সন্ধ্যাবেলা
প্রথম পর্ব
১ | ২ |



|| ৩ ||

সন্ধ্যা - ২

সন্ধ্যা তার চায়ের কাপে চতুর্থ চুমুক দেওয়ার পর দেখল কাপটার অর্ধেকও খালি হয় নি। কেকের টুকরোটা সেরকমভাবেই পড়ে আছে। সন্ধ্যা ওটা খাবে না। কোন না কোন ভাবে এবাড়ির কর্তাকে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে বাজারের মেয়ে হলেও সন্ধ্যা হ্যাংলা নয়। দেয়ালঘড়ির মিনিটের কাঁটাটা এখন তেইশের দাগে এসেছে। অর্থাৎ ওই বিদ্বান, বুদ্ধিমান এবং সমাজের ওপরতলার লোকদুটি এগারো মিনিট ধরে ভেতরের ঘরে বসে সন্ধ্যার মত একটা তুচ্ছ মেয়ের বিষয়ে আলোচনা করে যাচ্ছে। সন্ধ্যা ঠিক করল ঐ ঘড়িতে সাড়ে দশটা বাজলেই ও বেরিয়ে চলে যাবে। ও গৃহকর্তার আজ্ঞাবাহী দাসী নয় — কাজেই ও সূর্যশেখরকে আর সাত মিনিটের বেশী মঞ্জুর করবে না। ওর ছোট টিনের বাক্সটা ওর পায়ের কাছে রাখা আছে। এ বাড়িতে ঢোকার সময় এখানকার চাকর-বাকররা রিকশা থেকে এ ঘর পর্যন্ত এটা বয়ে এনে দিয়েছিল। বেরিয়ে যাবার সময় নিশ্চয়ই সে কাজের জন্যে তাদের কাউকে পাওয়া যাবে না। তাতে কোন অসুবিধে নেই। বাক্সটা এমন কিছু ভারী নয়। ওটার ভেতরে আছে তো খালি সন্ধ্যার কিছু জামাকাপড়। সন্ধ্যা নিজেই ওটা বয়ে নিয়ে যেতে পারবে।

সে রাতে লরী থেকে নামিয়ে ঐ বাড়িটায় ঢোকাবার পর সন্ধ্যার মুখের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়। একটা ঘোর কালো রঙের মুস্কো জোয়ান লোক এসে ওকে একটা বড় ছোরা দেখিয়ে শাসায়, শোন্‌ মাগি — একদম মুখ বন্ধ রাখবি। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরোলেই গলার নলিটা কেটে দেব। তারপর একেবারে সাদা চুল আর বাঁদরের মত কোঁচকান মুখের একটা চিমসে বুড়ি সন্ধ্যার হাত ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে যায়। একটা অন্ধকার খুপরি ঘরের মধ্যে ওকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজার পাল্লা দুটো বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়। দরজায় একটা আওয়াজ হয় — সেটা শুনে সন্ধ্যা বুঝতে পারে বাইরে থেকে হুড়কো টেনে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল।

পরে, অনেক পরে সন্ধ্যা যখন আরতিমাসির বাড়ির পাকাপোক্ত বাসিন্দা আর মাসির দলের সবচেয়ে বড় রোজগেরে মেয়ে সে ঐ বাড়িটার ঘটনাগুলো চুলচেরা ভেঙে ভেঙে বিচার করেছিল যে সেই অভিজ্ঞতা তার জীবিকার জন্যে কতটা দরকারী ছিল। সে রাতে ওই খুপরিতে ঢোকার পর ওর আর কিছু মনে ছিল না — ঘুমিয়ে পড়েছিল না অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল সেটা ওর জানা নেই। পরে যখন ও চোখ খোলার মত অবস্থায় এল তখন ও প্রথমেই বুঝল ওর সারা গায়ে খুব ব্যথা — বিশেষ করে কোমর, তলপেট আর উরুতে। তারপর ও ঘরটাকে ভাল করে দেখল। প্রায় কালো হয়ে যাওয়া নোনাওঠা দেয়াল দুদিক থেকে চেপে আসছে। ঘরের দরজাটা রংচটা — সেটাতে ভেতর থেকে বন্ধ করার কোন ব্যবস্থা নেই। মেঝেতে বিছানা বলতে একটা ছেঁড়াখোঁড়া মাদুর — প্রায় সারা ঘরটাই জুড়ে আছে। মাথার ধারে জল রাখার জন্যে ছোট একটা মাটির কুঁজো — একটা অ্যালুমিনিয়ামের গেলাস উপুড় করে তার মুখটা ঢাকা দেওয়া হয়েছে। ঘরে কোন জানালা নেই। দরজার উল্টোদিকের দেয়ালের ছাদের কাছে লোহার জাল লাগানো একটা ঘুলঘুলি — দিনের আলো তার ভেতর দিয়ে কোন মতে লুকিয়ে চুরিয়ে ঘরে ঢুকছে। ঘরের বাতাসে একটা অপ্রীতিকর কটু গন্ধ — নর্দমার নোংরা পাঁক আর পচে ওঠা আবর্জনার মিশেল রয়েছে তাতে।


সন্ধ্যা দু হাতে ভর দিয়ে মাদুর ছেড়ে উঠল। ঘরের এক দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পা ছড়িয়ে দিয়ে বসল। একটু পরেই দরজার বাইরে ঘটাং করে হুড়কোর আওয়াজ, দরজা খুলে ঘরে ঢুকল সেই চিমসে বুড়ি। সে সন্ধ্যার দিকে একটা ছেঁড়া আধভিজে গামছা আর একটুকরো সস্তা দামের অনেক ব্যবহার করা ক্ষয়ে যাওয়া সাবান ছুঁড়ে দিল। সন্ধ্যাকে বলল, ওঠ হারামজাদি। কলতলায় যা, চানটান যা করবি কর। তারপর একটু থেমে আবার বলল, হাগু মুতু যদি পায় তো দরজায় ধাক্কা দিয়ে আমাকে ডাকবি। ঘরের ভেতর কিছু করে ফেললে সেটা তোকেই খাইয়ে দেব।

স্নানের জায়গাটা নোংরা, শ্যাওলা ধরে পেছল — কোন আব্রু নেই। পায়খানা ঘর আরও নোংরা, কখনো বোধহয় পরিষ্কার করা হয় না — তীব্র দুর্গন্ধে নাড়ি উলটে আসে। সন্ধ্যাকে সব কাজ সারতে হল বুড়িটার সামনে — গর্তে বসা দুটো চোখ প্যাট প্যাট করে মেলে ধরে বুড়ি সমানে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। সন্ধ্যা সব কাজ সারল — নিজেকে বোঝাতে লাগল — কোন অসুবিধে নেই — মানিয়ে নাও এই ব্যবস্থার সঙ্গে। তারপর ভিজে কাপড়েই বুড়ির সঙ্গে ওর খুপরিতে ফিরল। ও খুপরির ভেতরে ঢুকলে দরজা আবার বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেল।

স্নান করে সন্ধ্যার খিদে পাচ্ছিল। ও যুবতী এবং স্বাস্থ্যবতী — ওর ওপর শত অত্যাচার হলেও ওর শরীর ঠিক তার সময়মত পুষ্টির প্রয়োজন জানাতে থাকে। গতকাল ঠিক সন্ধের মুখে ও খানিকটা জলো লাপসি খেয়েছিল — তারপর থেকে পেটে আর কিছু পড়েনি। এখানে সময় দেখার কোন উপায় নেই। সন্ধ্যা আন্দাজ করে নিল এখন বেলা দশটা এগারোটা হবে। গতকাল রাতে শুতে যাবার পর বোধহয় বারো চোদ্দ ঘন্টার বেশী কাটেনি। কিন্তু এর মধ্যে ওর জীবন কিভাবে মোড় নিয়ে নিল তা ভাবতে ওর নিজেরই অবাক লাগছিল।

বাঁদরমুখো বুড়িটা দরজা খুলে ঘরে ঢুকল — দরজা খোলা পেয়ে সেই সঙ্গে খানিকটা আলোও ঢুকে পড়ল সন্ধ্যার খুপরিতে। বুড়িটার এক হাতে একটা কলাই করা থালা, অন্য হাতে একটা অ্যালুমিনিয়ামের গেলাস। বুড়ি থালা আর গেলাস ছেঁড়া মাদুরের ওপর রাখল। থালাটার কলাই জায়গায় জায়গায় চটে গেছে — একদিকের কানা ভাঙা — কানার ধারে ধারে শুকনো এঁটো লেগে আছে। থালায় খানিকটা মোটা চালের ভাত, একধারে একটু নুন, একটা বড় কাঁচা লঙ্কা, একটুকরো শুকিয়ে যাওয়া লেবু। গেলাসে জল রয়েছে। বুড়ি সন্ধ্যাকে ধমক দিয়ে বলল, চটপট খেয়ে নে। এরপর আর খাওয়ার সময় পাবি না।

সন্ধ্যা খেল — নুন, লঙ্কা আর আধশুকনো লেবু দিয়ে পুরো ভাতটা। খাওয়া শেষ করে বুড়িটার কথামত ওই থালাতেই গেলাসের জল দিয়ে হাত মুখ ধুয়ে গেলাসের বাকি জলটুকু খেয়ে নিল। ও এই পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকবে — ওকে যা খেতে দেয়া হবে ও তাই খাবে — তার থেকেই প্রাণশক্তি তৈরী করবে ওর শরীর — ও টিঁকে থাকবে যে কোন অবস্থার মোকাবিলা করে। বুড়ি খালি থালা গেলাস তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল — দরজায় যথারীতি বাইরে থেকে হুড়কো পড়ল।

পেটে খাবার পড়ায় সন্ধ্যার মাথায় নানারকম চিন্তা আসছিল। ও উৎকণ্ঠা আর ভয়কে দমিয়ে, মনকে যতটা সম্ভব শান্ত রেখে এরপর ওর কি হতে পারে সেটা আন্দাজ করবার চেষ্টা করছিল। ওরা সন্ধ্যাকে জানে মারবে না — সেটা পরিষ্কার। ওকে আটকে রেখে ওরা কারোর থেকে মোটা মুক্তিপণ আদায় করবে সে সম্ভাবনাও নেই। যেটা সবচেয়ে বেশী সম্ভব সেটা হল এই লোকগুলো ওর শরীর ভাঙিয়ে ব্যবসা করবে। হয়তো আজ থেকেই ওর কাজ শুরু হয়ে যাবে — লোক আসবে ওর ঘরে, এই খুপরিতে —

সন্ধ্যার একটু ঝিমুনি এসেছিল। একটা আওয়াজে ওর ঘুম ভাঙল। ঘরের দরজা খোলা। তিনটে লোক ঢুকেছে ওর ঘরে — একটার হাতে ফুট দুয়েক লম্বা রবারের একটা মজবুত পাইপ।

বুড়িটা দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিল। ও বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দিল। সন্ধ্যা ভাবছিল ওর কাজ শুরু হয়ে গেল কিনা। কিন্তু একসঙ্গে তিনজন লোক কেন? এখানকার ব্যবসার কি এই রীতি? ওকে কি দিনের বেলাতেও শরীর বেচতে হবে? তবে কি চব্বিশ ঘন্টাই চলবে এই কারখানার কাজ? এই তিনটে লোকেরই ষণ্ডাগুণ্ডা চেহারা, নিষ্ঠুর চাউনি। ওদের দেখে সন্ধ্যার মনে হচ্ছিল না যে ওরা পয়সা খর্চা করে ফুর্তি লুটতে এসেছে।

লোকগুলো ধাক্কা মেরে সন্ধ্যাকে মাদুরের ওপর ফেলে দিল। ওর গায়ের জামা কাপড় নোংরা তো ছিলই, আর গত রাতে ঐ লরির লোকগুলোর তাণ্ডবের জন্যে তা একেবারে ছিঁড়ে খুঁড়ে গিয়েছিল। এই তিনটে লোক এখন জবরদস্তি ওর ওই নোংরা ছেঁড়া জামাকাপড়ই কেড়ে নিল। ওকে উপুড় করে ফেলে একজন ওর মুখ টিপে রইল, আর একজন ওর দুহাত মুচড়ে ওর পিঠের ওপর ধরে রইল। ওই রবারের পাইপওয়ালা তখন শুরু করল মার। পাইপটা চাবুকের মত পড়ে ওর পায়ে, নিতম্বে, পিঠে — শরীরের সেসব জায়গা থেকে একটা অনুভূতি বিদ্যুতের মত ছুটে যায় ওর মাথায়। মাথা বলে দেয় ওটা যন্ত্রণা — তীব্র এবং তীক্ষ্ণ। ওর পুরো দেহটা মুচড়ে মুচড়ে ওঠে — আর্তনাদ করতে পারলে হয়তো যন্ত্রণা একটু কম লাগত — কিন্তু চেপে ধরে বন্ধ করা মুখ দিয়ে বেরোয় একটা অস্পষ্ট গোঙানি।

যন্ত্রণা হতে থাকলে মানুষের সময়ের জ্ঞান লোপ পায়। লোকগুলো ওকে এইভাবে কতক্ষণ পিটিয়েছিল তা সন্ধ্যার আন্দাজ নেই। একসময় সেই পাইপওয়ালা থামল। তখন তিনজনেই সন্ধ্যার শরীরটা হিংস্রভাবে ব্যবহার করল — তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। দরজা আবার বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে গেলে সন্ধ্যা বুঝল এতক্ষণ দরজায় হুড়কো লাগানো ছিল না — এইবার হুড়কো পড়ল।


সন্ধ্যা পড়ে রইল মাদুরের ওপর — আবরণহীন, কালশিটে পড়া, বিধ্বস্ত, যন্ত্রণায় কাতর একটা নারী শরীর। ঐ লোকগুলো ওর চারপাশে একটা যন্ত্রণার দেয়াল তুলে দিয়ে গেছে — ওকে বাকি দুনিয়া থেকে আলাদা করে দিয়েছে।

আরতিমাসির ভাড়ার ঘরে ছাপ্পর খাটের ওপর নরম, মোটা গদীর বিছানা। দুপুরে খাওয়ার পর তার ওপর গড়াচ্ছিল সন্ধ্যা। ওকে রান্না করতে হয় না। চারটে ঘরের পর দীপালির ঘর। ও খুব একটা খদ্দের পায় না — রান্নাটা ওই করে। সন্ধ্যার কাজ শুধু টাকা দেওয়া আর খাওয়া। দীপালি খাইখর্চাটা নেয়, আর রান্না করে বলে মাসে পঞ্চাশ টাকা। ব্যবস্থাটা আরতিমাসিই করে দিয়েছে। সন্ধ্যা মাসির সোনার ডিম পাড়া হাঁস — ওকে মাসি বেশ একটু সুবিধে দিয়ে থাকে। দীপালিরও সুবিধে — ও যা রান্না করে তাতে ওর নিজের খাওয়া দাওয়াও হয়ে যায়। তারও ওপর মাসে পঞ্চাশ টাকা - মন্দ কি?

সন্ধ্যা ভাবছিল কদিন ওকে ঐ বাড়িতে ওরকম যন্ত্রণা পেতে হয়েছিল। তিন কি চার দিন? এখন ঠিক মনে পড়ছে না। সেদিনের পর সন্ধ্যা তার জামাকাপড় আর ফেরৎ পায় নি। ওর শাড়ি জামা নোংরা ছেঁড়া হলেও ওর আব্রু রাখছিল। এখন ওকে রাখা হচ্ছিল একেবারে আদিম ভাবে। খালি স্নান করতে বা কলতলায় যাবার সময় বুড়িটা ওকে দুটো গামছা ধার দিচ্ছিল - ও ফেরৎ এসে ওর ঘরে ঢোকার সময় আবার ওদুটো কেড়ে নিচ্ছিল। ঐ গুণ্ডাগুলো রোজই আসছিল ওর ঘরে - নিয়ম করে চলছিল ওকে মার আর শরীরের ওপর অত্যাচার। যন্ত্রণার দেয়ালটা চারপাশ থেকে এগিয়ে এসে ওকে পিষে দিত। সেই দেয়ালের ভেতর গেঁথে যাওয়া অবস্থায় লুটোপুটি খেত সন্ধ্যা - যেন ফাঁদে পড়ে ছটফট করা বড়সড় একটা পোকা। ও রাতের ঘুম হারিয়ে ফেলেছিল - ভোরের দিকে একটা ব্যথা আর তন্দ্রা মেশানো ঘোরের মধ্যে ও ঝিমিয়ে পড়ত। সকালে যখন এই ঘোরটা একটু কাটত তখন ঐ ব্যথার চাপটা একটু হাল্কা - লোকগুলো তাদের কাজ করে চলে যাবার পর সেই চাপ আবার অসহ্য হয়ে উঠত। দেয়ালের ঘুলঘুলিটা দিয়ে আসত অল্প অল্প হাওয়া - দুর্গন্ধ, কিন্তু প্রাণদায়ী। মাদুরের ওপর পড়ে ছটফট করতে করতে সন্ধ্যা বড় বড় শ্বাস টেনে নিত। আর খেত জল - কারণ সারা শরীরে আগুনের মত জ্বালা - শরীরের বাইরে, ভেতরে। ধীরে, খুব ধীরে কমতে থাকত ব্যথা - জ্বালাযন্ত্রণা।

কেন ওকে গরু ছাগলের মত রেখেছিল ওরা? কেন ওরা রোজ ওকে অকারণে ওরকম মারত? পরে আরতিমাসীর বাড়িতে এক রাতে যখন বিলিতি খেয়ে ওর চোখ নেশায় ঢুলুঢুলু, ওর পাশে সারা রাতের বরাত নিয়ে আসা শাঁসালো আর খর্চে স্বভাবের খদ্দেরটা যখন এক হাত দিয়ে সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন উত্তরটা সন্ধ্যার মাথায় এসেছিল। ওগুলো ছিল ওর প্রশিক্ষণের অঙ্গ - ওকে এই জীবিকার জন্যে তৈরি করে দেয়ার পদ্ধতি। একজন মেয়ের লজ্জার ভাব টিঁকে থাকলে সে এই ব্যবসায় সাফল্য পাবে না - এ লাইনে পাকা হয়ে উঠতে পারবে না। অতএব কেড়ে নাও তার পোষাক - তাকে আদিম অবস্থায় ছেড়ে দাও - দূর হয়ে যাক তার লজ্জাশরম। অপরিচিত সব লোকের কাছে যেতে, তাদের বিচিত্র সব খেয়াল মেটাতে সে ভয় পেতে পারে। সেজন্যে দাও তাকে পিটুনি - ভেঙে যাক তার সবরকম ভয়। তার শরীরে ঘৃণাবোধ থাকতে পারে - দুর্গন্ধ বা চর্মরোগগ্রস্ত পুরুষের কাছে শরীর মেলে দিতে তার ঘেন্না হতে পারে। তাই সবাই মিলে তার গায়ে, মুখে থুতু দাও - ভোঁতা হয়ে যাক তার ঘৃণাবোধ। অনেকে মিলে তাকে ভোগ কর। ভেঙে দাও তার সবরকম মানসিক এবং শারীরিক প্রতিরোধের ইচ্ছে। সাত দশদিন ধরে এরকম শিক্ষানবীশিতে থাকলে তার আর লজ্জা ঘেন্না ভয় থাকবে না - সে যান্ত্রিক হয়ে যাবে - বাবু যখন তার শরীর নিয়ে ব্যস্ত তখন সে মনকে আলাদা করে দিতে পারবে - বিছানায় ছারপোকার মত ক্ষতিকর কীট চোখে পড়লে হাত বাড়িয়ে তাকে টিপে মারতে পারবে বা পাশের দেয়ালে চিপকে লেগে থাকা টিকটিকিটার দিকে তাকিয়ে মুখে হুশ হাশ আওয়াজ করে আর হাত দিয়ে সেদিকে তাড়া দিয়ে সেটাকে ভাগিয়ে দিতে পারবে। টাকার বদলে সে যে কোন পুরুষকে শরীর দিতে সবসময় তৈরী থাকবে - এমন কি সেই লোক রামমোহন বসু হলেও কুছ পরোয়া নেই।

হয়তো এভাবেই নিজের অজান্তে সন্ধ্যা একটু একটু করে শিখে ফেলছিল শরীর থেকে মনকে সরিয়ে নেওয়ার কায়দাটা। একদিন যখন ঐ লোকগুলো ওকে বর্বরভাবে ভোগ করতে ব্যস্ত আচানক ওর মনে পড়ে গিয়েছিল ওর দেশের বাড়ির কথা— বৃহস্পতিবার দিনগুলোতে ওর মায়ের লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়ার কথা। কুলুঙ্গীতে লক্ষ্মীদেবীর ছবি - সামনে ধূপদানিতে জ্বলন্ত ধূপের থেকে ওঠা সুগন্ধি ধোঁয়া - থালায় সন্দেশ, কলা, বাতাসা। আসনে বসে দুলে দুলে সুর করে মায়ের পাঁচালি পড়া - পাশে পা মুড়ে মাটিতে বসা সন্ধ্যা - বেশিরভাগ বিশ্বাসী, অল্প অবিশ্বাসী মন নিয়ে পাঁচালি শোনা। কিন্তু সেই দৃশ্য, ঠাকুরের ছবি মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওর একটা প্রবল হাসির বেগ আসে - ও আওয়াজ করে হাসতে থাকে। ধর্ষক লোকগুলো একটা প্রচণ্ড বিস্ময়ের ধাক্কা খায় আর সন্ধ্যা পাগল হয়ে গেছে ভেবে তাড়াতাড়ি ওকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ায়। কারণ উন্মাদ নারীপুরুষ ঈশ্বরের প্রিয়, তাদের ওপর অত্যাচার করা মহাপাপ - সখ্‌ৎ মানা। তার পরের ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটতে থাকে। আরতি বাড়িউলিকে খবর দিয়ে ডেকে আনা হয় - সন্ধ্যাকে তার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয় বিক্রীর বেসাতি হিসেবে। তখনও অবশ্য সন্ধ্যাকে কোন পোষাক দেওয়া হয় নি - কারণ আরতিমাসির পছন্দ না হলে আবার আর একজনকে ডেকে বিক্রীর জিনিষটা তো একইভাবে দেখাতে হবে। একজন লোক সন্ধ্যার দু হাত মুচড়ে ওর পেছনে ধরে রেখেছিল - মেয়েটা যাতে হাত দিয়ে তার শরীরটা ঢাকাঢুকি দিতে না পারে। কিন্তু সন্ধ্যা সেরকম কোন চেষ্টা করে নি - সারা গায়ে মারের কালশিটের দাগ নিয়ে ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আরতি বাড়িউলির সামনে। ও যে এই অবস্থায় রয়েছে তার জন্যে ও দায়ী নয়। ঘটনাচক্র ওকে এখানে এনে ফেলেছে। এই সব অত্যাচারী ঘটনা তৈরী করেছে অনেক মানুষ - বিভিন্ন দেশের মহারথীরা, দাঙ্গাকারী লুঠেরা গুণ্ডারা। তার ফলে ও এখন গোহাটাতে বিক্রী হতে আসা পশুর মত দাঁড়িয়ে আছে একটা ব্যবসাদার মেয়েমানুষের সামনে। ওর কিসের লজ্জা? কাকেই বা লজ্জা?


আরতি বাড়িউলির দাঁতে কালো মিশি এবং শরীরে প্রচুর চর্বি। পাকা প্রাক্তন বেশ্যা হিসেবে সে বহু মেয়ে নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করেছে এবং সেই সুবাদে জহুরীর চোখের মালিক হতে পেরেছে। শ্যামাঙ্গী কিন্তু স্বাস্থ্যবতী যুবতী সন্ধ্যা, তার সুদর্শন মুখ চোখ, উন্নত ভারী বুক, সরু কোমর এবং তার নিচে নিতম্বের স্ফীতি - এ সবই আরতিমাসি খুঁটিয়ে দেখেছিল। গায়ের কালশিটের দাগগুলো সে ধর্তব্যের মধ্যে আনে নি। কারণ এ লাইনে আসতে গেলে একেবারে গোড়াতে যে গায়ে কালশিটের দাগ পড়বে আর কেন পড়বে তা এই অভিজ্ঞা মেয়েমানুষটির খুব ভালই জানা ছিল। সে সন্ধ্যাকে তার নিজস্ব পদ্ধতিতে নেড়েচেড়ে দেখছিল - কারণ একটা নারী শরীর নগদ একগাদা টাকা ফেলে কেনার আগে তার বিশেষ বিশেষ জায়গার স্থিতিস্থাপকতা পরীক্ষা করা যে কোন খরিদ করতে যাওয়া জিনিষ পরীক্ষা করার মতই জরুরী। সন্ধ্যা অবশ্য এসব পরোয়াই করছিল না - সোজা ওর সামনের দেয়ালের দিকে নির্বিকার, উদাসীনভাবে তাকিয়েছিল। ওর প্রথম দিনে দেখা কালো, ডাকাতের মত জোয়ান লোকটার সঙ্গেই মাসির লেনদেন হচ্ছিল। মাসি ওকে নিজের ডান হাতের দুটো আঙুল তুলে দেখায়। জোয়ান লোকটা মাথা নেড়ে নিজের আপত্তি জানায় আর নিজের হাতের পাঁচটা আঙুলই তুলে ধরে। শেষ পর্যন্ত দু হাজার আটশোতে রফা হয়। টাকা হাত বদল হতেই সন্ধ্যার গায়ে নতুন জামাকাপড় ওঠে - অবশ্য গায়ের জামা মাপ মত না হবার জন্যে সেটা সন্ধ্যার গায়ে খুবই টাইট হয়েছিল - আর সেজন্যে ওই জামার সবচেয়ে ওপরের দুটো বোতাম খোলাই রাখতে হয়েছিল। আরতিমাসি তার গোব্দা হাতের শক্ত মুঠোয় ওর হাতের কব্জী চেপে ধরে ওকে বাড়িটার বাইরে অপেক্ষা করা রিকশায় চাপিয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল। সন্ধ্যার বিক্রেতার দুই সাকরেদ আর একটা রিকশায় তাদের পেছনে থেকে পাহারা দিয়ে সেখানে পৌঁছে দিয়েছিল। মাসি ঐ দুই গুণ্ডার হাতে দশ দশ করে টাকা দিয়ে নিজের বাড়ির দরজা থেকে তাদের বিদায় করেছিল। প্রচলিত বকশিসের ডবল রেট পেয়ে তারা বড়ই খুশি হয়েছিল আর মাসিকে বার বার সেলাম ঠুকে নিজেদের ডেরায় ফিরে গিয়েছিল।

প্রথমদিকে আরতিমাসির একটু ভয় ছিল। এতগুলো টাকা গুনে দিয়ে মেয়েটাকে কিনে আনা হল - ও এ লাইনে নিজেকে মানিয়ে নেবে তো? এর আগে মাসি কখনো বাঙাল দেশের কোন মেয়েকে বাড়িতে জায়গা দেয় নি। তার ওপর মেয়েটার সঙ্গে কথাবার্তা বলে জানতে পেরেছিল মেয়েটা শিক্ষিত ঘরের আর নিজেও শিক্ষিত। মাসির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছিল। কারণ এটা তার জানা যে শিক্ষা ব্যাপারটা খুবই গোলমেলে যা মানুষের স্বাভাবিক বুদ্ধিশুদ্ধি নষ্ট করে দিতে সক্ষম। সেজন্যে মাসি খুবই নিশ্চিন্ত হয়েছিল যখন সে দেখেছিল সন্ধ্যা কিরকম আশ্চর্য দ্রুততায় এই ব্যবসার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিল। সন্ধ্যার কাছে এটা ছিল তার জীবিকা - তার বেঁচে থাকার উপায়। ও নিজেকে বুঝিয়েছিল যে কেউ কেউ অফিসবাড়িতে বসে কাগজের ওপর কিছু লেখালেখি করে টাকা রোজগার করে আর কিছু স্ত্রীলিঙ্গের মানুষ ঐ রোজগারটা করে তাদের শরীর ভাঙিয়ে। এটা একটা লটারি - তুমি পুরুষ হবে না স্ত্রীলোক হবে - অফিসবাড়িতে ঢুকবে না এই পল্লীর কোন একটা বাড়ির দরজায় দাঁড়াবে। যার যেটা লেগে যায়। সন্ধ্যা নিজে একটা লুঠ হওয়া, ধর্ষিতা, হাটে বিক্রী হওয়া মেয়ে - এখানকার জীবনের চাইতে বেশী আরামে রোজগার করা তার পক্ষে চিন্তা করাই অন্যায়। স্বাভাবিকভাবেই সন্ধ্যা নিজেকে এ লাইনে খালি মানিয়েই নেয় নি - ব্যবসাটাকে দু হাতে জোরে আঁকড়ে ধরেছিল। এ ব্যবসার সব রকম রংদার কায়দা কানুন খুব তাড়াতাড়ি শিখে নিয়েছিল। আর সন্ধ্যা বুদ্ধিমতী মেয়ে - সে শিখবেই বা না কেন - সে সব তো আর বিরাট শক্ত কোন ব্যাপার নয়। এ লাইনের জন্যে ওর আরও যা দরকার ছিল তা এদেশী ভাষা শিখে নেয়া। কিছু দিনের মধ্যেই ও এই ভাষা বলতে শুরু করে, কলকাত্তাই উচ্চারণে পোক্ত হয়ে ওঠে এবং পতিতাদের মধ্যে প্রচলিত কুৎসিত গালাগাল ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়। কিন্তু পূবদেশের ভাষাও ওর কাজে লাগতে থাকে। দেশভাগের আগে থেকেই পূবদেশের অনেক পয়সাওয়ালা লোক কলকাতায় চলে আসা শুরু করেছিল। তাদের মধ্যে যাদের সন্ধেবেলাতে এসব অঞ্চলের বাসিন্দা মেয়েদের দর্শন দেয়া অভ্যেস তাদের অনেকে সন্ধ্যার খদ্দের হয়ে পড়ে - কারণ সন্ধ্যার চেহারা, চলন-বলন তাদের মনে পড়িয়ে দিয়েছিল ছেড়ে আসা দেশের চরাচর বিস্তৃত নদী - সেই নদীর চঞ্চল ঢেউ কেটে চলা নৌকোয় বসা মাঝির উদাস উদাত্ত গান - বৃষ্টিভেজা পাটক্ষেতের মাটির মিঠে, সোঁদা গন্ধ। আজকাল আবার পুলিশের চাকরিতেও পূবের লোক ঢুকতে শুরু করেছে। আরতিমাসির থেকে তোলা আদায় করবার জন্যে একবার একটি ছোকরা এ এস আই এসেছিল। মাসি তাকে নিয়ে গিয়ে সন্ধ্যার ঘরে বসায়। সন্ধ্যা তার কথার টান থেকে ধরে ফেলে যে সীমানার ওপারের লোক এবং একগাল হেসে চায়ের লগে একটু হালুয়া খায়েন বলে তাকে আপ্যায়ন করে। ছোকরাটি আশ্চর্য হয়ে যায় এবং একটি কামমোহিত দৃষ্টি সন্ধ্যাকে উপহার দেয়। সন্ধ্যা হেসে চোখ নাচায় - আদিমরিপু পীড়িত যুবকটিকে বলে, দুপুরবেলা আসেন না ক্যান? আমি খালি থাকি তখন। এইভাবে সন্ধ্যা আর একটি প্রেমিক লাভ করে, যে কিনা আবার সরকারি ক্ষমতায় বলীয়ান।

অতএব শীগগিরই সন্ধ্যা মাসির আর সব মেয়েদের চাইতে বেশী রোজগার করতে শুরু করে আর মহিলার অত্যন্ত প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠে। কিছু দিনের মধ্যেই ও নিজের খরিদ দাম সুদ সমেত মাসিকে দিয়ে দেয় আর হয়ে ওঠে কেনা মেয়ের বদলে ভাড়াটে মেয়ে। ভবিষ্যতে এই বাড়ি সন্ধ্যাকে বিক্রী করে দিয়ে ব্যবসাটা ওর হাতেই ছেড়ে দেবে এরকম একটা ধারণা প্রৌঢ়ার মনে দানা বাঁধতে থাকে। সন্ধ্যার রোজগারের পরিমাণ দেখে সে ঠিক করে সন্ধ্যাকে একটা ব্যাঙ্কের খাতা খুলিয়ে দেবে - যে ব্যাঙ্কে তার নিজের খাতা চালু ছিল। ব্যাঙ্কে জমা দেবার জন্যে মাসি স্থানীয় বিধায়কের থেকে সন্ধ্যার নামঠিকানা লেখা একটা সাট্টিফিটি জোগাড় করে। সন্ধ্যা তাতে চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারে যে তার রূপান্তর সম্পূর্ণ হয়েছে - কারণ সেই কাগজে রামমোহন বসু, শিক্ষকের মেয়ে সন্ধ্যা বসু হয়েছে আরতি দাসীর বাড়ির বাসিন্দা সন্ধ্যারানী দাসী এবং তার জন্মদাতার ভূমিকা নিয়েছে জনৈক গোবর্ধন দাস, পেশা কৃষিকর্ম। সন্ধ্যার তখন একটা হাসির দমক আসে আর সে হাসতে হাসতে মাসির গায়ে ঢলে পড়ে। মাসি বড়ই বিরক্ত হয় আর সন্ধ্যাকে ঠেলে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলে, মাগি ঢং করছে দ্যাখো।

সন্ধ্যা যখন মাসির সঙ্গে ব্যাঙ্কে গিয়েছিল তখন সন্ধ্যার সঙ্গে আরতি বাড়িউলিকে দেখেই ব্যাঙ্কের কাউন্টারে বসা বাবুটি বুঝে ফেলেছিল সন্ধ্যার পেশা কি। সে ব্যাঙ্কের একটা ছাপানো কাগজে ঐ বিধায়কের কাগজ দেখে দেখে সন্ধ্যার নাম, ঠিকানা এবং পিতৃপরিচয় লেখে আর সেই কাগজ সন্ধ্যার দিকে বাড়িয়ে ধরে সই করার জায়গায় বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের টিপছাপ দিতে বলে। সন্ধ্যা গম্ভীর মুখে বাবুটির হাতে দু আঙুলের ফাঁকে ধরা কলমটা তুলে নেয় আর ইংরেজিতে 'সন্ধ্যা' এই কথাটা লিখে বাবুটির হাতে কাগজ ও কলম ফেরৎ দেয়। লোকটি অবাক হয়ে সন্ধ্যার দিকে তাকায় - জিভের ডগায় উঠে আসা এ মেয়ে এখানে কেন গোছের প্রশ্নটা সে গিলে ফেলে - খাতা খোলার বাকি প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে। ঘন্টাখানেক পরে সন্ধ্যা ব্যাঙ্কের পাসবই হাতে মাসির সঙ্গে ঘরে ফিরে আসে - ব্যাঙ্কে জমা পড়েছে পুরোপুরি হাজার টাকা। ওর আঁচলের খুঁটে তখনও পাঁচশ টাকা বাঁধা ছিল। ও ফিরে এসেই শ্যামলাল স্যাকরাকে ডেকে পাঠায় আর একটা ওজনদার গলার হারের বরাৎ দেয়। রোজগারের টাকার অর্ধেক সোনা করে রাখবি - মসির এই উপদেশটা ওর ভালরকম মনে ধরেছিল।

মাসির বাড়িতে সন্ধ্যা আর এক ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় - যেটাকে ওর পক্ষে এক ধরনের প্রশিক্ষণই বলা যেতে পারে। বাড়ির অন্যান্য মেয়েরা প্রায় সকলেই এসেছে সমাজের নিচু স্তর থেকে। তারা মোটা দাগের মানুষ, স্বার্থপর এবং সঙ্কীর্ণমনা। কুৎসিত ভাষা আর গালাগাল তৈরী থাকে তাদের জিভের ডগায় - পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করতে তারা অত্যন্ত পটু - ঝগড়ার সময় তাদের গলার আওয়াজ পর্যন্ত পালটে যায় - হয়ে ওঠে অত্যন্ত কর্কশ। প্রথমদিকে তাদের বেশিরভাগই সন্ধ্যার বিরুদ্ধে ছিল - সন্ধ্যা কেন মাসির নেকনজরে পড়েছে? আত্মরক্ষার তাগিদে সন্ধ্যা দ্রুত তার আর একটা স্বত্তা তৈরি করে ফেলে যা এদের তীব্র বিরোধিতার সঙ্গেও টক্কর দিতে সক্ষম। পানিজলের দেশের মেয়ে সন্ধ্যা - সে স্নানের ঘরে অন্যান্যদের চেয়ে একটু বেশীই সময় নেয় - চৌবাচ্চার জল বেশী খরচা করে ফেলে। বাকি মেয়েরা বিরক্ত হয়, কেউ কেউ রেগে যায় - কিন্তু সন্ধ্যার ওপর চেঁচাতে সাহস করে না। সন্ধ্যা এখন কর্কশ গলায় ঝগড়া করতে - কুৎসিত গালাগাল দিতে পাকা হয়েছে - এই কিছুদিন আগেই হীরা নামে একটা ঝগড়াটে মেয়ের বাপের শ্রাদ্ধ করে ছেড়েছে। তবে সময় সময় ঝগড়া করতে গিয়ে সন্ধ্যার মধ্যে একটা মোটা দাগের রঙ্গ করার প্রবৃত্তি কাজ করে - সে ঐ বাগযুদ্ধকে প্রহসনের পর্যায়ে নামিয়ে আনে। স্নানঘরে থাকার সময় নিয়ে কমলার সঙ্গে ওর প্রায়ই কথা কাটাকাটি হয়। সেদিন পুরোদস্তুর ঝগড়া লেগে গিয়েছিল। সন্ধ্যা শ কার বকারের প্রচুর ব্যবহার করছিল। ও সবে বাথরুম থেকে বেরিয়েছে - গা মাথা ভিজে - পরনের শাড়িটা ভিজে - ওর গায়ে লেপ্টে আছে। প্রতিপক্ষ কমলা মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে আঙুল নেড়ে নেড়ে ওকে বলছিল - তোর পুতের মাথা খাই - তোর ভাতারের মাথা খাই -। হঠাৎ সন্ধ্যা গাল দেওয়া থামিয়ে হো হো করে হেসে ওঠে আর তাই দেখে কমলাও একটু থমকে গিয়ে চুপ করে যায়। হাসতে হাসতেই সন্ধ্যা বলেছিল, আমার ভাতার কি একটা? এতগুলো মাথা কি করে খাবি? আর আমার পুত কোথায় যে তার মাথা খাবি?

এই অকাট্য যুক্তি শোনার পর কমলা চুপ করে যায়। আরতিমাসি এদিকে আসছিল এই ঝগড়া থামিয়ে দেবার জন্যে - সেও হেসে ফেলে। কমলা নিজের ঘরে ফিরে যায় আর সন্ধ্যা আবার বাথরুমে ঢোকে গায়ে আর একপ্রস্থ জল ঢালার জন্যে।


এভাবেই এবাড়ির মেয়েরা সন্ধ্যার সঙ্গে ধীরে ধীরে ভাব করে ফেলে - কিছুটা সমীহও করতে শুরু করে। তবে তার একটা বড় কারণ হচ্ছে টাকাটা সিকেটা ধার সন্ধ্যার কাছ থেকে চাইলেই পাওয়া যায়। সন্ধ্যার পাশের ঘরের মেয়েটার নাম আশা। কালো, মোটা, খাঁদা চেহারা - চাষিবাড়ির মেয়ে। বর বিয়ে করে ওকে কলকাতা দেখাবার নাম করে এখানে নিয়ে আসে - এ বাড়িতে বিক্রী করে দিয়ে লোপাট হয়ে যায়। ওর দুটো বাচ্চা রয়েছে - একটা সাত আট বছরের মেয়ে, আর একটা তার থেকে বছর দুই এর ছোট একটা ছেলে। মেনি আর জগা - মাসির দেওয়া নাম। মেয়েটার গায়ের রং ফরসা, চোখ মুখের গড়নও ভাল - কোন অজানা বাবার অবদান। চোদ্দ পনের বছর বয়েস হলেই ওকে লাইনে নামাবে বলে আশা ঠিক করে রেখেছে। ছেলেটার রং কালো, আশার মতই দেখতে। দুটো বাচ্চাকে খাওয়াতে হবে - টাকার টানাটানি - এই সব ছুতো দেখিয়ে আশা প্রায়ই সন্ধ্যার থেকে দশটা কুড়িটা টাকা কর্জ নেয় - কিন্তু আগের ধারটা শোধ দিতে ভুলে যায়। সন্ধ্যা টাকা ফেরৎ পাওয়ার জন্যে তাগাদা করে না। ওর এই চাইলেই টাকা দেয়া আর ধারের টাকা ফেরৎ পাওয়ার অনীহা দুটি মানুষকে দুখী করেছিল। মাসির বাড়ির উল্টোদিকের পানের দোকানের মালিক সহদেব - তার মহাজনী ব্যবসায় খানিকটা ভাটা পড়েছিল। তবে যেহেতু সে তার দোকান থেকে বাংলা মদও বিক্রী করত তার ক্ষতিটা পুষিয়ে গিয়েছিল। আরতিমাসিও এই ব্যথার একজন ব্যথী ছিল। কারণ তার সহদেবের কাছ থেকে পাওয়া সুদের ভাগ কমে গিয়েছিল। সন্ধ্যাটার যে কি উড়নচণ্ডী বদখেয়াল। একটু হিসেবী হলে তো মেয়েটা আরও কত টাকা রাখতে পারত - বড় দুঃখে মাসি একথা ভেবেছিল। ওর কাছে আশার মোট ধার এখন একশ টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে। - সন্ধ্যা ধারের হিসেবের খাতাটায় আশার কত ধার তা যোগ করে দেখেছে। আশার আবার খুব ইচ্ছে ছিল ছেলেমেয়েকে স্কুলে পড়ানো। মাসি একেবারে পাত্তা দেয় নি বলে তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন ওর মেয়েটা সন্ধ্যামাসির খুব ন্যাওটা হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার পেছন পেছন ঘোরে - ওর সাজপোষাক, চালচলন খুব নজর করে দেখে। সন্ধ্যা মজা পায়, ওকে সাজিয়ে দেয়। চোখে কাজল, গালে পাউডার, ঠোঁটে লালবাতি, কপালে একটা ছোট্ট টিপ। ভীষণ খুশি হয়ে মেয়েটা নেচে নেচে এক পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বেড়ায় - বাড়ির সব ঘরে গিয়ে মাসিদের নিজের সাজ দেখিয়ে আসে। আবার মর্জি হলে সন্ধ্যা ছেলেমেয়েদুটোকে শোনায় পূবদেশের ছড়া,

ও দিকে যাইও নারে ভাই - বড়শিয়ালের ভয়,
এক ব্যাটা শুইয়া রইসে - পিছনে কথা কয়।

মেয়েটা মন দিয়ে শোনে। ছেলেটা ছটফট করে - কিছুক্ষণ পরে উঠে যায়। ওর এখন থেকে ছিঁচকে চুরির অভ্যেস হচ্ছে। ঘরে খাটের ওপর রেজকী অসাবধানে রেখে দেয়া সন্ধ্যার একটা বদ অভ্যেস। আশার ছেলেটা ঘরে এলে মাঝে মাঝেই খাটের ওপর ছড়ানো খুচরো পয়সার পরিমাণ কমে গিয়েছে - সেটা সন্ধ্যার চোখে পড়েছে।

দেশে থাকতে সন্ধ্যা নিয়মিত খবরের কাগজ পড়ত। এখানেও সেই নিয়মটা ও বজায় রেখেছে। বেশিরভাগ সময়ে বাংলা, মাঝে মাঝে ইংরেজি। ও কিছু বইও কিনেছে। মাঝে মাঝে দুপুরে ও বিছানায় আধশোয়া হয়ে বই পড়ে। অবশ্য বইগুলো ও আলমারির ভেতর চাবিবন্ধ করে রাখে। ওর বাবুরা মেয়েমানুষটার ঘরে বই দেখলে ঘাবড়ে যেতে পারে - এমনকি ওর কাছে আসা বন্ধও করে দিতে পারে। সন্ধ্যা কাগজ আনায় মিঠাইলালকে দিয়ে। বইগুলোও কিনিয়েছে ওকে দিয়েই। যে বাড়ি থেকে সন্ধ্যা বিক্রী হয়ে আসে মিঠাই সে বাড়ির গুণ্ডা ছিল - সন্ধ্যার ওপর অত্যাচারও করেছে সে। সেখানকার সর্দার ওকে তাড়িয়ে দেওয়াতে সে আরতিমাসির কাছে এসে এ বাড়িতে চাকরি নিয়েছে। এখন মিঠাই সন্ধ্যার অতি বিশ্বাসী ভক্ত - সন্ধ্যাদিদির জন্যে জান দিতে তৈরী। মাঝে মাঝে শয়তানিবুদ্ধি মাথায় চাপলে সন্ধ্যা ওকে বলে, কি মিঠাই, মনে পড়ে ও বাড়ির কথা? তখন মিঠাই সন্ধ্যার সামনে সাষ্টাঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়ে, নাকে খত দেয়, দুহাতে নিজের কালো রঙের দুটো কান মলে লাল করে ফেলে।

সন্ধ্যার এই দ্বৈত সত্তা তৈরী হয়তো ওর বর্তমান জীবনযাপনের পক্ষে অবধারিত ছিল। দেশের বাড়িতে শীতকালে উত্তুরে হাওয়া এসে বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ের কলাগাছের সারিতে বাধা পেত - শোনা যেত সেই বিরক্ত, ক্রুদ্ধ হাওয়ার গোঁ গোঁ শব্দ, কলাগাছের পাতার দুলুনির সরসর আওয়াজ - গভীর রাতে তক্ষকের ভেসে আসা ডাকের আওয়াজ। মাথার ওপরের বিশাল খোলা আকাশে উঠত গর্বিত সুন্দরী চাঁদ - ছড়িয়ে দিত তার মিঠে জ্যোৎস্না। শহর ছাড়িয়ে আরও দূরে রাস্তার একপাশে পাটক্ষেত, অন্যদিকের জমি সবুজ - সব্জী ফলেছে সেখানে। এখানে দুনিয়াটা সংকীর্ণ। দোতলায় ঘরের সামনের লম্বা টানা বারান্দাটার থেকে নিচে দেখা যায় সরু পিচ দেওয়া গলিটা - জায়গায় জায়গায় তার দুপাশের নর্দমার ওপর জমে আছে নোংরা - কারণ কর্পোরেশনের লোক এ রাস্তার নোংরা নিয়মিত পরিষ্কার করে না। হাওয়া এখানে লজ্জিত এবং দুর্বল - যেটুকু ঘরে ঢোকে তাতে মিশে থাকে নর্দমার নোংরার পচা গন্ধ - ঘরের ভেতর ফ্যান চালিয়েও সে গন্ধ একেবারে যায় না। সরু গলির দুপাশে সব পুরনো বাড়ি - মাঝখানে একচিলতে আকাশ - জ্যোৎস্না কখন সেই গলির ভেতর দিয়ে ঘুরে চলে যায় তা চোখেই পড়ে না। নিচে গলিটায় আলো অল্প, অন্ধকার বেশী - তার কারণ অনেকগুলো ল্যাম্পপোস্টেই আলো জ্বলে না। গলিটায় হাতে টানা রিকশার ঘন্টির ঠুন ঠুন আওয়াজ, অতিরিক্ত মদ খেয়ে ফেলা খদ্দেরের জড়ানো গলার চীৎকার। দোতলার ঘরে সাজগোজ করা সন্ধ্যা - মিঠাই এসেছে, তার পেছনে একটা বাবু চেহারার লোক - হাতে হাতে পাওনা একটা বড় পাত্তির নোট। মিঠাই যাকে তাকে সন্ধ্যার কাছে আনে না।



(ক্রমশ)



(পরবাস-৫৬, মার্চ, ২০১৪)