Parabaas Moviestore




Parabaas Musicstore




Subscribe to Magazines






পরবাসে নিবেদিতা দত্তর লেখা






আনুর গপ্পো


|| পরিচয় ||

নু আমার স্বপ্ন শিশু। সম্পর্কে আমার নাতি, এই ভাবতেই ভাল লাগে। ওর বয়স এই ছয় থেকে সাতের মধ্যে। বয়সের তুলনায় বেশ ভাবুক, তবে খেলাধূলাও ভালবাসে, বিশেষ করে ক্রিকেট। ওকে ভাবলেই মনে ভেসে ওঠে ব্যাট হাতে আনু বা কমপিউটরের মাউস হাতে ধরা আনাই, এক মনে ছবি আঁকছে। ওর রং শ্যামলা। এক মাথা নরম, একটু খয়রিটে কালো পাকানো পাকানো চুল। না রান্না করা নুডলসকে খয়েরি কালো কালিতে ডুবোলে যেমন দেখতে হয় তেমন আর কি।

জন্মের পর কয়েক বছর আনু ছিল আমেরিকার প্রিন্সটনে। তখন ওর মা বাবা দুজনেরই বেশিরভাগ সময় কেটেছে অফিসে ও ইউনিভার্সিটিতে। সেই খুব ছোট্ট বেলায় আনু যেত কাছেই বব আন্টির ডে কেয়ার কাম নার্সারি স্কুলে। সকাল আটটা থেকে বারোটা কাটিয়ে ফিরে আসত। বেলা বারোটা থেকে তা প্রায় সন্ধ্যা সাতটা অবধি আনু থাকত এক ন্যানির হেফাজতে। সাতটার জায়গায় কখনোও ঘড়ির কাঁটা আটটা ছুঁলেও মিসেস সিম্পসন কোনোদিনও কিছু মনে করেন নি। ষাট বছরের নিঃসঙ্গ এই বৃদ্ধাকে আনুর মা একদিন হাইওয়ের ধারে এক গ্যাস ষ্টেশনের কাছে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল যাতে লেখা ছিল ‘উইল ওয়ার্ক ফর ফুড’। খোঁজখবর করে জানা যায় উনি আগে ন্যানির কাজই করতেন, অসুস্থ হয়ে পড়ায় উপস্থিত বেকার। কিছুদিন আগে অবধি একটি স্কুলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিশ্বস্ততা প্রমাণে আনুর জন্য বহাল হওয়া ইস্তক ওর বকবকানি শোনার এক আগ্রহী শ্রোতা মিসেস সিম্পসন। কিছুদিন পর অবশ্য আনুর মা বাবা দেশে ফিরে আসে-, আর আনুও বড় হয়ে ওঠে ভারতবর্ষে।

এমনিতে আনু ভালোই থাকে, তবে ই-মেল মারফত যতটুকু বুঝি তাতে মনে হয় ও বড় একা। বাংলা শিখছে, বলতে পারে গড়গড় করে, খানিকটা লিখতেও। তবে যখন যেখান থেকেই ইংরাজি স্ক্রিপ্টে বাংলা লিখে আমাকে মেল করে, তাতে ‘ভাল্লাগে না’ কথাটা প্রায়ই ঘুরে ফিরে আসে। হ্যারি পটারের ছবি দেখা হয়ে গেছে, একটু একটু বানান করে পড়ছেও। না বুঝতে পারলে তো মাকে ব্যস্ত করে তুলছে। কিন্তু হ্যারির দুনিয়া মনোহারি হলেও শিশুকে প্রতিদিনের পৃথিবী থেকে সরিয়েই নিয়ে যায়। চোখ মেলে তাকালে প্রতি নিয়তই যে কত মজার মজার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তাই নিয়েই লেখার চেষ্টা করেছি আনুর গপ্পো- আনুর জন্য ও আনুর মত আরো অনেকের জন্য।





|| আনুর গপ্পো ||

স্নেহের আনু,

কাল তোর ই-মেল পেলাম। লিখেছিস মাম আর বাবু দুজনেই চলে যায় খুব সকাল সকাল। তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যায় স্কুলে। সেখান থেকে একটার সময় মিসেস সিম্পসন তোমাকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন আর তোমার সাথে সন্ধ্যা অবধি থাকেন। এক দিন নাকি উনি গল্প বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আর তুমি তাই ওনার নাকে তুলো পাকিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছ, শুনে মাম বকেছে। সত্যিই তো, ওনার বয়স হয়েছে, একটু ঢুলে পড়তেই পারেন মাঝেমধ্যে। আর অমন কোরো না, কেমন! এতদূরে তুমি থাকো যে আমি ইচ্ছে করলেই তোমার কাছে ছুটে যেতে পারি না। তা নাই বা পারলাম। কমপিউটার তো আছেই তোমার আমার মাঝে। বন্ধুর মত সে-ই মিলিয়ে দিয়েছে তোমায় আমায়। এবার থেকে আমি যখনই সময় করতে পারব একটা করে মেল করে তোমাকে আমার ছোট বেলাকার গল্প বলব। এখন যেখানে আছি, খড়্গপুর, সেই জায়গাটাও ভারি সুন্দর, তাই এখানকার কথাও লিখব। অল্প কিছুদিন আমেরিকার বার্কলে শহরে ছিলাম, সেখানকার টুকিটাকি ঘটনাও তোমাকে বলার ইচ্ছে আছে। দেখবে কত ভাল লাগবে। তখন তুমি প্রিন্সটনের চারিদিকে তাকালে মনে হবে এই পৃথিবীটা, যেখানে আমরা সবাই থাকি, তা কত সুন্দর। কত কি মন কাড়া ব্যাপার-স্যাপার ঘটে সেখানে মিনিটে মিনিটে। আজ এই অবধি রাখছি। কিছুটা রান্না বাকি আছে, বেলা সাড়ে এগারটা হয়ে গেল। মেল কোরো, আর এই আইডিয়াটা কেমন লাগল তোমার জানিও।
                                                             দিম্মা

আনাই,

আমার বাবা, মানে তোর মার দাদু, ছিলেন বিহারের ও,সি, যাকে বড় করে বলে অফিসার ইন চার্জ,- তোর পক্ষে কথাটা বেশ শক্তই হয়ে গেল। সহজ করতে গেলে বলা যেতে পারে পুলিশ থানার বড় কর্তা বা বড় বাবু। তা ওঁকে কাজের সুবাদে (জন্যে) বিহারের অনেক জায়গায় ঘুরতে হয়েছিল। তাদের অনেকগুলোই এখন ভারতের এক নতুন রাজ্য ঝাড়খণ্ডে পড়ে। যেমন ধর লাতেহার, তারপর গাড়োয়া যেখানে আমার জন্মের পর পরই থেকেছি, বেরমো, কোডারমা, ডালটনগঞ্জ। আবার উত্তর বিহারে যেসব জায়গায় ছিলাম তাদের মধ্যে কয়েকটার নাম তোকে বলি — বেতিয়া, বগাহা, মোতিহারি, নরকাটিয়াগঞ্জ, যোগাপটি। নামগুলোই এত অন্যরকম যে বারবার নিজের মনে বলতে বেশ লাগে। এসব জায়গা এখন কেমন আমার জানা নেই। তবে আমার এই মেলগুলোতে আমি তোকে সেই সময়টার কথাই লিখব যখন বিহার ছিল সুন্দর, সরল।

তখন আমরা পাঁকিতে। আমার বয়স বোধহয় ছয়েরও কম। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে শুনি বাড়িতে খুব হুটোপাটি। আর সেটা হচ্ছে আমাদের গুদোম ঘরে, যে ঘরটাকে হাতল ভাঙ্গা চেয়ার আর পা ভাঙ্গা টেবিলের আরাম ঘরও বলতে পার। ছুট্টে গিয়ে দেখি (খরগোশের থেকে কিছু বড় হবে) খয়েরী রঙের এক হরিণ ছানা খুব হাই জাম্প প্র্যাকটিস করছে আর তাকে ধরতে আমাদের চৌকিদাররা এমন কি আমার বাবাও নাস্তানাবুদ। এই ছোট হরিণকে বিহারে বলত কোটরা। শেষ পর্যন্ত কিন্তু ওকে ধরা যায় নি। ছোটাছুটিতে তারের জালের খোঁচা লেগে ওর মুখ ছড়ে একটু রক্তও পড়েছিল তা আজও মনে আছে, তবু সে ধরা দেয় নি। বনের শিশু, বাঁধন তার ভাল লাগবে কেন বলো?

                                                   আদর জেনো
                                                            -দিম্মা

স্নেহের আনাই,

আজ বেশ কদিন বাদে তোকে মেল করছি। কিছু লেখার আগে একটা কথা লিখে নিই। আমি মাঝে মাঝেই তোকে চিঠিতে একটা আধটা বড়, শক্ত বাংলা শব্দ(কথা) লিখি। সেটা ইচ্ছে করেই লিখি। এমন করলে তুইও অনেক নতুন বাংলা কথা শিখে যাবি। তুই, আমি, আমরা সকলে বাংলা না বললে, পড়লে ভাষাটা বাঁচে কি করে বল? বাংলা পড়ব, বাংলা লিখব, বাংলা শেখাব, তবেই না।

আজ মনে পড়ছে বিহারে আমাদের বাড়িঘরের কথা। বাড়িঘর বলতে ওখানে যেসব কোয়ার্টারে থাকতাম তাদের কথাই লিখব। তবে শুধু ইঁট কাঠের কথাই নয়, সেসব বাড়িতে আমাদের ওঠাবসা কেমন ছিল তাও বলব ফাঁকে ফাঁকে। থানার চৌহুদ্দির (আশপাশের যতটুকু জায়গা থানার নিজের জমি) মধ্যে সব বাড়িগুলোই ছিল এক তলা আর অনেকটাই এক রকমের দেখতে। ধর যদি একটা উঁচু মাটির গ্লাসকে মাঝামাঝি কেটে দিই তার যেমন আকার (দেখতে) দাঁড়ায় ঠিক তেমন মাটির টালি দিয়ে ছাওয়া থাকত বাড়ির ছাত,—ওখানকার লোকেরা বলত খাপড়ার চাল। বাড়িতে ঢোকার আগে দু ধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে ছিল এক টুকরো বারান্দা। তার পর একটা ঘর,- আমরা ড্রয়িং রুম বা সিটিং রুম বলতাম না, বাবা মার কাছে শুনে শুনে বলতাম সামনের ঘর। সামনের ঘর দিয়ে ঢুকে কিছুটা লম্বা একটা বারান্দা। তার এক দিকে দুটো বড় ঘর ও অন্য দিকে উঠোন। উঠোন কোথাও সিমেন্ট বা ইঁট বাঁধানো থাকত, কোথাও কাঁচা মাটির। এই দুটো ঘরের একটা ছিল আমার মায়ের শোবার ঘর, যেখানে খাটের গদির তলায় লুকানো থাকত আমার বাবার রিভলবার। অন্যটা সব রকমের কাজে লাগত — মার ঠাকুরের চৌকি থাকত সেখানে, আর কাঠের বেঞ্চির ওপর সার দিয়ে কালো কালো ট্রাঙ্কে আমাদের জামাকাপড়। কোনো বাড়িতে সে ঘরে তাক থাকলে সেখানে থাকত বড় বড় বোয়ামে মশলা ভরা আমের আচার, গুড় আম, চিনি দিয়ে আমের মোরব্বা। আর দিনের বেলা, মাটিতে আসন পেতে কাঁসার থালা বাসনে আমরা ভাত খেতাম সে ঘরে। এই ঘরের সামনে যে দালানটা ছিল সেটা ঘুরে গিয়ে কোনাকুনি ভাবে একটা নীচু বারান্দার সাথে জোড়া থাকত। সেই বারান্দার সামনে থাকত ভাঁড়ার ঘর ও রান্নাঘর। ইঁদুরের ভয়েই বোধহয় মা চাল-ডাল ছাড়া ভাঁড়ারে কিছুই রাখত না। রোজই ভাঁড়ার বার করার সময় মা ইঁদুরের মুন্ডপাত করে ইঁদুরকল পাতার প্রতিজ্ঞা করত, পরদিন আবার সেই একই বস্তা কাটা চাল-ডাল ছড়ানো থাকত মেঝেতে। আনু, একটা মজার ঘটনা এখানে বলে নিই যা তখন আমাদের কাছে মোটেই মজার ছিল না। একটি থানার বাড়িতে টালির চালের পর সাধারণ চটের সিলিং ছিল। পুরনো হয়ে যাওয়াতে তা অনেক জায়গাতে ছেঁড়া ছিল। রাত্তিরবেলা সেখান থেকে দেয়াল বেয়ে ইয়া বড় বড় ইঁদুর নামত। আর আমাদের টমি কুকুর তাদের কামড়ে ধরে উঠোনে আছড়ে মারত, বাবা বিরাট এক টর্চ হাতে টমিকে ইঁদুর দেখিয়ে দিত। রাতের বেলা সেকি হৈ হৈ! সংসার করতে বাবা মাকে কত কি যে করতে হয়েছিল।

ভাঁড়ার ও রান্নাঘরের দরজা বাইরে থেকে শিকল দিয়ে দরজার উপর বন্ধ হ’ত। ছিটকানি বা হুড়কো কিছুই ছিল না। বাড়ির সব জানলা দরজাই ছিল কালোপানা। তাতে কোনোদিন ও রং পড়েছে বলে মনে পড়ে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো সেই সব বাড়িই আমাদের কাছে ছিল আনন্দ উপছে পড়া স্বর্গপুরী। রান্নাঘরের বাইরে ঠিক দরজার পাশে বারান্দায় একটা মাটির জোড়া উনুন থাকত,(জোড়া উনুন কেমন দেখতে এঁকে দেখাবার চেষ্টা করছি)। আসলে বিহার তো খুব গরমের জায়গা তাই বেশীরভাগ সময়ই গরমের সন্ধ্যায় দালানের উনানেই রুটি তরকারি হত।– হ্যারিকেনের আলোয় কাঠের উনানে আমাদের তারাচাঁদ ঢুলে ঢুলে রান্না করছে, মা তাড়াতাড়ি তরকারিটা কেটে দিয়েই গা ধুয়ে উঠানে বসে আছে।— চোখ খুলেও আজ সেই ছবি দেখতে পাই। বুঝতেই পারছ আমাদের বিজলি বাতি, পাখা কিছুই ছিল না। ছিল কেবল হাত পাখা আর হ্যারিকেন। হাত পাখাগুলো ছিল দু রকমের। একটা গোল তাল পাতার পাখা। আর একটা ছিল বাঁশের বোনা চৌকোনো, তার হাতলটা একটা সরু ফাঁকা বাঁশের দু-তিন ইঞ্চি কঞ্চিতে গলানো থাকত। সেটা ধরে ঘোরালে পুরো পাখাটাই ঘুরত, বোধহয় তাতে বেশী হাওয়া হত তাই ওই ব্যবস্থা। আর আগেই বলেছি আলো বলতে ওই হ্যারিকেন, তার আলোই চোখে বেশি লাগত বলে বাবা আলোর গায়ে একটা লেখা হয়ে যাওয়া পোষ্টকার্ড গুঁজে দিতো।


গরমের দিনে বিকেল হলেই, উঠোনে জল ছিটিয়ে ফিতের খাট পাতা হ’ত, ও তাতে থাকত একটা করে পাতলা চাদর।(খাটিয়াও ছিল, খাটিয়া হল বিহারের ছোট ছোট বাঁশ বা কাঠের ফ্রেমে দড়ি বোনা খাট, খুবই হাল্কা হয় সেগুলো)। আমরা সারা সন্ধ্যে ও রাত্তির ফিতের খাটে শুয়ে বসে গল্প করে কাটাতাম। হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে ইচ্ছেই করত না। কোলকাতা থেকে ছুটিতে বাড়ি এসেছি, বাবা হাজার বলেও পড়তে বসাতে পারেনি কোনোদিন। আমার কাছে ছুটিতে পড়তে বসাটা খুব ভুল কাজ মনে হতো। ছুটি মানে শুধুই ছবি আঁকা, গল্পের বই পড়া আর মায়ের হাতের ঘন শুকনো ক্ষীর, বাগানের ঢেড়শ ভাজা বাটি বাটি উড়িয়ে দেওয়া আর তার ফলে মাঝেমাঝেই ডাক্তার বাড়ি ছোটা। তা যা বলছিলাম — সেইসব গরমের রাতে খাটে বসেই থালাটা হয় একটা চেয়ারে নয় কোলে রেখে রাতের খাবার খেতাম।(রাতের খাবার বলতে রুটি আর লোহার কড়াইতে রাঁধা কালোপানা ঢেঁড়শ বেগুনের তরকারি, কিন্তু খেতে এত ভাল যে সে স্বাদ আমি আজ ও আমার রান্নায় আনতে পারিনি, কখনো কখনো আবার রুটি তরকারির সাথে ডিম ভাজাও পেতাম)। তারপর শুয়ে শুয়ে আকাশের তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে ভয় করত, ভয়গুলো সব নাম না জানা, কিসের ভয় বুঝতাম না, তবু বেশিরভাগ সময়ই খুব ভালো লাগত। কখনো কখনো দেখতাম একটা তারা খসে পড়ল। আসলে তারা না, ছোট ছোট উল্কা।

মা আমাদের শিখিয়েছিল উল্কা খসে পড়তে দেখলেই ‘দুগগা, দুগগা’ বলতে। বড় হয়ে জেনেছিলাম উল্কা এক ধরনের পাথর যা মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে এসে পড়ে। এর থেকে যাতে কোনো ক্ষতি না হ্য় পৃথিবীর তাই বোধহয় এই ঠাকুরের নাম করা।

খুব ভোর ভোর উঠতে হত গরমের দিনে। আকাশে থাকত সাদাটে মরা চাঁদ। সত্যি সত্যি মরা নয় রে। ভোরের আলো ফুটতে থাকায় চাঁদ আর তেমন চকচক করত না এই আর কি! আর চৌকিদাররা ভারে জল তুলে দিয়ে, আমাদের খাট বিছানা ঘরে দিয়ে যেত। আজ এই অবধি। আদর জেনো।

                                                            -দিম্মা

আনাই,

লিখেছিস মেল পড়ে তোরও খুব ইচ্ছে হচ্ছে অমন খোলা আকাশের নীচে তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়তে। আসলে কি জানিস বিহারের জল-হাওয়া এত শুকনো ছিল যে রাতে বাইরে শুলে ঠাণ্ডা লাগার ভয় থাকত না। তাও আমরা মশারি নিতাম যাতে গায়ে হিম না লাগে। তবে তুমি যদি কোনোদিনও ক্যাম্পে যাও তাঁবুর ফাঁক দিয়েও তারা দেখতে পাবে — দেখো সেও অন্য একরকম ভালো লাগবে। বিদেশে তো অনেক বাড়িতে আকাশ দেখার জন্য ছাদের কিছুটা বড় চৌকোনো কাচে ঢাকা থাকে। আমার আবার ইচ্ছে করে অমন বাড়িতে থাকতে।
                                                            -দিম্মা

আনাই

বিজলি বাতি (ইলেকট্রিক আলো) তো আমাদের ছিলোই না, গ্যাস ওভেনও যে হতে পারে আমরা তখনো ভাবতে পারিনি। এমন কি প্রেশার কুকারও ছিলো না। একটা মাটির উনানে দুটো মুখ থাকত, পিছনের খোলা মুখ ছিল একটু বড়, তাতে বসত ভাত আর সামনের ছোট মুখটাতে ডাল। ইচ্ছেমত কাঠ গুঁজে বা বার করে দিয়ে আঁচ কমানো বাড়ানো যেত। আবার ডাল-ভাত হতে হতে সামনের ফাঁকে (যেখানটায় কাঠ গুঁজে দিতে হয়) বেগুন পোড়াও হ’ত, আর শীতের দিনে আমাদের হাত –পা সেঁকাও চলত উনানের পাশে বসে দল বেঁধে। আজ আর একটা কথা মনে পড়ছে। মা বেশীরভাগ সময় কাঁচা মুগ মুসুরির ডাল বসাত। একবারো না ধুয়ে একটু কাঁচা সরষের তেল মেখে জল ফুটলে দিয়ে দিত। কোনোদিনও আমাদের মনে হয় নি ডালে পেস্টিসাইড (পোকা মারা ওষুধ) মাখানো থাকতে পারে, আমাদের শরীরও খারাপ হয়নি সেই ডাল খেয়ে। অবশ্য এমন হতে পারে যে তখনকার সময় এত পেস্টিসাইডের চল ছিল না। তেল মেখে ডাল চড়ানোর কারণটা এই সেদিন মাকে জিগেস করেছিলাম, তা বোঝাতে মা একটা গ্রাম্য হিন্দি কথা ব্যবহার করেছিল, চল্লিশ বছর বিহারে কাটানোর ফল আর কি। বলেছিল যাতে ডাল ‘উধলিয়ে’(উপছে পড়া) না পড়ে তার জন্য তেল মেখে বসানো। মা এই ধরনের ডাল রান্না শিখেছিল বিহারীদের কাছে। ডাল খানিক সিদ্ধ হলে তাতে কাঠের ডাল ঘোটনি দুহাতে ধরে ঘুরিয়ে দিত। সব শেষে লোহার ইয়া বড় এক হাতায় রসুন পাঁচফোড়ন আর শুকনো লঙ্কা গরম তেলে সম্বর দিয়ে ডালের হাঁড়ির ঢাকা একটু তুলে গরম হাতা তাতে চালান হ’ত, খুব জোরে ছ্যা কল কল আওয়াজ হ’ত আর এমন একটা সুগন্ধ ছড়াতো যে মনে হ’ত ছুট্টে গিয়ে চান সেরেই ভাত খাই তক্ষুনি।
                                                            -দিম্মা

স্নেহের
                  আনু ভাইটু,

কাঠের উনানের কথা লিখেছি আগের মেলে। তার থেকেই মনে এল চৌকিদারদের কথা। দূর গ্রাম থেকে ওরা আসত থানায় হাজিরা দিতে আর আমাদের বাড়ির সব কাজ করে দিয়ে যেত-কাঠ কাটা, গরুকে জাবনা দেওয়া। শীতের দিনে মশা তাড়াতে গরুর গোয়ালে ধোঁওয়া দেওয়া। (তোমার মনে হতেই পারে জাবনা কি, তাই তো? জাবনা হ’ল ছোট ছোট করে কাটা খড়, বিহারে যাকে বলে ‘কুটি’, ছোলার দানা ভাঙ্গা ও গুড় জলের সাথে মাখা গরুর খাবার। বলা হ’ত গুড় দিলে গরুর দুধ মিষ্টি হয়)। চৌকিদারদের পোশাক বলতে ছিল গাঢ় ছাই রঙের শার্ট, খাটো ধুতি, মাথায় পাগড়ি আর হাতে লাঠি। ছোটো বেলায় ভাবতাম, আজো ভাবি আনু, ওরা বোধহয় ভয় পেত থানার বড় কর্তাদের। তাই আমাদের বাড়ির এইসব কাজ করত, এসব কাজ তো ওদের করার কথা নয়। আসলে বোধ হয় পুলিশ সাহেবকে সাধারণ মানুষ চিরকালই ভয় পেয়ে এসেছে, সেদিনও পেত। আর চৌকিদাররা তো গ্রামের সরল লোকই ছিল। এখন অবশ্য আর একটা কথা মনে হ’চ্ছে- ওরা আবার গ্রামে ফিরে গিয়ে আর পাঁচজনকে চোখ রাঙাতো নাতো?
                                                            -দিম্মা

স্নেহের আনাই,

যদিও আগে লিখেছি যে বিহারের সব বাড়িগুলোই এক ধরনের তবুও লাতেহারের রান্নাঘরটা আজো বেশি করে মনে পড়ে। সে ঘরটা ছিল একেবারে কালিঝুলি মাখা আর খুবই অন্যরকম। কাঠের আঁচে রান্না হতো বলে উনানের দিকের দেওয়ালটা ছিল পুরোটাই কালো আর বাকি তিন দিক কালচে এলা মাটি (কমলাটে হলুদ) রঙের। ঘরের আকারও ছিল মজার। একদিকের দেওয়ালটা ছিল বেশ উঁচু, যেমন সব ঘরের হয় তেমন আর কি, আর অন্য দিকেরটা খুব নীচু, তুই দাঁড়ালে তোর মাথাও ঠেকে যাবে চালে। সেই দেওয়ালে ছিল একটা বড় জানলা। জানলার ধারে বসে দেখতে পেতাম দূ-উরে পাহাড়ের সারি — রোদে ও মেঘের ছায়ায় তাদের রং পাল্টাতো খুব —কখনো ঘন সবুজ, কখনো হাল্কা কচি কলাপাতা আবার কখনো বেগুনি। সেই পাহাড়গুলো আমার খুব আঁকতে ইচ্ছা করত কিন্তু হয়ে ওঠে নি। এমন ইচ্ছে ফেলে না রেখে পূরণ করে ফেলাই ভাল রে আনু। আদর জেনো।
                                                            -দিম্মা





আনুবাবু,
আগের মেলে লাতেহারের সেই কালো ঝুপসি রান্নাঘরের কথা লিখেছিলাম। এবার আর একটা মজার কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়িতে সব সময়ই হাঁস-মুরগি পোষা হত ডিমের জন্য, এখনকার মত পোলট্রির ব্যাপার ছিল না। তা যখন আমরা সেই লাতেহারে ছিলাম, তখন আমাদের সব মিলিয়ে সাতটা রোড আইল্যান্ড মুরগি ছিল। এই মুরগিগুলো লালচে খয়েরী রঙের হয় আর যেগুলো লেগহর্ন সেগুলো হয় সাদা। আমার মা যখনই কূয়োতলায় যেত পুজোর ফুল তুলতে সাত সাতটা মুরগি সার বেঁধে মার পিছন পিছন যেত, একটুও ভয় পেত না। কি আজব ব্যাপার তাই না! আসলে সকাল-বিকাল মা ওদের দেখা শোনা করত, যাতে ওরা ঠিকমত দানা পায়, ওদের খাঁচা পরিষ্কার থাকে আর সন্ধ্যেবেলা চরে ঠিক ঠিক ঘরে ফিরে আসে। তাই বোধ হয় ওরা আমার মাকে চিনে নিয়েছিল।
                                                            -দিম্মা





আনাই,
              
আজ তোকে বগেরীওয়ালার গল্প বলব। বগেরী হ’ল খুব ছোট একধরনের পাখি, অনেকটা ঠিক চড়াই পাখির মত দেখতে। বগেরী বোধহয় বিহারেই পাওয়া যায়, কোলকাতা বা পশ্চিম বাংলার যে সব জায়গায় আমি থেকেছি ও নাম শুনিনি। শীতকালে যখন ধানক্ষেতে ধান খেতে আসে বগেরী পাখিরা, বগেরীওয়ালা তখন তাদের ফাঁদ পেতে ধরে। এই যে ছবিতে দেখছ ডালপালা দিয়ে তৈরী একটা পাখা বগেরীওয়ালার মাথায়, সেটার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে ও আর পাখিরা ফাঁদে পড়লে তাদের এই চ্যাপ্টা ঝাঁকায় পুরে পাতার পাখাটা মাথায় ধরে বগেরী বিক্রী করে ফেরে। তবে মজার কথা এই যে বগেরী যদি তুমি কেনো (খেতে খুবই সুস্বাদু)বগেরীওয়ালারা দুভাবে পাখি বানিয়ে দেবে। যদি বগেরীওয়ালা হয় হিন্দু তাহলে একসাথে অনেক পাখিদের জলে চুবিয়ে মারবে শ্বাস রোধ করে আর যদি মুসলমান হয় মারবে ছুরি দিয়ে। আনাই, সেদিনও মনে হত আজো মনে হয় কি লোভী আমরা! খাওয়ার লোভে কত নিষ্ঠুরই না হ’তে পারি। আজো কানে বাজে মরার আগে পাখিগুলোর কিচকিচ চুঁইচুঁই আওয়াজ, তার থেকে ওদের উড়িয়ে দিলেই ভাল হ’ত, কি বল আনু! তবে আমাদের শাস্তি বোধহয় এটাই যে একই সাথে আমরা লোভ, নিষ্ঠুরতা আর কষ্ট তিনটেই বুঝতে পারি মনে মনে। আজ এই অবধি, ভাল থেকো সোনা আমার।
                                                            -দিম্মা





স্নেহের আনাই,
আমাদের মনগুলো বোধহয় জলে ভাসা পাতার মত। কখনো জলের টানে আগে এগোয় আবার হাওয়া লেগে পিছিয়েও যায়। তাই তোকে বিহারের গল্প বলতে কখনো কখনো আগের কথা পরে বলেছি। কোনটা আগে হয়েছিল কোনটা পরে মনে রাখতে ইচ্ছে হচ্ছে না। বগেরীপাখির কথা আগে লিখেছি এবার মনে পড়ল নীলকণ্ঠ পাখির গল্প। বিহারে দুগগা পুজোর দশমীর দিন বাড়ি বাড়ি নীলকন্ঠ পাখি দেখানো হ’ত। গ্রামেরই কোন একজন একটা নীলকণ্ঠ পাখি থলেতে পুরে এনে আমাদের দেখাত আর বলত নীলকণ্ঠ কৈলাসে উড়ে গিয়ে শিব ঠাকুরকে খবর দিয়ে আসবে মা দুগগা বাপের বাড়ি থেকে ফিরছেন। সত্যি মিথ্যে যাচাই করার ইচ্ছে হয়নি কখনো। থানায় বাবার টেবিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বেশ লাগত ভাবতে নীলকণ্ঠ পাখির কৈলাসে ক্যুরিয়ারগিরি করাটা।

আনু এই মেলে তোকে আর একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। সেদিন টিভিতে ঠিক পুজোর আগে আগেই বোধহয়, একজন পক্ষীবিদ এই দশমীর দিন নীলকণ্ঠ দেখানো নিয়ে আলোচনা করছিলেন, উনি বলছিলেন যেসব নীলকণ্ঠদের ধরা হয় তাদের পরে ছেড়ে দিলেও বেশীরভাগ সময়ই ওরা বাঁচে না। আমরা না জেনে কত সময় কত ভুল করে ফেলি তাই না আনু।

                                                            -দিম্মা





আনাই,
তুই লিখেছিস নীলকণ্ঠ পাখির গল্প তোর খুব ভাল লেগেছে কিন্তু নীলকণ্ঠ পাখি দেখিসনি কখনো। যখন ভারতবর্ষে আসবি দেখাবার চেষ্টা করব। বা যদি একটা ছবি পাই তোকে নিশ্চয় নিশ্চয় পাঠাচ্ছি।

এবার আমার ছোটোবেলাকার একটা খেলার কথা লিখছি। তখন আমার বয়স বোধহয় ছয়-সাত বা তারও কম, চাঁদের সাথে ছুটত খুব-খুউব মজা লাগত। যেই ছুটতাম মনে হ’ত চাঁদও আমার সাথে ছুটছে যেই থামতাম সেও থামত। এ ব্যাপারটা আমার মনকে এত নাড়া দিত যে বাবাকে ছুটে ও থেমে দেখিয়েছিলাম চাঁদ আমার সাথে হাঁটে, ছোটে ও থামে। বাবা কিছু না বলে মুখ টিপে হেসেছিল। এত বয়সে এই সেদিনও সন্ধ্যেবেলা হাঁটতে বেরিয়ে মনে হ’ল দেখি তো চাঁদের সাথে হেঁটে কেমন লাগে! সেই ছোটবেলার আনন্দই পেলাম। তুইও ইচ্ছে হ’লে চাঁদমামার সাথে ছুটে জানাস তোর কেমন লাগল।

আনু্‌, এই চাঁদের সাথে ছোটাটা অনেক পুরনো দিনের কথা, আমার ছোটবেলাকার কথা। কিন্তু জানিস, এই কিছুদিন আগে প্রফেসর স্মুট নামে একজন নামী বৈজ্ঞানিক আমাদের আই, আই, টিতে লেকচার দিতে এসে এই চাঁদের সাথে ছোটার কথা বলেছিলেন, যা নাকি ওঁরও ছোটোবেলায় মনে হ’ত। তারপর উনি বুঝিয়ে বলেন কেন এমন মনে হয় আমাদের। দ্যাখ এই বোঝাটা এ বয়সে তোর জন্য কঠিনই, কিন্তু এর যে একটা কারণ আছে তাই জানাতেই এ কথা লেখা। দেখছি খুব সহজ করে তোমাকে বোঝাতে পারি কিনা।

                                                            -দিম্মা

পুনঃ- চাঁদ আমাদের পৃথিবী থেকে প্রায় ২৩৯,০০০ মাইল দূরে আছে। এতদূরে থাকার জন্য আমরা যে কোণ (এঙ্গেল) থেকে চাঁদকে দেখি সেই কোণ এত অল্প বদলায় যে আমাদের মনে হয় চাঁদ আমাদের সাথেই ছোটে, হাঁটে, দাঁড়িয়ে পড়ে। তবে একটা কথা কি জানিস, এই কারণ জানার পরও, সত্যি বলছি চাঁদের সাথে ছোটার আনন্দ আমার এতটুকু কমবে বলে মনে হয় না।

                                                            -দিম্মা







(পরবাস-৬১, ডিসেম্বর ২০১৫)




(এর পরে)