[an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive] [an error occurred while processing this directive]
সন্ধ্যাবেলা
প্রথম পর্ব
১ | ২ | ৩ | ৪ |



সন্ধ্যা - ৩

কিন্তু সন্ধ্যার তো ওসব কোন কিছুর দরকার হয় না। মাসির বাড়ি আসার পরে পরেই ও সকালবেলা ওয়াক তুলতে শুরু করেছিল। এসব ব্যাপারে মাসি তৈরীই থাকে। পাড়ার হারান কবিরাজের থেকে ওষুধ এনে খাইয়ে দিয়েছিল সন্ধ্যাকে। টাক পড়া, গালভাঙা, চোখ গর্তে বসা হারান কবরেজ নিজেই এসব ওষুধ তৈরী করে — অনেকরকম গাছগাছড়ার শেকড়বাকড় গুঁড়ো করে মিলিয়ে মিশিয়ে সব বড়ি। বড়ি খাওয়ার তিনদিনের মাথায় রক্তে ভেসে গেল সন্ধ্যা। সেই সঙ্গে পেটে মোচড় দিয়ে দিয়ে ব্যথা। তার সাতদিনের দিন আবার ঝেড়ে ঝুড়ে উঠল। এ সব বড়ি কোন গাছের শেকড় দিয়ে বানায় তা হারান কাউকে বলে না। তবে বড়িতে কাজ হবেই হবে। সবচেয়ে বড় কথা হল বড়ি খেয়ে একবার গর্ভ নষ্ট হলে আর গর্ভ হয় না। পেটের ভেতরের সব যন্ত্র নড়েচড়ে যায়। কিন্তু আশার বেলায় ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। মাসি অবাক হয়ে গিয়েছিল — বাড়ির অন্য মেয়েরাও তাই। তবে অনেক পরে ঘটনাটা জানা গিয়েছিল। মাসি আশার হাতে ওষুধ দিয়েছিল — খাইয়ে দেয় নি। আর আশা সেই ওষুধ ফেলে দিয়েছিল। গর্ভপাত মানেই রক্তপাত — তাতে ওর বড় ভয়। মাসি ওকে বাপ মা চোদ্দপুরুষ তুলে কাঁচা খিস্তি করেছিল — বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবে বলেছিল। তখন আশার ভরা পেট — নদনদ করছে। মাসি অবশ্য শেষ পর্যন্ত ওকে তাড়ায়নি। শেষ ক মাস আশা রোজগার করতে পারে নি বলে ঘর ভাড়া দেয় নি। সেজন্যে বাচ্চাটা হয়ে যাওয়ার পরে পরেই ঘরভাড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে মাস সে লোকসানটা উশুল করে নিয়েছিল। দ্বিতীয়টার বেলায় আশা নিজেই বড়ি চেয়েছিল মাসির কাছে। মাসি দেয়নি। একবার একটা বাচ্চা হয়ে গেলে এই বড়ি আর দেয়া যায় না। হারান কবরেজ নিজেই বারণ করে। এত রক্ত পড়ে যে প্রসূতিকে বাঁচানো মুস্কিল হয়। তবে আশা নিজেই ব্যবস্থা করেছিল। ছেলেটা হয়ে যাবার পর পেটের ভেতরের নাড়ি কাটিয়ে এসেছিল। নিশ্চিন্ত ব্যবস্থা — আর বাচ্চা কাচ্চার ভয় নেই।

সেদিন সন্ধ্যার মনটা ভারী হাল্কা আর খোশ হয়েছিল। সূর্যশেখরের যোগান দেওয়া দামী বিলিতি হুইস্কি — সন্ধ্যা একটু বেশীই খেয়ে ফেলেছিল। ও রমা এ ঘরে কেন ঐ বড়ি নিয়ে এসেছে তাই শুনে ওর গলা জড়িয়ে ধরে হাসতে লাগল। আর হাসির ফাঁকে ফাঁকেই বলে ফেলল কেন ওর ওসব দরকার হয় না। রমা একটু ভয় পাচ্ছিল। মাগিটা বেশী রকম মাতলামি শুরু করে দেবে কিনা কে জানে। ওর দায়িত্ব বড়িটা সন্ধ্যাকে খাওয়ানো — সেটা না পারলে ওকে এ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়ার সম্ভাবনা আছে। অনেক বছর ধরে এ বাড়িতে আছে রমা — বড়লোকের বাড়িতে খাওয়া থাকায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। এখন যদি এ বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে হয় তাহলে সেটা একেবারে মাথায় বাজ পড়ার মত একটা ব্যাপার হবে। ও একটু ভয়ে ভয়েই সন্ধ্যাকে বলল, তবুও খাও ভাই। ডাক্তার সাহেবের হুকুম — তামিল করতেই হবে।

সন্ধ্যা তখনও নেশার হাসি হাসছিল। ও বিছানায় বসে পড়ে বলল, দাও ভাই, তুমিই খাইয়ে দাও।

রমা মনে মনে চটে যাচ্ছিল। মাগির যত সব ঢং। কিন্তু রাগ দেখালে চলবে না — গরজটা তো ওর। ও সন্ধ্যাকে জিজ্ঞেস করে সন্ধ্যার ঋতুর দিন তারিখ জেনে নিল। নিজের কর গুণে আর বড়ির পাতাটার ওপর আঙুল দিয়ে গুণে গুণে হিসেব করল। তারপর বলল, না, আজ নয়। তিনদিন পরের থেকে শুরু হবে। রোজ একটা করে।

রমা এসব বড়ির ব্যবহার সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। ও নিজে এই বড়ি নিয়মিত ব্যবহার করে থাকে। তার কারণ এ বাড়িরই দুটি পুরুষ চাকরের সঙ্গে তার শারীরিক প্রেমের সম্পর্ক আছে। একজন বাড়ির রান্নার ঠাকুর হরি, অন্যজন সাহেবের গাড়ির ড্রাইভার প্রভুদয়াল। ওরা রমার প্রেমে একেবারে হাবুডুবু খাচ্ছে। রমা কিন্তু হিসেবি। ও দুজনের কাউকেই বেশী বারতে দেয় না। খুব হিসেব করে নিজের দাক্ষিন্য দুজনের মধ্যে বেঁটে দেয়। গিন্নিমা মারা গেছেন প্রায় আট দশ বছর হল — তারপর থেকেই পুরুষ চাকরদের জিভ লকলক, একটু হাত ধরে টানা, একটুখানি গায়ে হাত। রমা বুঝেছিল ওরা বেশী জোর জবরদস্তি করার আগেই ওদের আটকানো দরকার। আর অনেক প্রেমিককে আটকাতে গেলে এক আধজন স্থায়ী প্রেমিকের দরকার। অনেক চিন্তা ভাবনা করে রমা এই দুজনকে বেছে নিয়েছে। এরা দুজনেই অবাঙালি - আর বাঙালিরা অবাঙালিদের বেশ সমীহ করে চলে, সেটা রমা লক্ষ্য করে দেখেছে। তাছাড়া এদের দুজনেরই দেশে বৌ ছেলেমেয়ে আছে — কাজেই কেউই বেশী বাড়াবাড়ি করবে না, বিয়েও করতে চাইবে না। বছর পঁচিশ বয়েস রমার — এক্ষুনি বিয়ে টিয়ে করে থিতু হওয়ার কোন মতলব নেই ওর। এ বাড়িতে চাকরি করে টাকা জমিয়ে বাপকে দিয়ে দেশে নিজের নামে কিছু জমি কিনেছে। সে জমিতে চাষের কাজ এখন বাপ দেখে — রমার টাকায় শুরু করা একটা কিরানা ব্যবসাও করে। চাষবাস, কিরানা ব্যবসা ভালই চলছে — রমার নামে পোস্ট অফিসে টাকা জমা পড়ছে। রমা মাঝে মাঝে নিজে গিয়ে পাস বইটা দেখে আসে। নিজের বাপকেও বেশী বিশ্বাস করতে নেই। আরও বছর কয়েক এভাবে চালিয়ে দেশে একটা মাঠকোঠা বাড়ি করবে। তখন বিয়ে করার কথাটা ভাবা যেতেও পারে। একটা শান্ত নিরীহ গোবেচারা গোছের লোক — যে রমার জমি জায়গার তদ্বির করবে আর রমার কথা শুনে চলবে। তবে এ বাড়ির কাজ, এই দুই প্রেমিক — এসব রমা ছাড়বে না। মাঝে মাঝে দেশে গিয়ে বিয়ে করা বরটাকে একটু সঙ্গ দিয়ে এলেই হবে।

পরদিন সকালে সন্ধ্যার রক্ত, থুতু, এসব নেওয়া হল। খালি পেটে — সকালে খাওয়ার আগে। ওর শরীর পরীক্ষাও হল। অনিরুদ্ধ এসেছিলেন। উনি নিজে কিছু করেন নি। সঙ্গে ছিল একজন মহিলা ডাক্তার আর একজন রক্ত, থুতু নেওয়ার লোক। শরীর পরীক্ষা ঐ মহিলা করলেন — পুরুষেরা তখন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সন্ধ্যার শরীর দেখলেন ঐ মহিলা। পরীক্ষা শেষ হবার পর জামা কাপড় পরতে পরতে সন্ধ্যা একটা দুষ্টুমির হাসি হেসে মহিলাকে জিজ্ঞেস করল, পরীক্ষায় পাশ করেছি কি?

মহিলা কোন উত্তর না দিয়ে খালি একটু অতি ক্ষীণ হাসি হাসলেন। সন্ধ্যার সঙ্গে এ বিষয়ে কোন কথা বলতে অনিরুদ্ধর বারণ ছিল। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন — হাই হীল জুতোর খট খট আওয়াজ দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল।

পরের দিন রমা খবর দিল। নাও ভাই — সব পরীক্ষায় পাশ করেছ। আর দুদিন পরে ঐ বড়িও খাওয়া শুরু হবে। ব্যস — তা হলেই তো পুরো হয়ে গেল।

একটা ছোট্ট হাসি দিল রমা। হাসিতে একটা ইঙ্গিত রয়েছে। ও একটা অতি সূক্ষ্ম ঈর্ষা অনুভব করছিল। তার ওপর এই ব্যাপারে একটা খোঁচাও খেয়েছে। ওর ড্রাইভার প্রেমিকটি রসিক। সে নিজের গোঁফ চুমড়ে রমাকে বলেছে, এ কিরে, তুই থাকতে এ কাজের জন্যে একটা বাইরের রেণ্ডীর দরকার পড়ল? তাই শুনে রমা নিজের পায়ের চটি খুলে প্রেমিককে ছুঁড়ে মারে এবং প্রেমিক দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। কিন্তু এই খোঁচাটা রমার গায়ে বেশ লেগেছে — কারণ ও নিজেকে সন্ধ্যার জায়গায় মাঝে মাঝে কল্পনায় বসাচ্ছিল, আর তাতে একটা অত্যন্ত গোপন সুখ পাচ্ছিল। তবে রমা খুব ভালই জানত যে ওই দায়িত্ব ওর ওপর আসা একেবারেই অসম্ভব ছিল। সূর্যশেখর কখনই বাড়ির ভেতরের কোন লোককে এ কাজ দেবেন না — বাড়ির কাজের লোকজনদের কোনভাবেই মালিকপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে দেবেন না। তাছাড়া ডাক্তার সাহেব যতক্ষণ দরকার মনে করবেন খালি ততক্ষণই এই মেয়েমানুষটা এ বাড়িতে থাকবে। রমার বেলায় তো তা হবে না। উপরন্তু রমা চন্দনকে ভয় পায় — ওর ধারে কাছেও যায় না। বুড়ো চাকর রামু চন্দনের সব কাজ করে — চন্দনের সব মারধর ওই খায়। কাজেই রমাও বুঝেছিল যে ওর এই কল্পনা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং সেজন্যে অবান্তর।

কিন্তু রমা মেয়েমানুষ — তার অসূয়া কোনরকম যুক্তি মানে না — খুব সূক্ষ্ম হলেও মনের ভেতর থেকে যায় — সেজন্যে তার ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসিটাও লেগে থাকে। সন্ধ্যা ওর কথা শুনল, হাসিটাও দেখল। নিজের জায়গায়, অর্থাৎ মাসির বাড়িতে অন্য কোন মেয়ে এরকম বাঁকা বিদ্রুপের হাসি দিয়ে কথা বললে ও হয়তো রেগে যেত — শকার বকারের কুৎসিৎ গালাগাল দিয়ে চেঁচিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিত। কিন্তু এখন ও নিজেকে ঠাণ্ডা রাখল। এ বাড়িতে ও এসেছে ব্যবসা করে টাকা রোজগার করতে — ও এখানে কোনভাবেই মাথা গরম করবে না। তাছাড়া ও দেখেছে যে এ বাড়িটা মোটামুটি রমার খবরদারিতেই চলে। অবশ্য চন্দনের দেখাশোনাটা রামু করে। কিন্তু রামুকেও কি করতে হবে তা বলে দেয় রমা। এই দুদিনে রমার সঙ্গে সন্ধ্যার অল্পসল্প ঘনিষ্ঠতা হয়েছে। সন্ধ্যা ঠিক করে নিল যে এই ঘনিষ্ঠতা ও আরও বাড়াবে — রমার সঙ্গে ভালরকম ভাব করে নেবে। এ বাড়িতে ও যতদিন থাকবে ততদিনই ওর রমাকে দরকার হবে — সে এক হপ্তাই হোক বা কয়েকমাসই হোক। একটা ভারি মিষ্টি হাসি দিল সন্ধ্যা। রমার হাত ধরে টেনে ওকে নিজের বিছানায় বসিয়ে বলল, একটু বসো না ভাই, গল্প করি।

পতিতাবৃত্তি করে সন্ধ্যা অভিনয়ে পাকা হয়ে গেছে। ও কিছুক্ষণের মধ্যেই রমার ভেতর যেটুকু বরফ ছিল তা গলিয়ে ফেলল। ও জানে যে বেশ্যাদের চালচলন, তাদের বাবুদের নিয়ে কারবার — এসব জানবার একটা উদগ্র আগ্রহ থাকে বাইরের জগতের লোকদের — বিশেষ করে মেয়েদের। ও নিজের পতিতা জীবনের দু একতা ঘটনা রমাকে বলল — বলল হীরালালের কথা। রমা এসব শুনে মনে মনে একটা সুড়সুড়ি টের পাচ্ছিল। তাতে করে সন্ধ্যাও জেনে ফেলল রমার গোপন জীবনের খবর — বিছানায় তার দুই প্রেমিকের ব্যবহারের তুলনামূলক বিচার। আর এ সব কথাবার্তা চলার সময় দুই যুবতী প্রায় প্রায়ই হেসে উঠছিল — সময়ে সময়ে হাসির চোটে সন্ধ্যার বিছানায় গড়িয়ে পড়ে লুটোপুটি খাচ্ছিল। রাতে খাওয়ার সময় সন্ধ্যা রমার খাবারটাও নিজের ঘরে আনিয়ে নিল — ভাগ করে দুজনে একসঙ্গে খেল। সন্ধ্যা এখন এ বাড়িতে অতিথি - সেজন্যে ওর জন্যে বরাদ্দ মালিকপক্ষের জন্যে নির্দিষ্ট খাবার। বাড়ির কাজের লোকেরা অত কিছু পায় না — সেটা রমাই কড়া নজরে রাখে। আজ রমা বাবুদের খাবারের ভাগ পেয়ে বড় খুশি হয়ে গেল — কাজেই রাতে যখন ও ঘুমোতে গেল তখন ও সন্ধ্যার ঘনিষ্ঠ সখী হয়ে গেছে। সে রাতে বাড়ির রান্নার লোক হরিকে রমার সময় দেয়া ছিল। ও বড্ড বেশী ভাল ব্যবহার করল পাচকটির সঙ্গে। শারীরিক খেলাধূলো শেষ হয়ে যাবার পর রমা যখন ওকে ঘর থেকে বার করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল সে একটা কথা ভাবতে ভাবতে নিজের ঘরে গেল — আজ রমার হঠাৎ এত ভাল ব্যবহারের কারণ কি?

পরের দিন রমা সন্ধ্যাকে বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাল। অনেকগুলো ঘর। চন্দনের ঘরটা ঠিক সন্ধ্যার ঘরের পাশে। সন্ধ্যার ইচ্ছে ছিল ঘরের ভেতর উঁকি দিয়ে দেখবার, কিন্তু ঘরের দরজা বন্ধ। পোষাকি বসার ঘরটা বিরাট। সন্ধ্যাকে প্রথমে নিয়ে এসে এ ঘরে আনা হয় নি — অন্য একটা ছোট ঘরে বসানো হয়েছিল। এ ঘরটা বোধহয় সূর্যশেখরের সমগোত্রীয় লোকেদের জন্যে। ঘরের একটা দেয়ালে পরলোকগতা গৃহিনী সুনয়নী দেবীর আবক্ষ ছবির ওপর তাজা ফুলের মালা — সুন্দরী মহিলাটি দৃপ্ত ভঙ্গীতে তাকিয়ে আছেন — যেন এখনই দেয়াল থেকে নেমে এসে বাড়ির লোকজনদের তাদের কাজের গাফিলতীর জন্যে ধমক দেবেন। সূর্যশেখর বাড়ি নেই। তার কলকাতারই অন্য একটা বাড়িতে একটা দপ্তর রয়েছে — নীলমাধব আর কিছু অধস্তন কর্মচারী সেখানে মূলতঃ আদায় তসিলের হিসেবপত্রের কাজ করে। গৃহকর্তা প্রায়ই নিজে সেখানে গিয়ে কাজ দেখাশোনা করেন — আজও সেখানে গেছেন। সূর্যশেখরের শোবার ঘরটাও রমা দেখাল সন্ধ্যাকে। দামী আসবাবে সাজানো ঘর — লাগোয়া বাথরুমের দরজা অবশ্য বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করা। এ ঘরেও মৃতা গৃহকর্ত্রীর মালা পরানো একই ছবি টাঙানো আছে। রোজই তাজা ফুলের মালা বাড়িতে আসে — রমাই ছবিগুলোতে রোজ মালা পরায়। বাড়ি দেখাতে দেখাতে রমা সন্ধ্যাকে অনেক খবর দিল। গিন্নীমার মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। অন্ততঃ কাজের লোকজন তাই কানাকানি করে। সূর্যশেখর বাইরের মেয়েমানুষের কাছে রাত কাটাতেন — সেজন্যে গিন্নীমা বিষ খেয়েছিলেন। সাহেবের প্রচুর চেনা জানা - সেজন্যে থানা পুলিসের ঝামেলা হয়নি। ডাক্তার সাহেব লিখে দিয়েছিলেন হার্টফেল কেস। অবশ্য সব কিছু চাপা দেয়ার জন্যে সাহেব কত টাকা ঢেলেছিলেন তা রমার জানা নেই। হরি পুরনো লোক - ও বলে এক লাখ। ড্রাইভার প্রভুদয়াল বলে পাঁচ লাখ। মনে হয় ও বাড়িয়ে বলে — ওর স্বভাবই হচ্ছে সবকিছু বাড়িয়ে বলা। মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলা হল — খুব ঘটা করে শ্রাদ্ধ হল। ম্যারাপ বাঁধা হল — টেবিল বেঞ্চি পেতে প্রচুর লোক খাওয়ানো হল। সব চুকে গেল। সাহেব আবার বাইরে রাত কাটাতে শুরু করলেন।

বলতে বলতে হি হি করে হেসে উঠল রমা। তারপর বলল, সাহেবের সঙ্গে একবার একটা মেয়েছেলে এ বাড়িতে এসেছিল। মেয়েটা অ্যাংলো। লাল মুখ - ফ্রক না স্কার্ট কি একটা পরা। দারুণ চেহারা - দারুণ দেখতে। সাহেবের পছন্দ আছে - তারিফ করতে হয়।

সন্ধ্যা মুখে একটা আলগা কৃত্রিম হাসি মেখে রমার কথা শুনছিল। ওর হাসি পাওয়ার কোন কারণ নেই। ও তো নিজেই একটা এ জাতীয় মেয়েছেলে। সূর্যশেখরের মত বিভিন্ন লোক বাড়িতে বৌকে ফেলে রেখে ওর কাছে রাত কাটিয়ে যায়। কাজেই এই প্রসঙ্গটাতে ও একটু অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করছিল। রমার অবশ্য দোষ নেই। ও এখন ওর সখীর কাছে প্রাণ খুলে গল্প করছে। এটা এখন ওর মাথায় নেই যে সন্ধ্যাও ওর গল্পের ঐ অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান মেয়েটারই সমগোত্রীয়।

রমা সন্ধ্যাকে নিজের ঘরটা দেখাল। ঘরটায় রাখা খাটটা একজনের মত। রমা একটু হাত পা ছড়িয়ে ছাড়া ঘুমোতে পারে না। সেজন্যে ও ওর প্রেমিকদের ওর ঘরে পুরো রাত কাটাতে দেয় না। প্রভুদয়াল রমার ঘরে আসার সুযোগ একটু কম পায়। ও সাহেবকে তার মেয়েমানুষের বাড়ি ছেড়ে দেবার পর ছুটি পেলে তবেই রমার ঘরে আসে। সকালবেলায় আবার গিয়ে সাহেবকে নিয়ে আসে। মাঝে মাঝে রাতে ওকে গাড়িতেই শুতে হয়। রমা ভাবছে আর একটু চওড়া একটা খাট বানিয়ে নেবে। প্রভুদয়ালের চেনা ছুতোর আছে। ওর দেশের লোক। সস্তায় বানিয়ে দেবে। এখন রমা নিজের টাকাতেই খাটটা বানিয়ে নেবে। আর যেহেতু ওটা এ বাড়িরই আসবাব হবে রমা পরে ঘ্যান ঘ্যান করে নীলমাধবের কাছ থেকে দামটা আদায় করে নেবে। সাহেবকে এসব কিছু বলবে না। বলার দরকারও নেই। এসব ছোটখাট ব্যাপার সাহেবের নজরেই আসবে না —

কলকল করে কথা বলে যাচ্ছিল রমা। আসলে ও তো মেয়েলি কথা বলার লোক পায় না। প্রায় সমবয়েসী সন্ধ্যাকে পেয়ে ও এখন সখ মিটিয়ে কথা বলে পেট হাল্কা করে নিচ্ছিল। শুনতে শুনতে সন্ধ্যা মাঝে মাঝে ঘাড় নাড়ছিল আর এদিক ওদিকে তাকিয়ে ঘরের কোথায় কি আছে তা দেখে নিচ্ছিল। ঘরের এক কোণে খাটের মাথার দিকটায় একটা ঠাকুরের সিংহাসন। তাতে লক্ষ্মীদেবীর একটা বাঁধানো ছবি — সামনে ধূপদানিতে কতগুলো জ্বলন্ত ধূপ — জ্বলে জ্বলে সেগুলো প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। একটা বড় প্রদীপ — সেটায় রমা প্রচুর তেল ঢেলে রেখেছে — সলতেটা শান্ত এবং নিশ্চিন্তভাবে জ্বলছে। একটা বড় থালায় প্রচুর ফল কেটে দেবীকে দিয়েছে রমা — দু রকমের সন্দেশ, মিছরীর বড় বড় টুকরো এসবও আছে। আজ বৃহস্পতিবার। স্নান করে উঠেই রমা দেবীকে ধূপ, প্রদীপ আর খাবারদাবার দিয়েছে।

রমা তখনও কি করে বড় খাট বানাবে তার গল্প করে যাচ্ছিল। বড় খাট বানালে একটা অসুবিধে হতে পারে সে কথাও বলছিল। প্রভুদয়াল যুবক আর বড় নাছোড় স্বভাবের — কিছুতেই রমার ঘর থেকে বেরোতে চায় না। ওকে ধাক্কাধুক্কি দিয়ে ঘর থেকে বার করতে হয়। বড় খাট হলে ওকে ঘর থেকে বার করা একটা মুস্কিলের ব্যাপার হবে। তবে ওর বয়েস অল্প, বেশ তাগড়াও আছে — রোজ রাতে তো আর বাড়ি আসতে পারে না — মাঝে মাঝে ওকে সারা রাত থাকতে দেয়া যেতে পারে।

সন্ধ্যা ওর কথার মাঝখানেই বলল, ঠাকুরকে অত খাবার দিয়েছো — সব কি ঠাকুর খেতে পারবে? তাছাড়া এভাবে খোলা ফেলে রাখা কাটা ফল খেলে পেটের অসুখ করতে পারে। ঠাকুরের ভোগে কয়েকটা পেট খারাপের বড়িও দিয়ে দিলে পারতে।

রমার চোখ মুখের ভাব বদলে গেল — ও প্রায় শিউরে উঠল। এই লক্ষ্মীর পুজো করে রমার জমি জিরেত, কিরানা দোকান, পোস্ট আপিসের টাকা। সেই লক্ষ্মীদেবীকে নিয়ে এরকম তামাশা? ও খাটে জাঁকিয়ে বসে গল্প করছিল — ধুপ করে নেমে পড়ল। বার বার ঠাকুরের সামনে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম করল। তারপর উঠে বসে একটু অনুযোগ করেই বলল, ছি ছি, ঠাকুর দেবতাকে নিয়ে অমন ঠাট্টা ইয়ারকি করতে আছে? ঠাকুরের কাছে ক্ষমা চাও — লক্ষ্মীঠাকুর খুশি থাকলে উনি কি না দেবেন তোমাকে।

সন্ধ্যা খাটে বসেই জোড়হাত একবার কপালে ঠেকাল। অবশ্য সেটা নেহাতই রমাকে একটু খুশি করার জন্যে। ও আসলে এসব ঠাকুর দেবতাকে একটু দূরে রাখে। ওর এখন এসব ব্যাপারে কতগুলো নিজস্ব অভিমত তৈরী হয়েছে। দেবতাই হোক আর দেবীই হোক পুরুষ মানুষের প্রতি তাদের বড়ই পক্ষপাতিত্ব। কারণ তারা একমাত্র পুরুষমানুষকেই দিয়েছে বলাৎকার করার ক্ষমতা। তাছাড়া এই যে শক্তি — দেবতা বা দেবী — তাকে ভয় বা ভক্তি কোনটা করারই কোন কারণ নেই সন্ধ্যার। এই শক্তি যদি থেকে থাকে তা ওর জীবনকে দলে পিষে দিয়েছে। ওকে আশ্রয়হীন হয়ে পথে বার হতে হয়েছে, ওর বাবা ওকে গরুছাগলের মত বিক্রী করে দিয়েছে, ওর শরীরের ওপর অমানুষিক অত্যাচার হয়েছে। কাজেই ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস তাদের পুজো - এসব সন্ধ্যা নিজের মন থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তবে সন্ধ্যা রমাকে এসব কিছু বলল না — বলবার কথা ভাবলই না। মানুষ তো শুনে কিছু শেখে না — শেখে খালি ঠেকে। অনর্থক তর্ক করে বা ভাষণ দিয়ে লাভ কি? মেয়েটা আছে নিজের বিশ্বাস নিয়ে — থাকুক না। তাতে সন্ধ্যার তো কোন ক্ষতি হচ্ছে না।

পরের দিন সকালে অনিরুদ্ধ এলেন, সঙ্গে সূর্যশেখর। ওদের পেছনে রমা। ভাল জাতের শরাব পেয়ে আগের রাতেও সন্ধ্যা অনেকটা খেয়ে নিয়েছিল। ওরা যখন এলেন তখনও সন্ধ্যা ঘুমোচ্ছে। ওদের আসায় ঘুমটা ভেঙে যাবার জন্যে সন্ধ্যা একটু বিরক্তই হয়েছিল। ও এক হাতে কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে বিছানা থেকে অল্প একটু উঠল — মুখ তুলে ওদের দিকে তাকাল।

অনিরুদ্ধ কথা বললেন। মামুলি দু চারটে কথা। কেমন আছ? কোন অসুবিধে হচ্ছে না তো? এই সব। সূর্যশেখর একবার সন্ধ্যাকে দেখে নিয়ে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ছিলেন। সন্ধ্যার দু চোখ এখনও ঢুলুঢুলু এবং অল্প লাল। গায়ের আবরণ বলতে শুধু একটা শাড়ি — কোন মতে গায়ে জড়ানো — তাতে ওর শ্যামলা রঙের যুবতী শরীরের বেশ কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। ওর বাহু, কাঁধ, পায়ের গোছ — শরীরের সব ঢেউ এবং ভাঁজ। সূর্যশেখর ওকে দেখে একটা অস্বস্তি আর আকর্ষণ দুইই অনুভব করছিলেন। ওর দিকে মাঝে মাঝেই আড় চোখে তাকিয়ে ওর মুখ, শরীর দেখে নিচ্ছিলেন।

সন্ধ্যা হুঁ হাঁ করে অনিরুদ্ধর প্রশ্নের জবাব দিল। তারপর অনিরুদ্ধ সূর্যশেখরকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন — রমা রইল। তার মানে রমাকে সব শেখানো আছে। আসল কথাগুলো ও বলবে। ও যতই সন্ধ্যার পাতানো সখী হোক, আসলে ও এ বাড়িরই একজন লোক। ওপর থেকে যা হুকুম আসবে তা ও চোখ বুজে তামিল করবে।

রমা সন্ধ্যাকে বলল আজ থেকে সন্ধ্যার কাজ শুরু। সন্ধ্যা স্নান-টান সেরে নিলে রমা রামুকে নিয়ে আসবে — সন্ধ্যাকে চন্দনের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্যে।

সন্ধ্যা নিজের দু হাত টান টান করে ওপরে তুলে বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে আড়মোড়া ভাঙল। রমা ওর খাটের পাশে দাঁড়িয়েছিল। সন্ধ্যা হাতের ইশারা করে ওকে খাটে বসতে বলল।

রমা বসল খাটের একপাশে। সন্ধ্যার দিকে ঝুঁকে পড়ে বলল, কি বলবে?

টপ করে বিছানায় উঠে বসল সন্ধ্যা। দু হাতে রমাকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে শব্দ করে একটা চুমু খেল।

ওর হাত ছাড়িয়ে হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়াল রমা। মাগি ছেনালি করছে। তার ওপর আবার মুখে এখনও হুইস্কির গন্ধ লেগে আছে। সেই গন্ধ রমার মুখে লেগে গেল কিনা কে জানে। রমাকে এখন আবার সাবান দিয়ে ভাল করে সারা মুখ ধুয়ে ফেলতে হবে। ও মুখে সন্ধ্যাকে বলল, এই কায়দাগুলো আজ থেকে অন্য জায়গায় দেখিও।

রমা ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে থেকেই শুনতে পেল ঘরের ভেতর বিছানায় গড়াগড়ি দিয়ে সন্ধ্যা আওয়াজ করে হাসছে। ঘরের দরজাটা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করে দিল রমা। এই হাসি শুনে সবাই আবার এই রেণ্ডিটাকেও পাগল না ভাবে।

|| ৬ ||

চন্দন

জ চন্দনের মনমেজাজ খারাপ। রাজা মারা গেছে। আজ সকালে। চন্দন চুপ করে ঘরের ভেতর বসে আছে। একবার বুড়ো রামুদা ঘরে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। এ ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করা যায় না। সেজন্যে যখন তখন দরজাটা বাইরে থেকে হাতল ঘুরিয়ে খুলে ও এ ঘরে ঢুকে আসে। আজ বিকট চীৎকার করে ওকে ভাগিয়েছে চন্দন। নিশ্চয়ই চন্দনকে স্নান করতে নিয়ে যাবার জন্যে এসেছিল। পাগল, একেবারে পাগল এ বাড়ির লোকগুলো। এদিকে রাজা মরে গেছে, আর রামুদা এসেছে ওকে স্নান করাবার জন্যে। কোন কাণ্ডজ্ঞান নেই লোকগুলোর।

রাজার সঙ্গে চন্দনের ভাবসাব হয়েছিল গত কয়েকমাস ধরে। সন্ধেবেলা একটা প্রকাণ্ড ফড়িং এসে ঘরের দেয়ালে ওপরের দিকে আলোর কাছাকাছি বসেছিল। ওর মাথাটা বড় — তার দুপাশে প্রকাণ্ড দুটো চোখ। ওই চোখ দিয়ে ওটা চন্দনকে দেখছিল। একটু একটু ভয় পাচ্ছিল চন্দন। প্রাণীটার মতলব সুবিধের নয়। ওড়ার সময় বিশ্রীরকম জোরে ডানার আওয়াজ করছে। তার ওপর ঐ রকম বিকট চেহারা আর চোখ। ঘরের উল্টোদিকের দেয়াল বরাবর চন্দনের শোবার খাট পাতা। চন্দন খাটের ওপর উঠে বসেছিল — দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে সিঁটিয়ে বসেছিল। তারপর ওর চোখের সামনে ঐ পাতলা স্বচ্ছ লালচে পর্দাটা নেমে এল। ও বুঝল এবার ও ঐ গলার স্বরটা শুনতে পাবে। ঠিক তাই হল — গলার স্বরটা ওকে ফিসফিস করে বলল, ঐ ফড়িংটা বিপজ্জনক। কামড়ে দিতে পারে। তারপর চন্দন ঐ গলাটা আর শুনতে পেল না, কিন্তু লালচে পর্দাটা ওর চোখের সামনে ঝুলে রইল। চন্দন বুঝতে পারছিল না ওর এখন কি করা উচিত। কিভাবে ওর সাবধান হওয়া উচিত। কারণ ঐ গলার মালিক ওকে যা বলল তা একেবারে নির্ভুল — তাতে সন্দেহ করার কোন জায়গা নেই।

এমন সময় দেয়াল বেয়ে ছুটে এল রাজা, কামড়ে ধরল ফড়িংটাকে। চন্দন দেখল রাজার মুখের ভেতর ফড়িংটার পুরো মাথাটা ঢুকে গেছে — ভয় দেখানো চোখ দুটো আর দেখা যাচ্ছে না। ফড়িংটা ওর শরীরের যে অংশটা রাজার মুখের বাইরে ছিল সেটা দেয়ালের গায়ে ঝাপটা মেরে মেরে রাজার মুখ খোলাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু রাজা মুখ শক্ত করে বন্ধ রেখেই চিবিয়ে চিবিয়ে ফড়িংটার শরীরের আরও খানিকটা নিজের মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। তারপর ওটাকে ওভাবে মুখে নিয়েই দেয়াল বেয়ে দৌড়ে গিয়ে খোলা জানালাটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল। চন্দন দেখল ওর দৃষ্টি আবার স্বচ্ছ — চোখের সামনে থেকে লাল পর্দাটা সরে গিয়েছে। ও মনে মনে রাজাকে তারিফ করল। আর ওর নামটাও তক্ষুনি চন্দনের মনে এসে গেল — রাজা।

কিন্তু এখন রাজা চিৎ হয়ে চন্দনের ঘরের দেয়ালে লাগানো টেবিলটার ওপর পড়ে আছে। মোটাসোটা ফর্সাটে চেহারা — পেট, বুক, ধপধপে সাদা। আর সেই সাদা রঙের বুকে, যেখানে ওর হৃদপিণ্ড, সেখানে একটা আড়াআড়ি গভীর ক্ষত। রক্ত বেরিয়ে সেটা এখন একটা লাল রঙের মোটা সরলরেখা।

আগন্তুক গুণ্ডাটার সঙ্গে ওর লড়াইয়ের প্রথমভাগটুকু চন্দন দেখে নি। একটা আওয়াজ শুনে মুখ তুলে তাকিয়ে দেখেছিল দেয়ালের গায়ে একটা ঝটাপটি হচ্ছে। তারপরই থপ করে দেয়াল থেকে খসে ও দুটো পড়ল টেবিলটার ওপর। আগন্তুক আততায়ীটার চেহারাটা বিকট — গায়ের চামড়া কালচে ছাই ছাই রঙের। টেবিলের ওপর পড়ে ওরা দুটোতে আবার ঝটাপটি করতে লাগল। চন্দন ওদের মারামারিতে হাত দেয়নি। কারণ ওর পুরো বিশ্বাস ছিল যে এই যুদ্ধে রাজা জিতবে। ঐ কুৎসিৎ চেহারার জানোয়ারটার জান যাবে রাজার সঙ্গে যুদ্ধ করার সাহস দেখানোর জন্যে। কিন্তু চন্দন একটা দৃশ্য দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল। আর এতই অবাক হয়ে গেল যে ও দূরে দাঁড়িয়ে পাথর হয়ে দেখতে লাগল টেবিলের ওপর কি হচ্ছে। রাজা চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছে আর ঐ গুণ্ডাটা পাশের দিক থেকে ওর বুকটা কামড়ে ধরেছে। তারপর গুণ্ডাটা ঝটকা মেরে মেরে আর চিবিয়ে চিবিয়ে রাজার বুকের আরও গভীরে কামড়ে ধরল। আর রাজা অসহায়ভাবে ছটফট করতে করতে নিজের চারটে পা একবার ভেতর দিকে টেনে নিতে লাগল আর একবার বাইরে বার করতে লাগল।

চীৎকার করে উঠল চন্দন। ছুটে গেল ঐ টেবিলটার কাছে। কিন্তু খুনি গুণ্ডাটা ততক্ষণে রাজাকে ছেড়ে দিয়েছে — দ্রুত দৌড় মেরেছে — টেবিল ছাড়িয়ে দেয়ালে, দেয়াল ছাড়িয়ে জানালায়, খোলা জানালা দিয়ে ঘরের বাইরে। আর রাজার বুকের ক্ষতটা দিয়ে বেশ কিছু রক্ত বেরিয়ে এসেছে — ওর পা ছোঁড়া বন্ধ হয়ে গিয়ে ও নিথর হয়ে গেছে।

সেই থেকে নিজের বিছানায় চুপ করে বসে আছে চন্দন। নিজের ওপর রাগ হচ্ছে মাঝে মাঝে। ও যদি প্রথমেই গণ্ডাটাকে তাড়া দিত তাহলে হয়তো রাজা মারা যেত না। ওই সময় যদি লালচে পর্দাটা আসত আর ঐ গলার স্বরের মালিক কোন একটা হুকুম দিত। সেরকম কিছু হুকুম পেলে চন্দন তা তামিল করতই কারণ ঐ গলা শুনলেই বোঝা যায় যে ওর আদেশ মানতেই হবে — তা সে ফিসফিস করেই বলুক বা গমগম করেই উঠুক।

রাজার দিকেই তাকিয়েছিল চন্দন। এবার ওর চোখ পড়ল ঐ টেবিলের লাগোয়া দেয়ালের দিকে। কালো পিঁপড়ের সারি। সেই সারি নেমে এসেছে টেবিলের ওপর, রাজার শরীরের কাছাকাছি ঘোরাঘুরি করছে বেশ কিছু পিঁপড়ে।

লাফিয়ে বিছানা থেকে নামল চন্দন। জোরে চেঁচাল, রামুদা, রামুদা-আ-আ-

রামু ধারে কাছেই ছিল। ঘরের দরজা খুলে নিজের মুণ্ডু দরজার ফাঁক দিয়ে ঢুকিয়ে উঁকি মারল।

শীগগীর একটা মোমবাতি আর দেশলাই নিয়ে আয় — চন্দন বলল।

রামু অবাক হল, বলল, মোম আর দেশলাই দিয়ে কি করবে?

চন্দন আরও জোরে চেঁচাল, যা বলছি কর — শীগগীর নিয়ে আয় মোম আর দেশলাই।



(ক্রমশ)

[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]
[an error occurred while processing this directive]