” হেসে বললেন উনি। “জানেন তো, ম্যাডামেরও এ-ওয়ান দার্জিলিং ছাড়া চলে না।”

“আছেন ও’ঘরে?” শুধোয়।

“হ্যাঁ। আপনি আজ আসবেন জেনে সকাল থেকে উন্মুখ ... হোক্‌ দু’কলি ...”

‘ইনসাল্লা” চায়ের কাপ রাখতে রাখতে সুর গুনগুনিয়ে উঠল জাত-গায়িকার মনের কোণায় ... আজ এই ভরা বরোষায় আর কী গানই বা গাওয়া যায়?

“রুমঝুম বরষেঁ বাদরআঁ
মস্ত হাওয়ায়েঁ আয়ি
পিয়া ঘর আ জা ...”
কী গীতই লিখেছেন মাধোক-সাহেব!

দু’বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খালি গলায় গানটি গেয়ে ভরে উঠলো প্রাণটা। শুরুতেই ভদ্রলোক উঠে পাশের ঘরের দরোজাটা সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে এসেছেন। মস্ত পালঙ্কে শুয়ে আছেন পক্ককেশ এক বৃদ্ধা। বাতব্যাধিতে পঙ্গু। নামতে পারেন না আজকাল শয্যা থেকে। গান গাইতে গাইতে শ্বেতা নির্দ্বিধায় পাশের ঘরে ঢুকে ওনার পায়ের কাছে দাঁড়িয়েছিল। এখন চাদরে ঢাকা দু’পায়ে করস্পর্শ করে কদমবুসি করল।

“বহোত অচ্ছা গায়ে হো বেটি, বহোত অচ্ছা। এ’হল আগ্রাঘরের চীজ। বহোত সম্ভালকে রাখনা ...” মৃদুস্বরে বলতে বলতে হাত তুলে আশীর্বাদ করেন উনি।

“না মা, কী আর এমন গেয়েছি আমি? আপনি এমনি এমনি বলছেন।” বিনয়ের সুরে প্রত্যুত্তর।

“না বেটি, এমন বলতে নেই। কেউ তোমার গানের তারিফ করলে সর্বদা বলবে এ’ আল্লাহ্‌তলার করুণা, তাঁরই দোয়া ...।” এবার শ্বেতা ঘুরে গিয়ে দাঁড়ালো ওনার পাশটিতে। ডানহাতখানি স্বল্প ছুঁইয়ে দিলেন উনি তার শিরে। কী বিদ্যুৎ খেলে গেল শ্বেতার সারা শরীর বেয়ে, শিরদাঁড়া কাঁপিয়ে। যেন কোথায় হারিয়ে গেল, বদলে গেল বাইশ বছরের তরুণীটি। নবজন্ম হল তার।

বাইরে আবার একটা ভয়ঙ্কর শব্দের বাজ পড়ল। ভিতরে এ’ঘর থেকে তার সামান্যই কানে ধরা পড়ে।

গুটি গুটি পায়ে এবার বৈঠকখানায় ফিরে এলো পিছু হেঁটে ... ওনার দিকে পশ্চাদ্দেশ দেখানোর গুস্তাকি না করে। ঘরের দরোজাটা বন্ধ হয়ে গেল আপনা থেকেই। সেই বৃদ্ধ কোথায় গেলেন? সে চিন্তা ছেড়ে কেমন এক ঘোরের মধ্যে অন্যপাশের চেয়ারটিতে এবার এসে বসতে সামনের দেওয়ালে সাঁটা অনেক সাদাকালো ফোটোর দিকে চোখ গেল। পুরনোকালের সিনেমার ছবি সব। একটা তো বাঙলা ছবির। চেনা। সত্যজিৎ রায়ের ‘জলসাঘর’ ... সেই যে নৃত্যশেষে রোশনকুমারী হাত তুলে অদাব করছেন!

কড় কড় করে ফের মস্ত এক বাজ পড়ল, ক্ষীণ শব্দ তার এ’কক্ষেও। হঠাৎ দু’বার কেঁপে উঠে এ’ঘরের হলদে বাল্বখানির তেজ কমতে কমতে একদম নিভে গেল। কিন্তু সব ভয়ডর যেন কেটে গেছে সে কন্যের ... সে তখন মস্ত আনন্দে গেয়ে চলেছে একা একাই, “... ফির যায়েঙ্গে বহ্‌ উধর সে ... শায়দ বহ্‌ যা রহে হৈ ছুপকর মেরী নজর সে ...।” জানি, তার তো আসবারই ছিল, সে এসেছে ... দেখো, যেন আমার নজর এড়িয়ে ফের চলে না যায় ...


***

এর পাঁচদিন পরে উঠতি গায়িকা শ্বেতা ঘোষালের নিখোঁজ-মামলায় কোলাবা-পুলিশ যখন হেন্ডারসন-ম্যানশনের টু-ডি ফ্ল্যাটে আসে ঝকঝকে তকতকে সাজানো তখন ফ্ল্যাটখানি আধুনিক আসবাবে। গৃহস্বামীর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে সেকেন্ড অফিসার নবীন দত্ত মস্ত এলসিডি টিভিটায় চোখ রেখে সিপ্‌ করছেন নাম্বার ওয়ান দার্জিলিং টি! একটা পুরনোদিনের গানের কুইজের অনুষ্ঠান চালানো রয়েছে। এই রাউন্ডটার থিম সেকালের হার্টথ্রব গায়িকা জোহরাবাঈ অম্বালেওয়ালী ... নিকনেমে ‘জোহ্‌রা অম্বালা’।

প্রশ্নঃ জোহ্‌রা অম্বালার কন্যা ছিলেন এক নামী নর্তকী। কী নাম ছিল তাঁর?

উত্তরটা কুইজমাস্টারকেই দিয়ে দিতে হল, “রোশনকুমারী!”

শেষের প্রশ্নটা সত্যিই কঠিন ছিল। কুইজ মাস্টার এর উত্তরটাও দিয়ে দিলেনঃ
---‘জোহ্‌রা’ শব্দের মানে কী?

---শাদা ... ধবধবে উজ্জ্বল শ্বেতবর্ণা!


এই গল্পের অনুপ্রেরণা জোহ্‌রা অম্বালার (১৯১৮-৯০) কণ্ঠের তাসীর ঠিক কেমন ছিল ভাষায় তা প্রকাশ করা যায় না। আজকের দিনে সুবিধে হয়েছে ইউ-টিউবে এইসব পুরনো গান অনায়াসে শুনতে পাওয়ার। আগ্রহী পাঠকের সুবিধার জন্যে গানগুলির ইউ-টিউবের আন্তর্যোগ দিয়ে দেওয়া হোলঃ “আঁখিয়াঁ মিলাকে পিয়া ভরমাকে চলে নহিঁ যানা ...”, “রুমঝুম বরষেঁ বাদরআঁ ...”, ও “ফির যায়েঙ্গে বহ্‌ উধর সে ...”



(পরবাস-৬২, মার্চ - এপ্রিল, ২০১৬)