[an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive]

|| সন্ধ্যা – ৫ ||

ইভাবে এ বাড়িতে সন্ধ্যার কাজ শুরু হয়ে গেল। বলতে গেলে ওর চব্বিশ ঘণ্টাই কাটতে লাগল চন্দনের সঙ্গে। মাঝে মাঝে খালি নিজের ঘরে ঢোকা। জামাকাপড় বদলে নেবার জন্যে--বা ছোটখাট কোন কাজের জন্য। ও এখন চন্দনকে পারতপক্ষে চোখের আড়াল করে না। প্রথম দু-একদিন চন্দন একটু আপত্তিকর ভাব দেখিয়েছিল--সন্ধ্যা ওকে ভয় দেখিয়ে ধমক দিয়ে ওর এই প্রতিরোধ ভেঙে দিয়েছে। তারপর চন্দন নিজেকে দিব্যি মানিয়ে নিয়েছে এই নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে— ওকে সন্ধ্যার কথা শুনে চলতে হবে। সন্ধ্যাও চন্দনের সঙ্গে কয়েকদিন কাটিয়েই ওকে কিছুটা বুঝে নিয়েছে। চন্দনকে সারাবার জন্য আসল দরকার ওর মনের ভেতর ঢোকা। ওর মনের কোণে কোণে লুকিয়ে আছে ছোট ছোট সব অন্ধকার ঘর--সেগুলো সব তালাবন্ধ করা। ওকে সুস্থ করে তুলতে গেলে ঐ ঘরগুলো খুঁজে বার করতে হবে, সেগুলোর তালা খুলতে হবে, পরিষ্কার করতে হবে সেগুলোর ভেতরের জমাট ময়লা। সন্ধ্যার জানা নেই কিভাবে তা করা যাবে। তবে চন্দনের সঙ্গে কথা বলতে হবে, ওকে দিয়েও কথা বলাতে হবে। তাছাড়া ওর বয়েসটা বেড়েছে দিন মাস বছরের হিসেবে--এই অসুখটা তো আসলে ওকে একটা বাচ্চা ছেলের মত করে রেখেছে। সেজন্যে সন্ধ্যাকেও ফিরে যেতে হবে ওর নিজের ছোটবেলায়, তবেই ও চন্দনকে দিয়ে কথা বলাতে পারবে। সন্ধ্যা চন্দনের কথা শোনে, ওর ভাষায় শকার বকারের ব্যবহার একটু বেশি; সন্ধ্যা আদরের ধমক দেয়--চন্দনের কথা শুধ্‌রে দিয়ে আবার বলায়। নিজে ওর ছোটবেলার কথা বলে। সে দেশের সেই বিশাল উদার মাঠে হু হু হাওয়ায় ভেতর সঙ্গীদের সাথে দৌড়, রাস্তার পাশে বহুদূর লম্বা পাটক্ষেতের মধ্যে লুকোচুরি খেলা, পুকুরে বা খালে ঝাঁপিয়ে পড়ে জল তোলপাড় করে সাঁতার কাটা। কিন্তু ও যত্ন করে লুকিয়ে রাখে ও কি করে ওর দেশ থেকে কলকাতায় এল, কোথায় থাকে, কি করে--সেসব কথা। চন্দন অপ্রকৃতিস্থ হলেও যথেষ্ট বুদ্ধিমান--ও সন্ধ্যাকে জিজ্ঞেস করে এসব কথা। তুমি কে, কোথা থেকে এসেছ তুমি, কে তোমাকে আমার কাছে পাঠিয়েছে ? সন্ধ্যা হেসে অনেক প্রশ্ন পাশ কাটায় - অনেক প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চন্দনকে ভুলিয়ে দেয় অন্য কথায়। কিন্তু মাঝে মাঝে চন্দনের মনে পড়ে যায় - তখন সে আবার একই প্রশ্ন করে। সন্ধ্যাকে তখন কোন একটা নতুন কায়দা বার করে চন্দনের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিয়ে হয়। যদিও একথা ভেবে ওর ভাল লাগে যে চন্দনের বুদ্ধির শৃঙ্খলা দানা বাঁধছে - যা ওর সুস্থ হয়ে ওঠার জন্যে অত্যন্ত জরুরী।

চন্দনের সঙ্গে চব্বিশ ঘণ্টা ওঠাবসার জন্যে আজকাল সন্ধ্যা নিজের মদ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে - একটা গেলাসে অল্প একটু ঢেলে নিয়ে সোডা মিশিয়ে খেয়ে নেয়। চন্দনের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তরে সন্ধ্যা বলেছে যে ওর শরীরে রক্ত কম আছে - ডাক্তার সেজন্যে খুব অল্প করে এ জিনিস রোজ খেতে বলেছে। চন্দন অবিশ্বাস করেনি। ও খুব অল্পবয়েস থেকেই ওর বাবাকে মদ খেতে দেখেছে। মদের মধ্যে ওষুধের গুণ আছে এটা ওকে বোঝানো সহজ - বিশেষ করে ওর মন যেহেতু এখনও অপরিণত।

এক একদিন চন্দন দুপুরবেলাও ঘুমিয়ে পড়ে। বেশ কয়েকঘণ্টার গাঢ় ঘুম। ও ঘুমোলে সন্ধ্যা খুশিই হয়। ওর এটুকু জানা আছে যে এই অসুখে গভীর ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটা ওষুধ - শরীর, মস্তিষ্ক, স্নায়ুর বিশ্রামের জন্য দরকারি। চন্দন ঘুমোলে সে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে সন্ধ্যা বেরিয়ে আসে - লাইব্রেরিতে এসে বসে। ও জানে যে এ বাড়ির ভৃত্যসম্প্রদায় সব সময় ওৎ পেতে আছে চন্দনের ঘরের বন্ধ দরজার আড়ালে কি ঘটছে তা জানবার জন্যে - জানতে পারছে না বলে নানারকম সম্ভব এবং অসম্ভব ব্যাপার ঘটে চলেছে বলে অনুমান করছে - আর সে সব গালগল্প ফুলে ফেঁপে ওদের মধ্যে ছড়াচ্ছে। রমা তো সন্ধ্যার ওপর একটু অভিমানই করেছে। ও খুব আশা করেছিল চন্দনের যা চিকিৎসা চলছে সন্ধ্যা তার বিশদ বর্ণনা ওকে দেবে - দুজনে মিলে খুব হেসে হেসে রসিয়ে রসিয়ে তার আলাপ করবে। প্রথম দু একদিন সন্ধ্যা লাইব্রেরিতে এসে বসলে রমা এসে ওকে চেপে ধরেছিল। সব কথা খুঁটিয়ে জানতে চেয়েছিল। সন্ধ্যা খালি হাসল আর প্রশ্নগুলো পাশ কাটিয়ে গেল দেখে ও অত্যন্ত ক্ষুদ্ধ হয়েছিল। এখন আর ও সন্ধ্যার কাছে কিছু জানতে চায় না। মাগি থাকুক ওর নিজের দেমাক নিয়ে।

লাইব্রেরির বইভর্তি কাঁচের আলমারিগুলোতে আগে চাবি দেওয়া থাকত। প্রথম দিন সন্ধ্যা এসে আলমারিগুলো চাবিবন্ধ দেখে রামুকে বলেছিল ওগুলো চাবি খুলে রাখতে। অন্তত: যে কটা দিন সন্ধ্যা এখানে আছে। রামু সঙ্গে সঙ্গে কথাটা সূর্যশেখরের কানে তোলে। এ বাড়ির একটা অলিখিত আইন - লাইব্রেরিতে কোন কিছু করতে গেলে আগে সূর্যশেখরের অনুমতি নিতে হবে। তার কারণ গৃহকর্তা এই বইগুলোকে ভালবাসেন - যে কেউ এই বইগুলোতে হাত দিক সেটা তিনি চান না। রামু প্রায় নিশ্চিত ছিল যে সাহেব মানা করে দেবেন - হয়তো রেগেও যাবেন - রামুকে দু একটা চড় থাপ্পড় কষিয়ে দেবেন। ও খুবই অবাক হয়ে গেল যখন সাহেব রাজী হয়ে গেলেন। আসলে সন্ধ্যা বই পড়তে চায় শুনে সূর্যশেখর খানিকটা কৌতুক বোধ করেছিলেন। একটা বাজারের মেয়ে সূর্যশেখরের লাইব্রেরির বই পড়তে চায় - এতো দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ। সূর্যশেখর মনে মনে এটাও ভেবে নিলেন যে সুযোগ সুবিধে মতো একদিন মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করবেন ও কি বই পড়ল আর পড়ে কি বুঝল।

লাইব্রেরিতে বই দেখতে গিয়ে সন্ধ্যার দিশেহারা অবস্থা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ও বই দেখার একটা উপায় বার করল। ও আলমারির পাল্লার কাঁচের ভেতর দিয়ে বইগুলোর নাম আর লেখকের নাম পড়ে - কোন একটা পছন্দ হলে সেটাকে ভেতর থেকে টেনে বার করে আনে - পাতা উল্টেপাল্টে দেখে। পছন্দ না হলে ওটাকে আবার তার জায়গার গর্তে ঢুকিয়ে দেয় - আর একটাকে বার করে। পছন্দ হয়ে গেলে সেটাকে নিয়ে এসে ঘরের সোফায় বসে - কখনো তার শুরুর থেকে পড়ে - কখনো আবার মাঝখানের কোন পরিচ্ছেদ খুলে পড়ে। কিছুটা পড়ে বিরক্তি লাগলে বা ঝিমুনি এলে বই তার জায়গামতো রেখে দিয়ে চন্দনের ঘরে ফিরে যায়।

সেদিন দুপুরে সন্ধ্যা লাইব্রেরিতে বসে একটা বই নিয়ে পড়ছিল। সূর্যশেখর তখন সবে তার অফিসবাড়ি থেকে ফেরৎ এসেছেন। তার মেজাজটা ভাল ছিল। সেদিনই খবর এসেছে - দক্ষিণের জমিদারিতে একটা মামলায় তিনি জিতে গেছেন। অবশ্য হারলেও সেটা হত তার কাছে একটা ছোট পিঁপড়ের কামড়ের মত। আর জিতেও যে তার বিরাট কিছু লাভ হয়েছে তা নয়। তবুও জয়ের আনন্দ সব সময়েই মধুর - সে জিত যতই ছোট হোক না কেন।

লাইব্রেরির খোলা দরজা দিয়ে তিনি সন্ধ্যাকে দেখতে পেলেন। সন্ধ্যা সোফায় বসে আছে - ওর সামনে টেবিলে একটা মোটা বই পাতা খোলা অবস্থায় টেবিলের ওপর রাখা। সূর্যশেখর কৌতূহলী হয়ে পড়লেন - কি বই পড়ছে মেয়েটা। হাল্কা মেজাজে ছিলেন বলে কৌতূহলটা একটু বেশিই হয়েছিল। তিনি ঘরে ঢুকলেন - সন্ধ্যা তার দিকে বোবা চোখে তাকিয়ে রইল - ওর মুখে একটা হাল্কা হাসি মাখানো। সূর্যশেখর বুঝলেন যে মেয়েটা যদিও তার দিকে তাকিয়ে আছে, আসলে তাকে দেখছে না - অন্য কিছু ভাবছে। তিনি বইটা টেবিলের ওপর থেকে তুলে দেখলেন আর আশ্চর্য হয়ে গেলেন। মেয়েটা এই বই পড়ছে - নিদেনপক্ষে দেখছে। বইটা দেশভাগের ওপরে লেখা - যে পাতাটা সন্ধ্যার সামনে খোলা ছিল তাতে বর্ণনা ছিল কিভাবে ঘরছাড়া মানুষ নতুন আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়েছে। দু সারি মানুষ চলেছে দুটো বিপরীত দিকে - পশ্চিম থেকে পূবে আর পূব থেকে পশ্চিমে। মানুষগুলোর হাতে, কোলে, কাঁধে, মাথায় রয়েছে বাচ্চা ছেলেমেয়ে, পোঁটলা, তোরঙ্গ, ছোটখাট বাড়ির জিনিষ। দুটো সারির মধ্যে দূরত্ব অনেক - একটার থেকে অন্যটাকে দেখাচ্ছে প্রায় পিঁপড়ে বা পোকামাকড়ের সারির মত। সূর্যশেখর সন্ধ্যাকে জিজ্ঞেস করলেন সন্ধ্যা বইটা পুরো পড়েছে কিনা। সন্ধ্যা জবাব দিল না। ওর মনে পড়ে গিয়েছিল অনেক বছর আগের কথা - সারি দিয়ে অনেক মানুষের সঙ্গে নতুন দেশের উদ্দেশ্যে পথ হাঁটা। তারপরই ওর মন চলে গিয়েছিল ঐ বইয়ে পড়া মানুষগুলোর কাছে - তাদের সারিতে মিলে গিয়েছিল সন্ধ্যা। ওর ঠিক পাশে একটি গ্রাম্য মেয়ে - বয়েস কুড়ি থেকে পঁচিশ যা কিছু হতে পারে। পরনের জামাকাপড় নোংরা, মাথার চুলে ধুলো পড়ে জট, বুকের জামা খুলে একহাতে কোলের বাচ্চাকে চিমসে, বসে যাওয়া বুকের ওপর ধরে রেখে তাকে স্তন দিচ্ছে, অন্যহাতে মাথার উপরে একটা বড় ভারী পোঁটলা ধরে রেখেছে। ওর মরদটা হাঁটছে এক কদম আগে - ডান হাতে একটা ছোট তোরঙ্গ, বাঁ হাত দিয়ে মাথার ওপর আর একটা পুঁটলি ধরা। সন্ধ্যার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। যুগে যুগে, দেশে দেশে, লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘর ছেড়ে পথে বেরিয়েছে - বিজাতীয় শত্রুর আক্রমণে, দুর্ভিক্ষে, দুর্দান্ত জমিদার তাদের জমি কেড়ে নেওয়াতে - অনেক দু:খের পথ পেরিয়েছে তারা। সন্ধ্যা তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিশে যায় - ঐ দেহাতি মেয়েটির ঘর ছাড়ার দু:খ ভাগ করে নেয় - তার সন্তানের খিদে মেটানোর যে আনন্দ তাও যেন নিজের শরীরের ভেতর টের পায়। সূর্যশেখর আবার প্রশ্নটা করলেন - একটু বিরক্ত এবং রাগতভাবে - কারণ তার কথা কেউ শুনছে না এরকম কোন পরিস্থিতির সঙ্গে তিনি কখনো মুখোমুখি হননি। আর এই মেয়েটা সস্তা একটা বহুভোগ্যা মেয়ে - সে কিনা তাকে এরকম অবহেলা করছে। এবার সন্ধ্যা ফিরে এল কলকাতা শহরে - এই ধনী ভূস্বামীটির বাড়িতে - একটি মধুর হাসি এবং কটাক্ষ উপহার দিল গৃহস্বামীকে আর জবাব দিল তার প্রশ্নের। না, সন্ধ্যা পুরো বইটা পড়েনি। কিছু কিছু পরিচ্ছেদ পড়েছে - যেগুলো ওর ভাল লেগেছে। সূর্যশেখর বই টেবিলের ওপর রেখে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সন্ধ্যা কি বই পড়ল তা নিয়ে ওর সঙ্গে আলোচনা করার উৎসাহ তার আর নেই। মামলায় জেতার আনন্দটাও হঠাৎ কিরকম জোলো হয়ে গিয়েছে। বইয়ের আলমারিগুলো আবার চাবিবন্ধ করার হুকুম দেবেন কিনা সেটা ভাবছিলেন সূর্যশেখর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ও ভাবনা বাদ দিলেন। থাক - আর তো কয়েকটা দিন। দেখতে দেখতে কেটে যাবে।

সন্ধ্যা পেছন থেকে সূর্যশেখরকে দেখছিল আর মিটি মিটি হাসছিল। ও বুঝেছে যে সূর্যশেখর চটেছেন - কারণ তার প্রভুত্বের অভিমানে ঘা লেগেছে। সন্ধ্যা একটা শয়তানি মেশানো মজা টের পাচ্ছিল - স্কুলে দুষ্টু পড়ুয়া ছেলে শিক্ষককে চটিয়ে দিয়ে যেরকম মজা পায় অনেকটা সেই রকম। মজাটা একটু বেশি এই কারণে যে সূর্যশেখর এখন বেকায়দায় আছেন - দুম করে সন্ধ্যাকে বাড়ি থেকে তাড়াতে পারছেন না। যতক্ষণ গৃহকর্তাকে পেছন থেকে দেখা গেল ততক্ষণ সন্ধ্যা মুখে ঐ হাসিটা মেখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উঠল। বই আলমারিতে তার জায়গায় রেখে দিল। ও বই সবসময় গুছিয়ে রাখে - ছোটবেলা থেকেই এটা ওর অভ্যেস।

লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এল সন্ধ্যা। চন্দনের ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে দিল। চন্দন অঘোরে ঘুমোচ্ছে - শান্তির ঘুম - বুকটা ধীরে ধীরে উঠছে আর নামছে। খুব অল্প একটু ঘামের আভাস ওর কপালে, নাকের নিচে গোঁফের জায়গায়। সন্ধ্যা নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে খুব সন্তর্পণে তা মুছে নিল - ছেলেটার ঘুম না ভেঙে যায়। ওর দাড়িগোঁফ আবার একটু বড় বড় দেখাচ্ছে - কাল এসব কাটাবার ব্যবস্থা করতে হবে। গত যেদিন ওকে কামানো হয়েছিল ও বিশেষ ছটফট করেনি। খালি এক একবার নাপিতের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পাশে বসা সন্ধ্যার দিকে তাকাচ্ছিল - আবার ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা হয়ে বসে চুপচাপ তার নাপিতকে তার কাজ করতে দিচ্ছিল। ছেলেটার মুখ এখনও কচি - দেখে বড় মায়া হয়। আলতো করে চন্দনের কপালে একটা চুমু খেল সন্ধ্যা। তারপর ঘরের দেয়ালে লাগানো ঘন্টি বাজাল। সময়মত মনে করিয়ে না দিলে রামু প্রায়ই বিকেলের জলখাবার দিতে দেরি করে। তাছাড়া পরপর কদিন ধরে একই জলখাবার দিচ্ছে - সেই লুচি আর আলুর তরকারি। চন্দন পরোটা খেতে ভালবাসে - সন্ধ্যা সেটা দেখেছে। আজ জলখাবারে ওকে আলুর পরোটা খাওয়াবে সন্ধ্যা - প্রচুর কাঁচা লংকা আর পেঁয়াজ কুচি দেওয়া - হরিকে ডেকে পাঠিয়ে ঐ পরোটা কি করে বানাতে হবে তা বলে দেবে। রামু এখনও আসছে না - আবার ঘণ্টি বাজাল সন্ধ্যা। এবার একটু বেশিক্ষণ ধরে। এইবার ও আসবে - হন্তদন্ত হওয়ার ভাব করে। সন্ধ্যা জানে ওর হুকুম চালানো রামুর পছন্দ হয় না - মুখটা একটু গোঁজ করে থাকে। আজ ওকে হাল্কা গোছের ধমক দেবে সন্ধ্যা - তাহলে রামু আবার কিছুদিন ঠিকঠাক থাকবে।

|| সূর্যশেখর - ২ ||

রাতে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছিলেন সূর্যশেখর। ঘুম আসছে না কিছুতেই।

এমন নয় যে নতুন জায়গায় এসেছেন। এটা মার্গারেটের ফ্ল্যাট - মার্গারেট এখানে তার মাকে নিয়ে থাকে। ভাড়াটা অবশ্য সূর্যশেখরই দিয়ে থাকেন। বলতে গেলে আজ বহু বছর ধরে সূর্যশেখর নিজের বাড়িতে রাতে থাকার চাইতে এই ফ্ল্যাটে, মার্গারেটের এই বিছানায় রাত কাটাতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু এখন ঘুম আসছে না। খালি আজ রাতে নয় - বেশ কদিন ধরেই এরকম হচ্ছে।

সূর্যশেখর পাশ ফিরলেন। পাশে মার্গারেট শুয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। প্রচুর পরিমাণে মদ্যপান আর রতিক্রিয়ার পর ও আর চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে পারে না। এখন মার্গারেট সূর্যশেখরের দিকে পাশ ফিরে শোয় - ওর পরনে একটা প্রায় স্বচ্ছ ফিনফিনে নাইটি - তার ভেতর দিয়ে ঘরের নাইট ল্যাম্পের অতি মৃদু আলোয় ওর চামড়ার লালচে সাদা রং ফুটে বেরোচ্ছে - ওর ভরাট কোমল এবং ঈষৎ নম্র স্তন এখন নুয়ে পড়ে বিছানার গদি ছুঁয়েছে। সেক্স ডল একটা। তবে এই পুতুল কথা বলে - খাবার টেবিলে বসে প্রচুর পরিমাণে খায় - শরীরের খেলাতেও অংশ নেয়। ঘরে একটা আরামদায়ক ঠাণ্ডা - এ ঘরে এসি চালু করা আছে। এসি আর নাইটল্যাম্পের হাল্কা আলো - এ দুটো ছাড়া সূর্যশেখর ঘুমোতে পারেন না। কিন্তু এখন সূর্যশেখরের সঙ্গে ঘুম লুকোচুরি খেলছে। হয়তো সে আসবে আরও অনেক পরে - সূর্য ওঠার ঠিক আগে - কয়েকঘন্টা থেকে আবার চলে যাবে।

সূর্যশেখর বিছানা ছেড়ে উঠলেন। ছেড়ে রাখা পাজামাটা পরে নিয়ে সিল্কের দামী ড্রেসিং গাউনটা গায়ে জড়িয়ে নিলেন। এসিটা বন্ধ করে দিয়ে দরজা খুলে ঘরের লাগোয়া ঝুলবারান্দাটায় বেরোলেন। এসি বন্ধ হওয়াতে মার্গারেট জেগে যাবে সে সম্ভাবনা নেই। ওর ঘুম খুব গাঢ়। তাছাড়া ঘরটা যথেষ্ট ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে আর ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যানটাও চালু আছে। এই মাঝরাতে একটু ফুরফুরে হাওয়ায়ও ছেড়েছে। মার্গারেটের ফ্ল্যাটটা যথেষ্ট উঁচুতে। ছ তলার ওপর। কাজেই হাওয়া আসতে কোন বাধা নেই। এ বিল্ডিংটা পুরনো হলেও তাতে একটা সাবেকি ধরনের লিফট রয়েছে - বুড়ো লিফটম্যানটা এই ফ্ল্যাটে রাত কাটাতে আসা সাহেবকে খুব খাতির করে। কারণ সাহেবের থেকে সে মুঠো মুঠো বকশিস পেয়ে থাকে। যেহেতু ফ্ল্যাটটা উঁচুতে, এ বিল্ডিং-এ লিফট না থাকলে সূর্যশেখর এখানে তার রাখেলকে রাখার ব্যবস্থা করবেন না।

সূর্যশেখর ঝুলবারান্দার রেলিং-এ কনুই-এর ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়ালেন - তারপর একটা সিগারেট ধরালেন। দামী বিলিতি সিগারেট আর লাইটার - দুটোই তার ড্রেসিং গাউনের পকেটে থাকে। চাঁদ দেরি করে আকাশে উঠেছে - চেহারাটা একটা মোটাসোটা কাস্তের মত। তার কয়েকটা প্রজা কাস্তে পার্টিতে মিটিং মিছিলে যাচ্ছে - সূর্যশেখর খবর পেয়েছেন। সূর্যশেখরের লোক নিয়মিত ওদের খবর তাকে যুগিয়ে যাচ্ছে। ওরা যদি জমিদারিতে কোন গোলমাল পাকায় তাহলে সেখানকার ম্যানেজারের কাছে গোপন নির্দেশ চলে যাবে ওদের পিত্তি বার করে ছেড়ে দেবার জন্যে। রাত একেবারে ঝাঁঝাঁ করছে - অনেক নিচে রাস্তার ফুটপাথে ঠেলাওয়ালা, রিকশাওয়ালা আরামে ঘুমোচ্ছে - ওদের কাছে কয়েকটা কুকুরও কুণ্ডলি পাকিয়ে মুখটাকে সামনের দুই থাবার মধ্যে রেখে ঘুমোচ্ছে। সুর্যশেখর অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন - মুখ ঘুরিয়ে ঘরের ভেতর বিছানায় শোয়া মার্গারেটের দিকে তাকালেন। চাঁদটা তরতর করে ওপরে উঠছে - বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে আলো করে দিয়েছে মার্গারেটের শোবার ঘর। সূর্যশেখর বিছানায় মার্গারেটকে দেখতে পেলেন না। সে জায়গায় রয়েছে একটি শ্যামাঙ্গী যুবতী ধারালো চোখ মুখ - পিঠময় খোলা কালো চুল - সবে ঘুম ভেঙে কনুইতে ভর দিয়ে উঠে বিছানায় কাৎ হয়ে আধশোয়া অবস্থায় আছে - যেমন তেমন করে গায়ে জড়ানো শাড়িটা উঠে গেছে হাঁটুর অনেকটা ওপরে - বেরিয়ে পড়ছে মেদহীন সুগঠিত আকর্ষণীয় দুই পা - শাড়ির আঁচল অবিন্যস্ত হওয়ায় দেখা দিতে চাইছে তার অবিনয়ে উদ্ধত যৌবন।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সূর্যশেখর ঘরের দিকে থেকে চোখ সরিয়ে আবার রাস্তার দিকে তাকালেন। তার বোধহয় এখন কিছুদিন ঘুমের ওষুধ খাওয়ার দরকার। কিন্তু তাহলেই তাকে অনিরুদ্ধর সঙ্গে কথা বলতে হবে - একগাদা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। তাতে আবার অনিরুদ্ধ কেঁচো খুঁড়তে কি সাপ বার করবে কে জানে। আর অনিরুদ্ধকে বাদ দিয়ে অন্য কোনও ডাক্তার ডাকার প্রশ্নই ওঠে না। অন্য ডাক্তার এলেও অনিরুদ্ধ তাকে ডাকবে - সূর্যশেখর নয়। আসলে এই ডাক্তার বদ্দির ব্যাপারটায় সূর্যশেখর চূড়ান্তভাবে বন্ধুর ওপর নির্ভর করে থাকেন। এটা একটা স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে - এই বয়সে সূর্যশেখরের পক্ষে তা পাল্টানো সম্ভব নয়।

সূর্যশেখর মার্গারেটের কাছে খবরটা ভাঙলেন পরের দিন নাস্তার টেবিলে। সারাদিনের মধ্যে সূর্যশেখরের এই খাওয়াটা সবচেয়ে ভারি। সেদ্ধ ডিম, জ্যাম এবং মাখন দেওয়া পাঁউরুটির টোস্ট - সেই সঙ্গে লুচি আর আলুর তরকারি - কলা এবং আপেল। সূর্যশেখর স্বাস্থ্যবান এবং বলিষ্ঠ পুরুষ - তাকে ডায়েবেটিস, অম্লরোগ বা উচ্চ রক্তচাপ - কোনটাই আক্রমণ করতে পারেনি। কাজেই তার খাওয়ার পরিমাণ তার দস্যুনেতা পূর্বপুরুষের মতই প্রচুর। মার্গারেট খাবার টেবিলে বসেছিল - ও রোজই সূর্যশেখরের খাওয়ার সময়টায় বসে - নিজের হাতে প্রেমিককে পরিবেষণ করে। ও সূর্যশেখরের কথা শুনে ঠোঁট ফোলাল। সূর্যশেখর কলকাতার বাইরে যাবেন - সে কতদিনের জন্যে? মার্গারেটের একা থাকতে কষ্ট হবে না বুঝি?

কিন্তু সূর্যশেখরের ভালোই জানা আছে যে মার্গারেটের এই ঠোঁট ফোলানোটা কৃত্রিম। ও বরং খুশিই হবে সূর্যশেখর না থাকায় কিছুদিন ছুটি পেলে। ওর খালি একটাই ভয় - সূর্যশেখর আবার অন্য কোন মেয়েমানুষ নিয়ে বেড়াতে না চলে যান। তবে সূর্যশেখর সেটা করলেও মার্গারেটের পক্ষে তা আটকানো সম্ভব নয়। সূর্যশেখর ফিরে এলে ও প্রেমিকের কাছে কান্নাকাটি করতে পারে - সূর্যশেখরের মন যাতে আবার ওর দিকে ঘুরে যায়। তার চাইতে বেশি কিছু নয়।

প্ল্যানটা সূর্যশেখর ঠিক করেছেন গত রাতেই। তিনি তার জমিদারি দেখতে বেরোবেন। ঘুমের ওষুধ আপাতত খাওয়া হচ্ছে না ঠিকই কিন্তু একটা বড় চেঞ্জ তো হবে। তা ছাড়া বিষয়সম্পত্তি মাঝেমাঝে নিজেরই দেখাশোনা করা দরকার। তা না-হলে ম্যানেজার, নায়েব - এরা সব চুরির মাত্রা বাড়িয়ে দেবে। চুরি একেবারে আটকানো তো সম্ভব নয় - একটা রাশ টানা থাকবে। এই যে নীলমাধব - বর্ধমানের ওদিকে কোথায় ওর দেশ - ব্যাটা তো সেখানে প্রচুর জমি জায়গা করেছে। ওকে সূর্যশেখর সঙ্গে নেবেন না। ও কলকাতায় থেকে সন্ধ্যার কাজকর্মের ওপর নজর রাখবে আর সূর্যশেখরকে খবর পাঠাবে। সূর্যশেখর প্রথমে যাবেন তার নদীয়া জেলার জমিদারিতে। তার পূর্বপুরুষরা প্রচুর জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে জমিদারি করে রেখে গেছেন। উত্তরবঙ্গেও জমিদারি রয়েছে - আছে বেশ কয়েকটা চা-বাগান। এখন ওসব জায়গায় যাওয়া এক ঝকমারি - সোজা ট্রেন রাস্তা নেই। গঙ্গা পার হবার জন্যে নামতে হয় ট্রেন থেকে। দেশভাগের আগে কোন অসুবিধে ছিল না। ট্রেনে উঠে সোজা চলে যাওয়া যেত উত্তরবঙ্গে। নদীয়ার জমিদারিতে যাওয়ার জন্যে একটা সুবিধে আছে - সোজা গাড়ির রাস্তা রয়েছে। গাড়ি নিয়েই চলে যাবেন সেখানে।

পরের দিন সূর্যশেখর ওখানে পৌঁছুলেন - তখন বিকেল হয়ে এসেছে। এখানকার বাড়িটা প্রকাণ্ড বড়। যেহেতু এখানকার জমিদারি সবচেয়ে বড় - হয়তো সে কারণেই এই জমিদারির আয়তনের আনুপাতিক। সূর্যশেখরের পূর্বপুরুষদের প্রথম জায়দাদ এখানেই ছিল - বাকিগুলো তার পরে পরে বংশের সম্পদ বাড়বার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে। এখানকার ম্যানেজার বিধুভূষণ সরকার মনিবের আসার খবর পেয়েছিল নীলমাধবের পাঠানো টেলিগ্রামে - জমিদারবাড়িতে এসে কর্তার গাড়ি পৌঁছে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। সূর্যশেখরের গাড়ি থামল বাড়ির হাতার ভেতরে ঢুকে - মূল বাড়িটার সদর দরজার সামনে। ড্রাইভার প্রভুদয়াল গাড়ি থেকে নেমে পড়ে দৌড়ে এসে পেছনে বসা সূর্যশেখরীর সীটের পাশের দরজা খুলে ধরল। সেসময় সে ভাবছিল কলকাতার বাড়িতে রমার কথা - রমা এখন বেশ কিছুদিন খালি ঐ শালা হরির ভোগে লাগবে।

সূর্যশেখর গাড়ি থেকে নামলেন। বিধুভূষণ কোমর ভাঁজ করে নিচু হয়ে কর্তার জুতো ছুঁয়ে হাত কপালে ছোঁয়াল। ওর সঙ্গে কয়েকজন অধস্তন কর্মচারিও এসেছে - তারা দণ্ডবৎ করেই আছে - মাথা আর তুলছে না। বিধু বলল, এতকাল আমাদের ভুলে ছিলেন সাহেব - আপনি মাঝে মাঝে দর্শন না দিলে আমরা বাঁচি কি করে?

বিধু তোষামোদটা ভালই করতে পারে। তার অবশ্য দরকারও আছে। সূর্যশেখর ভাল মেজাজে থাকলে কোন অসুবিধে নেই, কিন্তু রাগলে একেবারে চণ্ডভৈরব। কাজেই বিধু কর্তাকে বিরক্ত হওয়ারই কোন সুযোগ দেয় না - রাগ করতে দেওয়া তো দূরের কথা।

সূর্যশেখর একটু হাসলেন। তিনি জানেন সব ম্যানেজার আর নায়েবদের মধ্যে বিধুর চুরির সুযোগটা সবচেয়ে বেশি, আর সেই সুযোগ বিধু পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে থাকে। তবে তারা চুরিই করুক আর যাই করুক সূর্যশেখর তার কর্মচারিদের কমবেশি স্নেহ করেন। এরা তার প্রজাদের থেকে আলাদা - সূর্যশেখরের নিজস্ব জমিদারি প্রতিষ্ঠানের একটা অংশ। মুখে বললেন, তোমরা সব ভাল আছ?

বিধু আর একবার মাটির কাছাকাছি নুয়ে পড়ল। বলল, এই, আপনার দয়ায় আছি একরকম।
তারপর আবার বলল, মহেশ ভটচায আপনার সঙ্গে দেখা করবে বলে অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে।

ততক্ষণে বাড়ির সব চাকরবাকর বেরিয়ে এসেছে কর্তাকে অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে যাবার জন্যে। এ কাজে তারা খুব পোক্ত। বছরভর তারা খালি পড়ে-থাকা জমিদারবাড়িতে মজা করে - জমিদারির পয়সায় ভালমন্দ খায় দায়। কয়েকজন আবার দেশের বাড়িতে পরিবার রয়েছে বলে গ্রামের কোন দু:স্থ পরিবারের বৌ বা মেয়েকে রাখেল করে নিয়েছে। কিন্তু বছরে একবার কি দু'বার যখন কর্তা দেখা দেন তখন তারা তাকে বিদেশী রাষ্ট্রনায়কের সম্মান দেখায়, সেবাটাও সেই অনুপাতে করে। তারা জানে কর্তা মিলিটারি নিয়মনিষ্ঠা পছন্দ করেন। তার বিন্দুমাত্র এদিক ওদিক হলে নেমে আসতে পারে বরখাস্তের খাঁড়া। মহেশ ভট্টাচার্যও বেরিয়ে এসেছে তাদের সঙ্গে। তার পরনে ধুতি, ফতুয়া, উত্তরীয়, প্রকাণ্ড লম্বা আর মোটা পৈতে, পায়ে খড়ম। সে এখানকার কালীমন্দিরের প্রধান পূজারী। মন্দিরের সব খরচা জোগায় জমিদারি সেরেস্তা - মহেশ একটা মোটা অঙ্কের মাসোহারা পেয়ে থাকে। প্রণামি থেকে মন্দিরের যা রোজগার তা জমিদারি তহবিলে যাওয়ার কথা। সবটা যায় না - একটা মোটা অংশ যায় বিধুর পকেটে। সূর্যশেখর ব্যাপারটা জানেন কিন্তু এ নিয়ে মাথা ঘামান না। ছোট চুরির টিকা যদি বড় চুরির রোগকে আটকে রাখে তাহলে তা মন্দ কি?

মন্দির বহু পুরনো। সূর্যশেখরের অতি বৃদ্ধ সব পূর্বপুরুষ এই মন্দিরে দেবী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেবীকে পূজো দিয়ে তবে তারা ডাকাতি করতে বেরোতেন - দেবীর দয়ায় তাদের মানুষ খুনের পাপ লাগত না। এখন এখানে ফি অমাবস্যায় বড় করে পুজো হয় - কালীপুজোর দিন তো গাদা গাদা পাঁঠা বলি হয়। দেবী নাকি এখানে খুবই জাগ্রত। তবে প্রজারাই বিভিন্ন মানত করে এসব বলি দেয় - জমিদারবাড়ি থেকে কোনও জীব বলি হয় না। নেহাত দরকার না হলে সূর্যশেখর জীবহিংসা করেন না। আর দরকার হলে সেটা বেশ ভালভাবেই করে থাকেন।

একবার এক অমাবস্যাতে সূর্যশেখর মার্গারেটকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন। মার্গারেট যদিও ক্রীশ্চান, হিন্দু ধর্মের দেবদেবীদের পুজো করতেও তার আপত্তি নেই। সব গাছেই জল দেওয়া উচিৎ - কোন একটা গাছ তাহলে নিশ্চয়ই ফল দেবে। আর ওর চাহিদাও তো খুব বেশি নয় - ওর মোটা মাইনের রাখেলের চাকরিটা যেন বজায় থাকে। এই ছোট একটা ইচ্ছে শীতলা, ঘেঁটু গাছের ছোট দেবীও পূরণ করতে সক্ষম - কালী তো অনেক বড়মাপের দেবী। রাতে পূজো হয়ে যাবার পর ভূমিষ্ঠ হয়ে দেবীকে প্রণাম করেছিল মার্গারেট আর মহেশকে দিয়েছিল একটা একশো টাকার নোট। ব্রাহ্মণ তাতে বড়ই খুশি হয়েছিল আর দেবীর কাছে এই প্রায় শ্বেতাঙ্গিনীর মঙ্গলের জন্যে একাগ্রমনে প্রার্থনা করেছিল। তবে ভূমিষ্ঠ হবার সময় মার্গারেটের ভারি এবং বিশাল নিতম্ব বড় বিশিষ্টভাবে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। যদিও তখন জমিদারের লোকজন মন্দির থেকে সাধারণ আমজনতাকে মন্দিরের বাইরে বার করে দিয়েছিল, তবু সূর্যশেখর মার্গারেটকে ঐ অবস্থায় দেখে একটু অস্বস্তি বোধ করেছিলেন। মার্গারেটের শরীরটা একেবারে তার নিজস্ব - এই অধিকারবোধটা হঠাৎ তাকে মানসিকভাবে একটা খোঁচা মেরেছিল। ধনু সর্দারও সে সময় মন্দিরে ছিল। মার্গারেট উঠে দাঁড়ালে সে তার পায়ের ধুলো নিয়ে বলেছিল, আমাদের ধলা – মা বড়ই ভক্তিমতী।

মহেশ কর্তাকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল না। জমিদারবাড়ির আরাধ্যা দেবীর প্রধান পুরোহিতের পক্ষে সেটা বেমানান। হাতজোড় করে সূর্যশেখরকে বলল, আজ রাতে দয়া করে আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো দেবেন। রাতে আমার ওখানেই খাবেন।

এতটা পথ গাড়িতে এসে একটু ক্লান্তি বোধ করছিলেন সূর্যশেখর। তিনি বললেন, একটু ক্লান্ত আছি - আজ হয়তো আর হবে না। কাল দুপুরে যাব আপনার ওখানে।

মহেশ আবার হাত জোড় করল। বলল, আজ্ঞে, রান্না করা হচ্ছে আপনার জন্যে। বাড়ির সবাই আশা করে আছে আপনার দর্শন পাবে বলে।

সূর্যশেখর আর কথা বাড়তে দিলেন না। আচ্ছা দেখি, শরীরটা ঠিক থাকলে আপনার ওখানে যাব - বলে তাড়াতাড়ি বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন তিনি।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়ে এসেছে। চারপাশে ঘোর ঘোর অন্ধকার। গ্রামটাতে বিদ্যুৎ নেই। এখানে তিনটে বাড়িতে জেনারেটর চলে। জমিদারবাড়িতে একটা বড় জেনারেটর – মালিকের শোয়ার ঘর, স্নানের ঘর, বসার ঘর, খাওয়ার ঘর, বাড়ির হাতায় ঢোকার দেউড়ি - এসব জায়গায় আলো হয়, ঘরে ঘরে পাখা চলে, স্নানের ঘরে গীজার আর মালিকের শোবার ঘরে এসিও চলে। আরও দুটো জায়গায় জেনারেটর চালিয়ে আলো হয় - মহেশ ভট্টাচার্য আর বিধুভূষণের বাড়িতে। জমিদারি সেরেস্তা মহেশকে জেনারেটর কেনার টাকা ধার হিসেবে দিয়েছিল। সে টাকা সুদে বেড়েই চলেছে - এখন পর্যন্ত একটা টাকাও শোধ হয়নি। জেনারেটর চালানোর তেলটা মহেশকে সেরেস্তা থেকেই দেয়া হয় - ওর মধ্যে কোন টাকা পয়সার হিসেব নেই।

গরম জলে স্নান করে চা জলখাবার খেলেন সূর্যশেখর। নামে জলখাবার হলেও পরিমাণে ভালই ছিল। সূর্যশেখরের খিদেও পেয়েছিল - দুপুরটা রাস্তাতেই কেটেছে, সেখানে সূর্যশেখরের বসে খাওয়ার উপযুক্ত কোন হোটেল বা ধাবা নেই। ঝাল ঝাল পুর দেওয়া সিঙ্গাড়া আর ডিমের কচুরি। কাশীটার বয়েস হয়ে গেছে, কিন্তু রান্নাটা এখনও ভাল করে। ওর নাম কাশীনাথ হালদার, কিন্তু পুরো নামটা বেশিরভাগ লোকই ভুলে গেছে - সূর্যশেখরও সময়ে সময়ে মনে করতে পারেন না। ওর বাপ ছিল ভূমিহীন চাষা - বালক কাশী বাপকে ক্ষেতের কাজে সাহায্য করত। কাশীকে সূর্যশেখরের বাবার পছন্দ হয়ে যায় - জমিদারবাড়িতে ওর জায়গা হয়। প্রথম প্রথম ও রান্নার ঠাকুরকে সাহায্য করত- তারপর সেই বুড়ো মরে গেলে ওর এ বাড়ির রান্নার ঠাকুরের পদে পুরোপুরি প্রমোশন হয়ে যায়। কাজ কোনদিনই খুব একটা ভারি নয়। তার কারণ মনিবেরা সাধারণত কলকাতাতেই থাকে। খুব মাঝে মাঝে এখানে বড় দল নিয়ে হল্লা করতে আসে - তখন কাশী নিজের সাহায্যের জন্যে ওর কোন চেনাজানা ঠাকুর জোগাড় করে আনে। মালিকের সমৃদ্ধি তার চাকর বাকরদেরও ছুঁয়ে যায় - কাশী তার ব্যতিক্রম নয়। নিজে বেশ দু পয়সা করেছে - ওর পরিমিত বুদ্ধিতে যতটুকু করা যায়। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে পাশের গাঁয়ে। জামাই সেখানে সম্পন্ন গৃহস্থ। কৃষ্ণনগর বাজারে নিজের দোকান আছে - বাসে চড়ে সেখানে গিয়ে ব্যবসা দেখাশোনা করে আসে। দোষের মধ্যে দোজবরে বলে বয়েসে একটু বড় - আর মাঝে মাঝে মদ খেয়ে আর জুয়া খেলে টাকা নষ্ট করে। যেদিন জুয়ায় হারে সেদিন বাড়ি এসে বৌকে কিছু চড়থাপ্পড় লাগায়। কাশীর মেয়ে যে তাতে খুব একটা দু:খ পায় তা নয়। পুরুষমানুষ জুয়ায় টাকা হেরে গেলে সেই রাগটা আর কি করে বার করবে - ঘরের মাগকে পেটানো ছাড়া? মারলে খুব একটা ব্যথাও লাগে না। মদ খেয়ে পা টলে - হাতের মারের খুব একটা জোর থাকে না। কাশীর মেয়ে দুহাত তুলে মুখটা বাঁচিয়ে রাখে বলে ওর বর যে কয়েক ঘা দেয় তা ঐ দুহাতের ওপরই পড়ে। তারপরই রতিক্রিয়া করে মানুষটা ঘুমিয়ে পড়ে। কাজেই কাশীর মেয়ে ভালই আছে। মানুষটা বয়েসে ছোট বৌকে রঙচঙে শাড়ি দেয়, সোনার গহনা দেয়। পুরুষমানুষের হাতে পয়সা হলে সে বাজারের মেয়েমানুষের পেছনে খরচা করে - কাশীর জামাই তো তা করে না। কাশীও জামাইয়ের ওপরে এ কারণে খুশিই আছে । ছোট ছেলেটাকে কাশী জমিদারবাড়িতে কাজে লাগিয়ে নিয়েছে। বিশ্বনাথ বা বিশু আঠেরো উনিশ বছরের ছোকরা - টিংটিং এ রোগা - বড়লোকের বাড়ির ভাল খাওয়াদাওয়াও ওর গায়ে গত্তি লাগাতে পারেনি। কিন্তু ছোকরা অত্যন্ত বুদ্ধিমান আর চটপটে - সে কারণে সূর্যশেখর এখানে এলে ও তার খাস বেয়ারা। মালিকের গরমজল, তার পরিষ্কার ধোপভাঙ্গা জামাকাপড়, তার বিছানা পাতা, মশারি লাগানো, মালিক যাতে স্নান করে বেরিয়েই পরিষ্কার চাদর পাতা টেবিলে তার পছন্দমত খাবার পেয়ে যান - এ সবেরই ব্যবস্থা করে বিশু। মালিক কি সিগারেট খেতে পছন্দ করেন সেটাও ওর জানা। এবারেও মালিক আসবে শুনেই ও সেই সিগারেট যথেষ্ট পরিমাণে আনিয়ে রেখেছে। দামী বিদেশী সিগারেট - কৃষ্ণনগর বাজারের একটা লোককে দিয়ে ও কলকাতা থেকে আনিয়েছে। দামটা ও পরে বিধুভূষণের কাছ থেকে নিয়ে নেবে। মালিক চলে গেলে উদ্বৃত্ত সিগারেটগুলো বিশু কৃষ্ণনগর বাজারের ঐ লোকটার হাত দিয়েই বিক্রি করে দেবে - তাতে যে টাকাটা পাবে সেটা অবশ্য বিধুভূষণকে ফেরৎ দেবে না।

বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে আলসেমি করছিলেন সূর্যশেখর। বিশু রাতে শোবার আগে মশারি টাঙিয়ে দেবে। অল্প অল্প গরম পড়েছে বলে এসি চালু করে দিয়ে গেছে। খাটের পাশে টিপয়ে রাখা ছাইদানিতে জ্বলন্ত সিগারেট - সেটার থেকে ধোঁয়া উঠছে প্রথমে সোজা সরলরেখায় - খানিকটা উঠে তা তাল পাকাচ্ছে - নানারকম আকৃতি নিচ্ছে। চিৎ হয়ে শুয়েছিলেন সূর্যশেখর - তার মাথায় ঘুরছিল নানা রকম চিন্তা। কাল বিধুভুষণ আর তার কর্মচারিরা আসবে - জমিদারির হিসেব দেখবেন তিনি। সব খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব নয় - মোটামুটি একটা আন্দাজ নিলেই চলবে। সুদের ব্যবসাটার অবস্থা দেখা দরকার - নইলে কর্মচারিরা ফাঁকি দেবে আর চুরির মাত্রা বাড়াবে। সূর্যশেখরের সেরেস্তা চুনোপুঁটিদের টাকা ধার দেয় না। ব্যাপারিরা টাকা নেয় - শতকরা দশ টাকা সুদ মাসে। এক কৃষ্ণনগর শহরের বাজারেই সূর্যশেখরের লাখ লাখ টাকা খাটছে। দৈনিক হিসেবে সুদের টাকা আদায় হয়ে যায় - তার জন্যে আলাদা লোক রয়েছে। বেশ কিছু প্রজা জমিদারের দাবিদাওয়া নিয়ে নালিশও করতে আসবে। অবশ্য ওরা বিধুর নামে কিছু বলবে না। তারা জলে বাস করে - কুমীরের সঙ্গে ঝগড়া করার মত নির্বোধ নয়। আর বিধু যখন তার আসল রূপ ধরে তখন সে জলের কুমীর আর ডাঙ্গার বাঘ, দুজনের চাইতেই ভয়ংকর। প্রজারা কান্নাকাটি করবে - পায়ে ধরার চেষ্টা করবে। আজও কয়েকজন এসেছিল - দারোয়ান আর চাকরবাকররা তাদের হাঁকিয়ে দিয়েছে। আজ মালিক সবে এসে পৌঁছেছেন - আজ দেখা হবে না। মহেশের কথাটা ঘুরে ফিরে মাথায় আসছে। রান্না করা হচ্ছে বাড়ির সবাই অপেক্ষা করে আছে। তার মানে সরমা রান্না করছে - সরমা সূর্যশেখরের জন্যে অপেক্ষা করে আছে! সূর্যশেখর মনে মনে হিসেব করলেন কতদিন সরমার সঙ্গ পাননি। সেই কালীপুজোর সময় এখানে এসেছিলেন - তারপর প্রায় চার পাঁচ মাস হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগে যখন অমাবস্যাতে মার্গারেটকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তখন সরমা পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছিল - সামনে আসেনি। সূর্যশেখরও একটু অস্বস্তি বোধ করছিলেন - মহেশের বাড়ি যাননি, ওদের নিজেদের বাড়িতেও ডেকে পাঠাতে পারেননি। সূর্যশেখরের মাথায় মার্গারেট আর সরমার তুলনা এল। সরমার মধ্যে একটি অত্যন্ত স্নেহময়ী নারী আছে - অন্তরঙ্গতার সময় সে সূর্যশেখরকে স্নেহ উজাড় করে দিয়ে থাকে। মার্গারেটের ভেতর ভালোবাসার উগ্রতা বেশি - স্নেহ জিনিসটা একটু কম। শারীরিকভাবে মার্গারেট অনেক কিছুই দাবি করে আদায় করে নেয়। সরমার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। সেই তের চোদ্দ বছর আগেকার কথা। রাতের বেলা মহেশ সরমাকে সূর্যশেখরেরই ঘোড়ার গাড়ির জানালা বন্ধ করে এ বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছিল। দেউড়ির দারোয়ানেরা দেখেছিল কর্তার কাছে মহেশ একটা ঘোমটা ঢাকা মেয়েমানুষ পৌঁছে দিল। পরের দিন ভোরে মেয়েমানুষটা ঘোমটা ঢাকা দিয়ে একই গাড়িতে ফেরৎ চলে গিয়েছিল। ব্যাপারটা চাপা থাকেনি - পুরো মহল্লার লোক কানাকানি হতে হতে জেনে গিয়েছিল যে জমিদার সাহেব মহেশের পরিবারকে নিজের বৌ বানিয়ে ফেলেছেন। তারপর আস্তে আস্তে লোকের চোখে ব্যাপারটা সয়ে গিয়েছে। সবাই এটা জানে - কেউ এ নিয়ে মাথা ঘামায় না।



(ক্রমশ)

[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]