ছত্তিশগড়ের চালচিত্র


|| "কেউ কিছু দেখেনি" ||

।। ১ ।।

কাঠঘোরা থানার থানেদার বা স্টেশন অফিসার অজয় ডোঙ্গরের মেজাজটা সকাল থেকেই খিঁচড়ে আছে। আজ ছাব্বিশে জানুয়ারি, রিপাব্‌লিক ডে, সরকারি হিন্দিতে গণতন্ত্র দিবস। কোথায় সকাল আটটা নাগাদ থানায় ঝাণ্ডা তুলে জিলিপি-সামোসা পেঁদিয়ে খাতায় রওয়ানগি লিখে ছুরি গাঁয়ে গিয়ে স্কুলের বিচিত্রানুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথির ভূমিকাটি উতরে দিয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলা, তা না—এক উটকো আপদ জুটেছে। ছুরি গাঁয়েতেই কাল একটা খুন হয়েছে।

থানেদারের কি দোষ! মাত্র গত বছর পুলিশের চাকরিতে যোগ দিয়েছে। কয়েক মাস শিক্ষানবিশীর পর প্রত্যন্ত এলাকায় একটা থানায় কিছুদিন ছোটবাবু, তারপর এই কোরবা জেলার আদিবাসী ব্লকে তহসীল বা মহকুমা স্তরের থানার পুরোদস্তুর দায়িত্ব। এখানে পয়সা আছে। কাছেই কয়লা পাওয়া গেছে। ওপেন কাস্ট মাইনিং শুরু হচ্ছে। আর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে গোপালপুর বারুদ ফ্যাক্টরি—নাইট্রোগ্লিসারিন তৈরি হয়। সেখানে আবার এন টি পি সি'র থার্মাল পাওয়ার স্টেশনের স্টাফেদের জন্যে কোয়ার্টার তৈরি হবে, সার্ভে চলছে।

এইসব কর্মকাণ্ডের একটাই মানে। সমানে বাইরের লোক আসবে। বিশেষ করে বিহার বর্ডার থেকে। অন্তররাজ্য ক্রিমিনাল গ্যাংগুলো আস্তানা গাড়বে। সংগঠিত অপরাধের সংখ্যা বেড়ে যাবে। তার সংগে পাল্লা দিয়ে বাড়বে থানেদারের কামাই। বছর-তিন পরে নীলামে এই থানার রেট বাড়বে। তখন অন্য কেউ বেশি দাম দিয়ে এই থানায় পোস্টিং পাবে, অজয়কে যেতে হবে আরো পিছিয়ে পড়া কোনো থানায়। সে যখন হবে, তখন হবে। আপাতত: তিন বছর কিছু তো কামিয়ে নেওয়া যাবে।

ঘটনাচক্রে ছুরির গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার গঙ্গারাম ওর চেনা, একসঙ্গে কলেজে পড়ত, বিয়েশাদি হয় নি। ওর জন্যেই আজ স্কুলের ছাত্র বনাম সরকারি কর্মচারির প্রীতিম্যাচে ওকে অনুরোধ করা হয়েছে উইকেট কীপিং করার জন্যে। ব্যাংক ম্যানেজার গঙ্গারাম সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে যে নতুন থানেদার সাহেব দুর্গ গরমেন্ট কলেজের হয়ে টুর্নামেন্টে নিয়মিত কীপিং করত। ম্যাচের পরে গঙ্গারামের স্টাফ মেসে স্ট্যাগ পার্টি--দেশি মুর্গার রোস্ট ইত্যাদি।

অজয় কাল বিকেলে একটু প্র্যাকটিস করেছিল। শরীরের আড় ভাঙছিল। কিন্তু সকালে মোটর সাইকেল করে হাজির ব্যাটা ভ্যাবাগঙ্গারাম!—যা তা ব্যাপার! কাল বিলাসপুরের হেড অফিসের মিটিং সেরে অনেক রাত্তিরে ফিরেছি। সক্কালে ব্যাংকের চাপরাশি জানাল যে গতকাল সন্ধেয় কে বা কারা সুদখোর আজিজ পালোয়ানকে বীভৎস ভাবে খুন করেছে। কে করেছে কেউ নাকি জানে না। সবার মুখে কুলুপ আঁটা। সরপঞ্চের সঙ্গে কথা বলে জানলাম যে সন্দেহের বশে লুচুকদাসকে ধরে এনে বেওয়ারিশ গরুমোষ রাখার ঘর বা কাঞ্জি হাউসে বেঁধে রাখা হয়েছে, আপনি বল্লে কোতোয়ালের দল এখানে ওকে হাজির করবে। কলেজের বন্ধু হলেও গঙ্গারাম অজয় ডোঙ্গরেকে আপনি করেই বলে। ডোঙ্গরে মানে জাতে হরিজন, কোন কথায় ইগো হার্ট হবে কে বলতে পারে! থানেদার বলে কথা।

ওরা দুজন থানার আঙিনায় মিঠে রোদ্দুরে চেয়ারে বসে কাঁচের গ্লাসে গরম চা খাচ্ছে এমন সময় তিন কোতোয়াল হাজির। তিনটেরই পরনে রেলের খালাসীদের মত নেভি ব্লু হাফ প্যান্ট, আর শার্ট; তবে কোমরে চওড়া বকলেস লাগানো বেল্ট, আর মাথায় একই রঙের টুপি।

তিন জনে এসে সার বেঁধে দাঁড়ায়, স্যালুট মারে, ঠিক যেন কোনো কমিক স্ট্রিপের ক্যারেক্টার।

—কি ব্যাপার? তিনমূর্তি একসাথে?
—হুজৌর! রিপোর্ট করনা হ্যায়, খুন!
—তো তিনজনে কেন এসেছো? তোমাদের তো বডির পাশে থাকার কথা?
—সরকার! আসামীকো লানা থা, বহুত খতরনাক আসামী, খুনী! ইসীলিয়ে--।
—কোথায় সেই খতরনাক আসামী?

তিনমূর্তি মাথা চুলকোয়।

বয়স্কটি কিন্তু-কিন্তু করে বলে—ও হুজুর পরের বাসে আসছে, আমার ছেলেটা সঙ্গে আছে।

গঙ্গারামের মুখ হাসি চাপার অসম্ভব কষ্টে বেগুনি হয়ে যায়। কিন্তু থানেদারের চেহারা হিংস্র হয়ে ওঠে।

—মেরে সাথ মজাক? ছ্যাবলামির জায়গা পাস নি? সবকটার পাছায় হান্টার লাগালে তবে এদের ট্রেনিং পুরো হবে। আসামী যদি পালায় তো তোদের দিন খুব খারাপ যাবে, দেখে নিস্।

ইতিমধ্যে পরের বাস এসে গেছে। বুড়ো কোতোয়ালের ছেলের সঙ্গে নেমেছে কোমরে দড়ি বাঁধা কথিত আসামী লুচুকদাস। অজয় একপলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেন। ন্যালা ক্যাবলা আধপাগলা গোছের একটা লোক। উস্কোখুস্কো চুল, শার্টের হাতাটা ছেঁড়া। চোখের কোণে পিঁচুটি, হলদেটে দাঁত, মুখ থেকে বাসি মদের টোকো গন্ধ, আর নিম্নাংগের পাজামাটা অনেক পুরোনো, পায়ের কাছে ফাঁসা। এ মেরেছে আজিজ পালোয়ানকে? কি করে?

জিগ্যেস করতেই হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে লুচুকদাস। ও কিচ্ছুটি জানে না। কাল ছিল শঙ্করজীর দিন। ও গাঁজায় দম একটু বেশি চড়িয়ে মন্দিরেই ভোম হয়ে সারারাত্তির কাটিয়েছে।

অজয় দুই ধমক দিয়ে মুন্সীকে বলেন খাতায় এন্ট্রি করে ব্যাটাকে লক আপে ভরতে। ডাক্তারকে খবর করা হয়, সঙ্গে গিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা করে অ্যাম্বুলেন্সে বডি কাঠঘোরা মর্গে নিয়ে আসার জন্যে, কাল পোস্ট মর্টেম করতে হবে। আজ হবে না। কারণ ডোম সুখিয়া গণতন্ত্র দিবসের ছুটিতে মাতাল হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

|| ২ ||

পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট এসে গেছে। রিপোর্ট পড়ে থানেদার ডোঙ্গরের চক্ষু চড়কগাছ। মৃতদেহের শরীরে অন্তত: ২৯টি ছোট-বড় আঘাতের চিহ্ন। কিছু ধারালো অস্ত্রের ঘা', কিছু ভোঁতা ভারী জিনিসের আঘাত; আর ডাক্তার মিশ্র বল্লেন—এই ১১টা চোট দেখুন! একটাও ফ্যাটাল নয়। ব্লেড বা ছুরি অথবা অমনি কিছু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পুঁচিয়ে পুঁচিয়ে কাটা হয়েছে। মনে হয় আজিজ পালোয়ানের ওপর হত্যাকারীদের খুব রাগ ছিল; অনেকক্ষণ ধরে যন্ত্রণা দিয়ে মেরেছে।

—হত্যাকারীরা? একাধিক লোক বলছেন?

-—হ্যাঁ, কোনো একজনের পক্ষে আলাদা আলাদা হাতিয়ার দিয়ে এতক্ষণ ধরে আজিজকে যন্ত্রণা দেয়া?--ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়। একাধিক লোক, আজিজকে বাগে পেয়েছিল।

—মানে, কোথাও বেঁধে রেখে টর্চার করেছে?

—তাই মনে হয়। দুটো হাত ও পায়ে গোয়ালঘরের দড়ি দিয়ে বাঁধার দাগ আছে। আর কোন রেজিস্ট্যান্সের চিহ্ন নেই।

—বডি পাওয়া গেছে গাঁয়ের প্রান্তে গরুমোষ ধোয়ানোর পুকুরপাড়ে, পাকুড় গাছের তলায় ফেলে রাখা ছিল।

এবার ব্যাংক ম্যানেজার গঙ্গারাম বলেন—পুকুরপাড়ে পাকুড় গাছের তলার জমিটা? ওটা কার?

—ওতে কি বোঝা যাবে? ওটা সরকারি জমিন। পঞ্চায়েতের রক্ষণাবেক্ষণে আছে। তবে আশেপাশে রক্তের দাগ নেই। জমিতে কোনো ধস্তাধস্তির চিহ্ন নেই। তার মানে হল--

—খুনটা অন্য কোথাও করে এখানে বডি ফেলা হয়েছে। কিন্তু কে বা কারা আজিজকে এমন নৃশংস ভাবে মারল? কেন মারল? ম্যানেজার কিছু বল। আরে সায়েব তুমি তো এখানে বছরখানেক ধরে আছ, গাঁয়ে কার কার সঙ্গে ওর দুশমনি ছিল?

ডাক্তার মিশ্র হেসে ফেলেন।

—কার সঙ্গে ছিল না সেটা জিগ্যেস করুন। কি হে ম্যানেজার সাহেব? সেই ছড়াটা শোনাবে নাকি? আরে লজ্জা কিসের? শুনিয়ে দাও। হতে পারে ওই ছড়াটা থেকেই আমাদের থানেদার কোন ক্লু পেয়ে যাবেন?

অজয় ডোঙ্গরে স্পষ্টত: বিরক্ত। ম্যানেজার আর উনি ঘন্টা দুই হল মহকুমা হাসপাতালে এসেছেন পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট নিতে আর ডাক্তারের মতামত শুনতে। রিপোর্টে ইশারা একাধিক খুনীর, অথচ গাঁয়ে কেউ কিছু জানে না। মনে হচ্ছে লুচুকদাসকে ছেড়ে দিতে হবে। ও শালা পাঁড় মাতাল আর নিঠল্লা আদমী। রহস্য ঘনীভূত। কাল কোরবার অ্যাডিশনাল এসপি শ্যাম সায়েবের কাছে রিপোর্ট পাঠাতে হবে। উনি আবার মহা হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ, পয়সার গন্ধ পাঁউ। আর এই ডাক্তার বয়সে বড় বলে ইয়ারকি মারছে! ছড়া শোনাবে?

—নারাজ মত হো থানেদার সাহাব। অংরেজি সাহিত্য মেঁ এক জাসুসী লেখিকা থী, আগাথা ক্রিস্টি। উনকী সারী কহানী মেঁ সূত্র কে রূপ মেঁ এক রাইম ইয়ানে তুকবন্দী শুনায়া যাতা থা। আপ ভী শুন লো! শুরু হো জাও ম্যানেজার!

ভ্যাবাগঙ্গারাম ম্যানেজার নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে শুরু করে:

"সহস কা লন্দফন্দ, যোশী কে সলাহ্, অউর আজিজ কী গবাহী, এ তিনোমেঁ রহবে তো জড়ি উখাড় জাহি।''

"ফাঁদ পেতেছে সহস, তায় বুদ্ধি যোগায় যোশী, আর আজিজ দেবে সাক্ষী? ওরে বাপ! এ ত্র্যহস্পর্শে ফেঁসেছিস কি ঝাড়েবংশে সাফ!"

—সহসরাম? যোশীজি? এরা কারা?

—সবই জানবেন, ক্রমশঃ প্রকাশ্য। সহসরাম হল ব্যাংকের মকানমালিক। অতি সাধারণ অবস্থা থেকে নিজের বুদ্ধি আর সাহসের জোরে গাঁয়ের প্রচুর জমির মালিক হয়েছে। আসলে অংগুঠা ছাপ। কিন্তু জীবনপ্রভাতে ছুরি গাঁয়ের জমিদার বাড়ির লাঠিয়াল এই আদিবাসী মানুষটি মুখে মুখে বলে দিতে পারে এত ফিট রাস্তা বা এত উঁচু ইঁটের দেয়াল বানাতে কত ইঁট, কত গরুর গাড়ি বালি আর কত ব্যাগ সিমেন্ট লাগবে। কম কথা নয়।

—আর যোশীজি?

—যোশী মহারাজ রাজস্থান থেকে আসা মাড়োয়ারি ব্রাহ্মণ; সব মারোয়াড়ি ব্যবসায়ীদের পুরুত। বুড়ো শকুনের মত দেখতে। কিন্তু বিষয়বুদ্ধিতে প্রখর। রেভিনিউয়ের সব আইনকানুন, মায় অধুনা পাস হওয়া সংশোধনী—সব খবর রাখে। পাটোয়ারি, রেভিনিউ ইনে্সপেক্টর সবাইকে খুশি করতে পারে। সরকারি জমিন কেমন করে অবৈধ কব্জা করে নামমাত্র ফাইন দিয়ে নিজের করে নেয়া যায় তাও তহশীলদারকে শেখাতে পারে।

—বাকি রইলো আজিজ পালোয়ান। ওর সম্বন্ধে আমার থানায় ফাইল আছে। লোককে ধমকানো, মারপিট, চোলাই মদের ধান্ধা আর গুণ্ডাগর্দি, রংদারি ট্যাক্স ইত্যাদি। প্রত্যেকবার জামিন পেয়েছে। কোর্টে কিছু প্রমাণ করা যায়নি, তাই বহাল তবিয়তে খোলা ষাঁড়ের মত ঘুরে বেড়ায়।

—ফাইল যদি মন দিয়ে পড়ে থাকেন তবে এও হয়তো আপনার চোখে পড়েছে যে অধিকাংশ সময় ওর জামিন হয়েছে হয় সহসরাম তঁওয়র নয়তো মঙ্গতরাম যোশী।

—হুম্!

—আসলে ওই ত্র্যহস্পর্শযোগ, বল্লাম না! তিনব্যাটার সাঁটগাঁট! প্রথম জালটা ফেলবে সহসরাম, তারপর ফাঁস গলায় এঁটে বসলে গেঁয়ো চাষী দৌড়ে যাবে যোশীমহারাজের কাছে শলাপরামর্শ নিতে। ওনার মনোহারী পরামর্শে ফাঁসটা আরো ভালো করে গলায় চেপে বসবে। শেষে কোর্টে গেলে তহসীলদারের সামনে আজিজের শপথ নিয়ে মিথ্যে সাক্ষ্য বা গবাহী দেয়া। ফলম্--ভিটেমাটি চাটি হয়ে যাওয়া। এই তিন শয়তানের দাঁও-প্যাঁচে কতজন যে পথে বসেছে। আর এরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ভূসম্পত্তি বাড়িয়ে গেছে। এই লোকোক্তিটি হাসির নয়, অনেক লোকের হাহাকারের শ্বাস।

—ওসব সেন্টিমেন্ট ছেড়ে আপনারা বলুন তো--যখন আজিজ এমন ভাবে মারা গেলো, তখন বাকি দুই মাস্কেটিয়ার্স কি করছিলো বা কোথায় ছিলো?

—এটা আমি বলতে পারবো না। আমি তো সদরে থাকি। গঙ্গারাম সাহেব জানলে বলুক। ও তো ছুরি গাঁয়েই থাকে।

—হ্যাঁ, প্রশ্নটা আমার মনেও এসেছিল। খোঁজ নিয়ে জানলাম যে ওই দিন ওঁরা দুজনেই গাঁয়ে ছিলেন না। যোশীমহারাজ চাঁপা নগরে ওনার যজমানের ছেলের পৈতের শুভকর্ম সম্পন্ন করতে দুদিন আগেই চলে গিয়েছিলেন। আর সহসরাম ওর শ্বশুরবাড়ি পেন্ড্রায় গিয়েছিল।

|| ৩ ||

কসময় ইংরেজ রাজত্বে ছত্তিশগড় সিপি অ্যাণ্ড বেরার স্টেটের মধ্যে বিদর্ভ (বেরার) রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। তখন ওর রাজধানী ছিল নাগপুর। সেখানে কমিশনার বসে সুদূর ছত্তিশগড়ে শাসন চালাতেন। ওনার লেখা একটি বইয়ে ছুরি গাঁয়ের ও সেখানের করদাতা রাজাদের কথা আছে। আবার বিংশ শতাব্দীতে চল্লিশের দশকে বর্গীদের বংশাবতংস মারাঠা রাজবংশীয়দের উদ্যোগে বিলাসপুর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে প্রাচীন রাজধানী রত্নপুর, বর্তমান রতনপুরের কাছে মা তুলজা ভবানী মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই প্রতিষ্ঠা করার সময় আয়োজিত বিরাট যজ্ঞের স্মারিকাগ্রন্থে যে আশি জন জমিদার দান দিয়েছিলেন তাদের মহিমাকীর্তন করা আছে। আমাদের গল্পের ছুরির রাজপরিবার তাদের অন্যতম।

কাঠঘোরার থানেদার অজয় আজ হাজির হয়েছেন সেই রাজপরিবারের প্রাসাদের আঙ্গিনায়। কারণ এই পরিবারের সেজকুমার উদ্যমেশ্বরশরণ মণিপালপ্রতাপ সিংহ এই গ্রাম পঞ্চায়েতের বর্তমান সরপঞ্চ।

লাল ইঁটের বিশাল প্রাচীরে চুণ সুরকির পলেস্তারা খসে পড়ছে। ওপরে কোট অফ আর্মস এখনো পড়া যায়। ১৮৯০-এর কাছাকাছি কোনো বছর লেখা। কিন্তু অজয় চারদিকে চোখ বুলিয়ে পিচ করে পিক ফেলে ব্যাংক ম্যানেজার গঙ্গারামকে ঠেট হিন্দিতে যা বল্লেন তার বাংলা অনুবাদ হল —নামে তালপুকুর, তায় ঘটি ডোবে না।

খবর পেয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছেন সেজকুমার, ছত্তিশগড়ি বোলিতে "সঝলাকুমার''। সাদা টেরিকটের সার্টের বুকপকেটের কাছে পানের পিকের লাল দাগ ধোবার হাত ফেরতা হয়েও পুরোপুরি ওঠেনি। এখনো মুখের পান থেকে কথা বলার সময় কিঞ্চিৎ রঙিন ফোয়ারার ছিটে ওনার জামার গায়ে লাগছে, কিন্তু সেজকুমার নির্বিকার।

থানেদার ইতিমধ্যেই জেনেছেন যে এই ব্যক্তিটি একেবারেই আনকা, আজকের হিসেবে সরপঞ্চ হওয়ার উপযুক্ত নন। সজ্জন, বন্ধুবৎসল, আমোদপ্রিয় উদ্যমেশ্বরশরণ কুমারসাহেব আসলে ব্যক্তিত্বহীন। তাই সবাইকেই খুশি করতে চান, কাউকেই করতে পারেন না। উপরন্তু চালু লোকেরা, যেমন সহসরাম বা তার ছেলেরা ওনার মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়। গতবারও মন্দিরের পাশ থেকে পুকুরপাড় অব্দি রাস্তা বানানোর ঠিকে ওনাকে পটিয়ে সহসরাম হাতিয়ে নিয়েছিল, কাজ পুরো হওয়ার আগেই চাপ দিয়ে বিল পাশ করিয়ে নিয়েছিল। কাজ পুরো না হওয়ায় অডিটের পর বাকি টাকাটা সেজকুমারকেই ভর্তুকি দিতে হয়।

—আসুন, আসুন! কি সৌভাগ্য, সাহেব নিজে এসেছেন! আবার ম্যানেজার সাহেবও! ভাল হল। আজ দিন ভাল যাবে। যথারীতি কাঠের রং ওঠা চেয়ার পেতে সবাইকে ভেতরের বাগানে বসানো হল। চা-সিগ্রেট, শেষে মুখশুদ্ধির মশলা সব এল। ওঠার আগে অজয় হঠাৎ জিগ্যেস করলেন—কুমার সাহেব! আপনি তো জানতেন যে লুচুকদাস নির্দোষ, তাই না?

হঠাৎ এই অপ্রত্যাশিত বাম্পারে সেজকুমার ধরাশায়ী। ঘাবড়ে গিয়ে তো-তো করতে থাকেন।

—না, মানে আমি কি জানি--কে দোষী আর কে নির্দোষ? ওসব তো, মানে আপনি ঠিক করবেন।

--বেশ কথা। লুচুকদাসকে ধরে বেঁধে কাঞ্জিহাউসে আনা হয়েছিল কার হুকুমে?

—না মানে আমারই হুকুমে। কিন্তু--

—কিন্তু আবার কি? তাহলে আপনি জানতেন যে ওই খুনী?

—না, না! আমি কিছু জানি না। আমি ঘরে বসে রেডিও শুনছিলাম। আসলে আমি এখানকার রেডিও শ্রোতা সংঘের প্রেসিডেন্ট তো। তখন সবাই এসে বললো—কুমারসাহেব, খুনী ধরা পড়েছে, আপনার আদেশ পেলে চৌকিদার চেতন সিং ওকে আজ কাঞ্জিহাউসে বেঁধে রেখে সারারাত পাহারা দেবে, সকালবেলায় থানায় খবর দিয়ে তারপর ওখানে সুপুর্দ করে দেবে। তাই আমি--

—আচ্ছা? তা এই সবাই কারা?

—কার কার নাম নেব সাহেব? সবাই মিলে মিশে থাকি, দুশমনী বাড়বে। সবাই বলেছিল।

—অন্তত: পাঁচটা নাম বলুন। আর ওদের হিসেবে খুনটা কখন হয়েছিল?

—নাম বলতেই হবে স্যার?

—ন্যাকামি ছাড়ুন! আর সময়টা?

—কর্মনলাল, হরিরাম, মদন গুণাইত, টেলু-মেলু-মহেত্তররাম ভাইয়েরা। অমৃতলাল দেবাংগন। আর সবাই বলল—রাত বারোটার অনেক পরে। মানে তিনজন তখন লুচুকদাসকে তালাওয়ের পাড় থেকে, মানে যেখানে খুনটা হয়েছিল সেখান থেকে দৌড়ে আসতে দেখেছে।

—তা সেই তিনজন অত রাতে ওখানে কি করছিল? আর আপনিই বা সেই রাতে কোথায় ছিলেন?

—ওরা তালাওয়ের পাড়ে ছিল না, নিজেদের বাড়ির সামনে ঘুম চোখে উঠে পেচ্ছাপ করছিল। জানেনই তো, অজ পাড়াগাঁয়ে আপনাদের ভিলাই-রায়পুরের মত ঘরে ঘরে বাথরুম-পায়খানা নেই পুরুষেরা সবাই রাত্তিরে নিজেদের ঘরের বাইরেই রাস্তার ওপর সেরে নেয়।

—আর আপনি?

—আমি? আমি ঘটনার একসপ্তাহ আগে থেকেই বাইরে ছিলাম। মাকে নিয়ে সপরিবারে পুরী বেড়াতে গিয়েছিলাম। ঘটনার পরের দিন ফিরেছি। স্যার, আমি সবসময় পুলিশের সঙ্গে কো-অপারেট করব, কিন্তু প্লীজ আমার ওই নাম বলার ব্যাপারটা--?

--সে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন।

ফেরার পথে গঙ্গারাম বলে—আপনার কি মনে হচ্ছে যে ও সব সত্যি বলছে? ওর পুরী থেকে ফেরার সময়টা একটু ভেরিফাই করলে হয় না, অজয়জী?

অজয় হাসেন—না, না, ওসবের দরকার নেই। ও সত্যি কথাই বলছে, মোটের ওপর।

চমকে ওঠেন ম্যানেজার—আপনি জানলেন কি করে?

অজয়ের হাসি রহস্যময় হয়ে ওঠে।

—আমি জানি, মানে খুনীদের জানি।

---সে কি? তাহলে ধরছেন না কেন?

--কেউ সাক্ষী দেবে না। এখন ধরলে সবাই বেকসুর খালাস পাবে। তাই একটা কিছু করতে হবে যাতে সাক্ষী পাওয়া যায়। গঙ্গারামের হাঁ-মুখ বন্ধ হয় না। তাই দেখে থানেদারি স্টাইলে মুচকি হেসে অজয় বলেন—চলুন! আজ আপনাকে এক জায়গায় নিয়ে যাবো।

—কোথায়?

—আরে চলুনই না! বড্ড কথা বলেন। অনেক কাজ হল আজকে। এখন একটু রিল্যাক্স করতে হবে না? আচ্ছা, আপনি কখনো বেশ্যাগমন করেছেন?

গঙ্গারাম এবার পুরোদস্তুর ভ্যাবাগঙ্গারাম হয়ে যায়।

|| ৪ ||

কাঠঘোরা বাসস্ট্যান্ডের তেমাথার মোড়। একটা রাস্তা গেছে বিলাসপুর থেকে এসে ২৩ কিলোমিটার দূরে কোরবা থার্মাল পাওয়ার কেন্দ্রের দিকে। আর এর থেকে নব্বই ডিগ্রি কোণ করে আর একটি রাস্তা গেছে বাঙ্গো জলাশয় হয়ে অম্বিকাপুরের দিকে। এই রাস্তা ধরে গোটাকয় খাবারের দোকান, ফলমূল-শাকসব্জির দোকান, ট্রাকের টায়ার সারানোর, চাকায় হাওয়া ভরার দোকান ইত্যাদি ছাড়িয়ে প্রায় দু'শ পা হাঁটলে একটি ছোট চা আর ফুলুরির দোকান, স্থানীয় ভাষায় বলে ভাজিয়া। আপনি ছোটোর থেকে ছোটো গাঁয়ে ঘুরে বেড়ান একটি ভাজিয়ার দোকান ঠিকই পাবেন। ছত্তিশগড়ের সম্পন্ন বা গরীব-গুর্বো মানুষ—সবার সহজ জনপ্রিয় জলখাবার হল ভাজিয়া। সময়ে অসময়ে অতিথ-অভ্যাগত এলে তাদের খাতিরদারি করতে চাই ভাজিয়া।

আপনি যা ইচ্ছে করুন, চুলোয় যান, বোঝাতে ছত্তিশগড়ের লোকে বলবে--"চাহে ভাজিয়া খায়ে, চাহে জাহান্নুম মেঁ জায়ে।'' ছত্তিশগড়ের লোকজীবনে ভাজিয়ার গুরুত্ব বোঝাতে এই ইতরযানী লোকোক্তিটি যথেষ্ট। অথবা দেখুন গ্রামীণ শ্রমজীবি মানুষের মুখে মুখে তৈরি দদরিয়া লোকগীতের জনপ্রিয় এই পঙ্‌ক্তিটি:

"চানা কে দার রাজা, চানা কে দার রাণী,
চানা কে দার গোঁদলী মেঁ কড়কয়থে,
আরে টুরা রে পর-বুধিয়া,
হোটেল মেঁ ভাজিয়া ঝড়কয়থে।।''

("ডালের রাজা ছোলা, ছোলা ডালের রাণী,
ডাল আর পেঁয়াজ গরম তেলে নেচে নেচে ওঠে।
আমার ছেলে বড় হাঁদা, টিকি অন্যের ঘরে বাঁধা,
চেটে পুটে ভাজিয়া খেতে হোটেলেতে ছোটে।'')
এখন বেলা বাজে তিনটে; রোদের তাপ গায়ে লাগছে। বাসের সংখ্যা কমেছে। ফলে এদিকটা একটু বেশি ফাঁকা। ওই ভাজিয়ার দোকানেও উনুনের ছাই নিভু-নিভু; চাকর-বাকরেরা খেতে বসেছে। থানেদার অজয় ডোঙ্গরে ও তাঁর কলেজ জীবনের বন্ধু গঙ্গারাম, (যিনি ব্যাংকের টেবিলে বেশিক্ষণ বসে থাকতে না পেরে কিছু নতুন বিজনেস ধরার বাহানায় খালি ছুরি-কাটঘোরা রুটে বড় রাস্তায় বা তার পাশের গ্রামগুলোতে একটি পুরনো রাজদূত মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ান) জীপ থেকে দোকানের সামনে নাক কুঁচকে নামলেন।

পুলিশ অফিসারের ধরাচূড়া পরা অজয়কে দেখে ছেলে-ছোকারাদের ডাল-ভাতের গ্রাস মুখের সামনে থেমে গেল।

কিন্তু রাঁধুনী বুড়ো বিশালদাস যাদব তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে দুটো চেয়ার টেনে ওদের বসতে অনুরোধ করে। টেবিলের ওপর কাঁচের গ্লাসে জল দিয়ে জিগ্যেস করে,

—কি খাবেন হুজুর?

অজয় মাছি তাড়ানোর মত হাত নেড়ে বলেন,

—তোদের মালকিন দ্রুপতী বাঈকে গিয়ে বল, দারোগাবাবু দেখা করতে এসেছেন।

বুড়ো দৌড়ে ভেতরে গিয়ে প্রায় তক্ষুণি ফিরে এসে বলে--

—ভেতরে আসুন, সরকার! মালকিন বসে আছেন।

এতদিনে গঙ্গারামও শিখে গেছে যে গ্রামীণ জিভে মহাভারতের নায়িকা দ্রৌপদী হয়ে যান দ্রুপতী!

প্রায়ান্ধকার গলির মধ্যে দিয়ে ভেতরের উঠোনে পৌঁছুবার সময় অজয় গঙ্গারামকে বল্লেন,

—এখানে একদম মুখ খুলবে না, ম্যানেজার! আজ শুধু শুনে যাও আর ভুলে যাও।

ভেতরের উঠোনটা বেশ বড়, গাছের ডাল আর তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা। একপাশে সবুজ রঙের কিছু চানাবুট আর রেড়ির তেলের বীজ ডাঁই করে রাখা, অন্যদিকে দুটো মুর্‌রা মোষ জাবনা খাচ্ছে। গঙ্গারামের চোখ গেল আঙিনার উল্টো দিকে জং-ধরা একটি জীপের দিকে। তার পেছনে রং দিয়ে বড় করে লেখা—পোঙ্গা লা বাজা না গা! অর্থাৎ হর্ন প্লীজ!

একটা হাফপ্যান্ট পরা ছেলে গোবরলেপা উঠোনের রোদ্দুরে একটা খাটিয়া টেনে এনে তারপর আধময়লা কাঁথা পেতে দিল। আর সামনের একটি কাঠের টুলে কাঁসার বাটিতে করে লাড্ডু, পেঁড়া ও কালাকাঁদ। একটি শ্রীময়ী মেয়ে নিয়ে এসেছে কাঁসার লোটায় খাবার জল ও সঙ্গে দুটো ঝকঝকে মাজা গেলাস।

থানেদারের ইশারায় গঙ্গারাম একটি কালাকাঁদ তুলে নিয়ে চিবুতে থাকে। বড্ড মিষ্টি। এক লোটা জল দুজনের দুই চুমুকে শেষ। এবার আসে পানামা সিগ্রেট ও দু'খিলি পান, মিঠি পাত্তি ও মিঠা মশলা। কিন্তু গুলকন্দ দিয়ে স্বাদটা খারাপ করে দিয়েছে। অজয় ডোঙ্গরে প্রায় একবছরের থানেদারিতেই স্থূল ব্যাপারগুলো আয়ত্ত করে নিয়েছেন। ওখানে বসে উঠোনেই পিচ্ করে থুতু ফেললেন। লাল পিকের দাগ মাটি শুষে নিতে অপারগ।

কখন পেছনের দরজাটা খুলে গিয়েছে আর সেখান থেকে গঙ্গারামকে প্রায় চমকে দিয়ে বেজে উঠেছে একটি চড়া খনখনে কন্ঠস্বর,

—প্যার লাগথন, ও সাহাবমন্! আজ কেইসে আয়ে হো মোর জেইসে গরীব বেসহারা আওরতকে দুয়ার মা? রদ্দা ভটক গইসে কা?

(গড় করি গো সাহেবেরা! আজ আমার মত গরীব অসহায় মেয়েমানুষের দরজায় কি মনে করে? রাস্তা হারিয়েছ নাকি?)

মুচকি হাসেন অজয় ডোঙ্গরে—অসহায় মেয়েমানুষ বটে! চাইলে গোটা কাঠঘোরাকে কিনে নিতে পারে। বাসস্ট্যান্ড-পাড়ার কোন শেঠ আছে যে আজ অব্দি তোর ঘাটে মাথা মুড়োয় নি? বল্, তার নামটা বল্। আমার বন্ধুটিকে সত্যি কথাটা বল্!

—বললে কি করবে গো তুমি সায়েব?

—গ্রেফতার করে নিয়ে এসে তোর সামনে ফেলে দেব। আমি থাকতে কার এত সাহস যে আমার দ্রুপতী বাঈয়ের দরবারে হাজিরা দেয় নি!

ফিল্মি লফ্‌ফাজিতে অজয়ের জুড়ি মেলা ভার। দারোগা বটে! গঙ্গারামের অস্বস্তি বাড়ে। দ্রুপতী কিছু বলে না। বড়মানুষের বারফট্টাইয়ের সময় কিছু বলতে নেই যে!

গঙ্গারাম তাকিয়ে থাকেন দ্রুপতী বাঈয়ের দিকে। ছরহরে বদন মহিলাটির তেলতেলে কালো চেহারায় বেশ জৌলুষ আছে, মানতে হবে। বয়স গঙ্গারামের চেয়ে একটু বেশিই হবে। তেলমাখা কালো চুল শস্তা ফিতে দিয়ে আঁটোসাঁটো করে বাঁধা। পরনে ছাপা শাড়ি আর কালো ব্লাউজ, কপালে একটি কাঁচপোকা টিপ।

হঠাৎ গলায় সুর পাল্টায় অজয়ের। এবার উনি পুরোদস্তুর থানেদার।

—তো খবর পাক্কি?

—জী সাহাব! ঝুঠ নহী বোলথন্।

—কে বাজে কী বাত? কোন কোন রইসে?

দ্রুপতী অস্বস্তিভরা চোখে গঙ্গারামের দিকে তাকায়। কিছু বলে না। ডোঙ্গরে সেটা খেয়াল করে বলেন,

—এ হামারে খাস মিত্র। এখর সামনে কুছু ছিপাইকে জরুরত নো হে। অব্ বোল, খুলকে গোঠিয়াবে ও।

তারপর উনি গঙ্গারামকে উদ্দেশ্য করে বলেন--শী ইজ এ প্রস্টিটিউট্, নজদিগকে দশ গাঁও মেঁ মশহুর। কিন্তু এ আবার আমাদের পে-রোল্-এ আছে, চালু শব্দে—পুলিশের খবরী বা মোল্। বাকিটা আপনি ওর মুখেই শুনুন।

দ্রুপতী বাঈ মুখে একখিলি পান ঠুসে বলতে থাকে।

--আপনারা ওই ছড়াটা তো জানেনই? সেই যে "সহস কী লন্দফন্দ--?''

ওকে হাত নেড়ে থামিয়ে দিয়ে অজয় বলে ওঠেন--"হ্যাঁ, হ্যাঁ,—সেই 'জড়ি উখাড় জাহি' তো? ওসব ফালতু কথা ছেড়ে কাম কী বাত শুরু কর্।''

—সেই তো বলছি। খুন তো অনেক দিন আগেই হত। শুধু সুযোগের অপেক্ষা।

—মানে?

—তিনটে শয়তানের মধ্যে সবচেয়ে হারামী ছিল আজিজ। ও একনম্বরের আওরতখোর। গাঁয়ের বহুবেটির দিকে হাত বাড়াতে কোন লিহাজ করত না। একটা বউ মরেছে, আর একটাকে ও নিজে তালাক দিয়েছে। ওর কু-নজর পড়ায় ছেলেটা বৌ নিয়ে কোরবা শহরে চলে গেছে। সেখানে মোটর সাইকেল মেরামতের গ্যারেজ চালায়। বাপের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। গড়বড় হল যখন আজিজের নজর গেল রসেলু যাদবের মেয়ের দিকে। রসেলুরা চার ভাই। দুধের ব্যবসা, ভাল ক্ষেতিও আছে। মেয়েটাকে জামাই ছেড়ে দিয়েছে, বাপের বাড়িতে আছে কিছু দিন। রসেলু সম্বন্ধীবাড়িতে লোকজন পাঠাচ্ছে--একদিন জামাইয়ের মন গলবে, এসে মেয়েকে নিয়ে যাবে এই আশায়। কী করে যেন শয়তান আজিজ বশ করল ওই বাচ্চা মেয়েটাকে। নিঘ্ঘাৎ জাদুটোনা করেছিল। জানেনই তো, ছুরি গ্রামকে দশকোশের মধ্যে জাদুটোনার জন্যে সবাই জানে। ব্যাংকের পাশের বাড়ির গোঁড় পরিবারের বৌ, লাইনপাড়ার ডোমনের বিধবা, রহসবেড়ার টেঁটকি কোস্টিন (তাঁতিবৌ টেটকি)—সবকটা ডাকসাইটে টোনহি। একবার যদি লংকাপোড়া হাতে নিয়ে আপনার দিকে তাকিয়েছে--! সেবার হরেলি-অমাবস্যার রাতে--

—ফের ফালতু বকবক শুরু করেছিস? কাজের কথা বল। আমার সময় নেই।

ধমক খেয়ে মুষড়ে পড়ে দ্রুপতী বাঈ। গঙ্গারামের আগ্রহ হচ্ছিল টোনহি-উপাখ্যান শুনতে। কিন্তু থানেদারের চোখের দিকে তাকিয়ে চেপে যায়।

—সেই কথাই তো, আপনি বলতে দিচ্ছেন কই? গতবছর হরেলি-অমাবস্যার রাতে সহেলুরা সদলবল লাঠিসোঁটা নিয়ে আজিজকে ওদের ঘরের পেছনের কোলাবাড়িতে (মানে বড়সড় কিচেন গার্ডেন, যাতে শাকসব্জি-লংকা-টম্যাটো-পেঁপেগাছ ও অন্তত: একটি পাতকুয়ো থাকবে) মেয়েটার সঙ্গে ঘিরে ফেলে। কিন্তু আজিজ ন্যাংটো অবস্থায় চাড্ডি হাতে পাঁচিল টপকে পালিয়ে যায়। কথা চাউর হয়ে যায়। মেয়ের শ্বশুর আর ভাসুর বাড়ি বয়ে সহেলুদের যা-নয়-তাই বলে যায়। দুমাস পরে মেয়েটা ভেদবমি হয়ে মরে।

একসঙ্গে এতগুলো কথা বলে দ্রুপতী বাঈ একটু দম নেয়, জল খায়।

সেই সুযোগে অজয় ডোঙ্গরে সরু চোখে তাকান ওর দিকে।

—ভেদবমি? আমি তো শুনেছিলাম জ্বরজারি!

—সত্যি সত্যি কী হয়েছিলো আমিও জানিনা। কু-লোকে বলে ঘরের লোকই খাবারের সঙ্গে ধান কে কীড়ে মারনে কী দাওয়াই মিলিয়ে মেয়েটাকে মেরে ফেলেছে, ওকর পেট হো গয়ে রইস না? দু মাহিনাকে। কা লা কা বোলবে তঁয় সহাব! কাকে কী বলা যায়?

গঙ্গারাম জিগায়—কোন হল্লা হয়নি? থানা-পুলিশ? চীড়ফাড়?

—আরে গাঁওকে আর এম পি ডাক্তার সার্টিফিকেত লিখ দিস্, পহলে কে থানেদার সাহাব ঘলো কুছ খুরচন-পানি লেকর মান গইস্। কা লা কা বোলবে, সাহাব?

—ওকর বাদ কা হৈস?

—তারপর? তারপর রসেলুরা সবকটা ভাই গাঁয়ের ঠাকুরদেবের থানে গিয়ে কসম খেল যে ওরা একদিন আজিজকে মারবেই মারবে। যদ্দিন না পারে তদ্দিন নিরামিষ খাবে। আজিজও সতর্ক ছিল। বিনা হাতিয়ার চলা ফেরা করত না। তবু রাত্তিরে কাঠঘোরা থেকে ছুরি ফেরার রাস্তায় দুবার হামলা হল। একবার জেজরা গাঁয়ের নালার পাশে, আর একবার ধনরাস গাঁয়ের ভাটায়। অন্ধকারে ওত পেতে ছিল রসেলু আর তার দলবল। কিন্তু দু'বারই সহসরাম আগেভাগে খবর পেয়ে আজিজের বডিগার্ড বাড়িয়ে দেয়। ওদের কাছে কাট্টা (দেশি পিস্তল) থাকে।

—এবার কি করে ভুল হল?

—এবার যোশীমহারাজ আর সহসরাম কেউ গাঁয়ে ছিল না। সরপঞ্চ সঝলাকুমার সাহেবও নেই। সহসরাম পইপই করে মানা করে গেছিল—ওরা ফিরে না আসা অব্দি আজিজ যেন ঘর থেকে না বেরোয়। আজিজও বেরোয় নি,—একদিন, দুদিন, তিনদিন। তারপরই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসল।

—সেটা কি?

—দারু কা চক্কর। দারু কা লত তো থা পর ও দিন শর্মা গুরুজী লে পইসা মাঙ্গ বইঠে। গুরুজী ইন্‌কার কিয়ে তো ওলা মা-বহিন কী গালি দে দিস অউর কসকে দু তামাচা লাগাইস। ওকর লেইকা মন কে সামনে।

গুরুজী লাজশরম কে মারে ফুট-ফুট কর রো দিস। খানা-পিনা ছোড় দিস। ফির পঞ্চকে পাস জা কে বোলিস—তুমন ন্যায় কর। মোলা ন্যায় চাহিয়ে, তব তক অন্নজল গ্রহণ নহী করহুঁ।

—ফির?

—ফির ক্যা? সরপঞ্চ পুরী গিয়েছিলেন। উপ-সরপঞ্চ কর্মনলালের বাড়িতে বৈঠক হল। সবাই বললো—পাঠানের বড্ড বাড় বেড়েছে। বাহমণ গুরুজীর (ব্রাহ্মণ স্কুলটিচার) গায়ে হাত? গালি গালাজ? পাপ কে ভাণ্ডা ফুট গয়ে। অব কুছু করনা পড়ি। সব মিলকর এক পিলান কীস। শ্যামলাল পটেল, সমেলাল সারথী অউ ইতরু যাদব লা পাঠান লা খাল্লাস করে কে ঠেকা দে দিস। জব তক ওমন জেল মা রহি ওমনকে মাইপিলা কে রশনপানি কী জুগাড় হো জাহি। ছুরি কে পরসন উকিল বিনা ফীস ওমনকে কেস লড়ি।

থানেদার ও ব্যাংকার যেন দ্রুপতীবাঈয়ের জাদুটোনায় পাথর হয়ে গিয়েছে।

—সব বুঝলাম। কিন্তু ওকে মারল কখন? আর কি করে?

—আজিজ পাঠানকে লাইনপাড়ার ভাট্টিতে মদ খাইয়ে চুর করে নিয়ে এল ওরা তিনজন। তারপর বাজারের তেমাথায় ইতরুর পানঠেলার সামনে সিমেন্টের বিজলীখাম্বার গায়ে পিছমোড়া করে বাঁধল। সারা গাঁয়ের লোক ফিরিতে মজা দেখল। কেউ কেউ থুতু ছেটাল, কেউ দু-ঘা জুতোর বাড়ি লাগাল। ওরা তিনজন ওকে দেখিয়ে দেখিয়ে মদ খেল আর ওকে একটু একটু করে পুচিয়ে পুচিয়ে কাটল। কয়েক ঘন্টা ধরে। ও মরলো সন্ধে সাতটা নাগাদ। তখন নিয়ে গিয়ে পুকুর পাড়ে ফেললো।

—এত লোক দেখেছে, কেউ কিছু বলবে না?

—না সাহেব! উকিল এবং উপ-সরপঞ্চ শিখিয়ে পড়িয়ে রেখেছে—কেউ কিছু দেখেনি।

—তাহলে?

—একটা উপায় আছে। ঐ মোড়ের মাথার সিন্ধি দোকানদারদের ধরুন। ওরা বাইরের লোক, এদিকের গাঁয়ের কেউ নয়। একটু চাপ দিলে উগরে দেবে। তায় ওদের মাথা রামচন্দর সিন্ধিটা বড্ড ভীতু। ওকেই আগে ধরুন।

|| ৫ ||

না,দ্রুপতীবাঈয়ের ফর্মূলা খাটেনি। কালোগাড়ি ও একঝাঁক পুলিশ দেখেও গাঁয়ের কারো হেলদোল নেই। কেউ কিচ্ছু দেখেনি।

সিন্ধি দোকানদারেরাও মনে হয় কয় দশক ধরে ছুরি গাঁয়ে থাকতে থাকতে ওদেরই একজন হয়ে গেছে। রামচন্দর সিন্ধি বললো—এই তেমাথায় ওরকম বীভৎস কিছু হয়নি।

ওকে যখন বলা হল যে পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী মৃত্যু হয়েছে সন্ধে ছ'টা থেকে রাত ন'টার মধ্যে তখন ও বলল—সন্ধে ছ'টা? আমাদের তো হুজুর পাঁচটার পর মানে সূর্য ডুবতেই দোকান বন্ধ হয়ে যায়। একি কাঠঘোরা না বিলাসপুর? এ হল হদ্দ পাড়া গাঁ। এখানে সন্ধে হতেই সব শুনশান, সন্নাটা।

ফিরে গেল কালো ডগ্গা বা গাড়ি নিয়ে পুলিশবাহিনী। কিন্তু থানেদার অজয় ডোঙ্গরের গোঁফের ফাঁকে যেন হাসির রেখা! কেটে গেল আরো দশটা দিন। তারপর এল এক বেস্পতিবার, স্থানীয় ভাষায় গুরুবার,—বৃহস্পতি যে দেবগুরু! রাত্তির আটটা হবে। দরজা বন্ধ করে গঙ্গারাম সেভিংস ব্যাংক লেজারগুলোর ব্যালান্সিং করতে ব্যস্ত ছিল। এমন সময় চ্যাঁ-চ্যাঁ করে কলিং বেজে উঠল। খুলে দেখে কালো সোয়েটার গায়ে থানেদার ডোঙ্গরে স্বয়ং।

—চলো দোস্ত! বন্ধুকৃত্য কর। উইটনেস হতে হবে।

—সে কি? কোথায় যাব?

—ঐ বাজারের তিগড্ডায়। রামচন্দর সিন্ধির দোকানে। কালো গাড়ি গাঁয়ের বাইরে রেখে পেছনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে এসেছি। এখন তোমার রাজদূত স্টার্ট কর। তবে তো "জানদার সওয়ারি, শানদার সওয়ারি'' স্লোগানটার কোন মানে হবে!

রাত সওয়া আটটার সময় মোটরবাইক থেকে নেমে দুজনে এগিয়ে গেলেন সিন্ধির দোকানে। আলোয় ঝলমল করছে চারদিক। সবকটা দোকানে চলছে কেনাকাটা, গ্রাহকের ভীড় একেবারে কম নয়। পান দোকানে ফিল্মি গানের ক্যাসেট বাজছে। কথামত ম্যানেজার বল্লেন—শেঠজি! এক প্যাকেট পানামা আর এক ডজন ডিম চাই যে!

একগাল হেসে দোকানদার মাল প্যাক করে দেয়। গঙ্গারাম পয়সা দিতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে অন্যদের ঠেলে এগিয়ে আসেন অজয় ডোঙ্গরে। খপ করে চেপে ধরেন রামচন্দর সিন্ধির কব্জি।

—কী রে! শালা সিন্ধি! সেদিন কী বলেছিলি? পাঁচটায় সব দোকান বন্ধ হয়ে যায়? চারদিক শুনশান হয়ে যায়। সবাই ঝাঁপ ফেলে ঘরে ঢোকে? এখন ঘড়িতে কটা বাজে? কটা বাজে ঘড়িতে? ঠিক করে বল হারামখোর!

ওয়াকি টকিতে নির্দেশ পেয়ে পাঁচমিনিটের মধ্যে এসে যায় কালো গাড়ি। হাতকড়ি পরিয়ে গাড়িতে তোলা হয় সবকটা সিন্ধি দোকানদারকে।

পরের দিন দুপুর বেলা। গঙ্গারাম গেছে লাঞ্চের ফাঁকে স্থানীয় আর এম পি ডাক্তার জয়সওয়ালের ডিসপেন্সারিতে। ডাক্তার নেই, কলে গেছেন ভিন গাঁয়ে। আধঘন্টার মধ্যে এসে পড়বেন। ও চেয়ার টেনে বসে কম্পাউন্ডার শংকরের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়। শংকর মহা ফক্কড়। সাইনবোর্ডে লেখা আছে--"হম সেবা করতে হ্যায়, ঈশ্বর চাঙ্গা করতে হ্যায়।'' (আমরা চিকিচ্ছে করি, ঈশ্বর ভাল করেন।)

সেদিকে চোখ পড়তেই শংকর মিচকে হাসে।

—ভুল লেখা আছে ম্যানেজার সাহেব। লেখা উচিত--"ঈশ্বর চাঙ্গা করতে হ্যাঁয়, হম নাঙ্গা করতে হ্যাঁয়।'' (ঈশ্বর ভাল করেন, আমরা ন্যাংটো করি।)

দুজনের হাসির ফাঁকে হঠাৎ রাস্তা থেকে একটা হৈ-চৈ-এর আওয়াজ, এদিকেই এগিয়ে আসছে। ওরা বারান্দায় বেরিয়ে আসে। রাস্তা দিয়ে চলেছে একটা ভীড়, তাতে গাঁয়ের গণ্যমান্য ভদ্রজন ছাড়াও আছে ছোট ছোট বাচ্চার দল। সবার আগে কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়ি বাঁধা অবস্থায় চলেছে শ্যামলাল, সমেলাল ও ইতরু। গন্তব্য বড় রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো পুলিশ ভ্যান।

গঙ্গারামের মন খারাপ হয়ে যায়। মাত্র তিনমাস আগে এই তিনজনকেই ও গ্রুপ-গ্যারান্টিতে আই আর ডি স্কীমের লোন দিয়েছিল। প্রত্যেককে পাঁচ-পাঁচ হাজার। তখন এদের বেশ শান্ত, ভদ্র মনে হয়েছিল। এরা কি করে অমন কাজ করতে পারলো?

হঠাৎ ওর দিকে চোখ পড়তেই শ্যামলাল হাত তোলে, হাতকড়ায় বদ্ধ জোড়াহাত।

—প্যার পরথন হো সাহাব। শ্বশুরাল যাথন। ব্যাংক লোন বর চিন্তা ঝন করবে। ও পইসা পট জাহি। (ব্যাংক লোন নিয়ে ভাববেন না। শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছি তো কী? ও ঠিক আদায় হবে।)

তিনজন হেঁটে যাচ্ছে মাথা উঁচু করে। নীচু গলায় নিজেদের মধ্যে কোনো চুটকি শুনিয়ে হেসে উঠছে। ওদের চেহারায় কোন গ্লানির চিহ্ন নেই।

(ক্রমশ)



(পরবাস-৬১, ডিসেম্বর ২০১৫)